
১
ছোটবেলায় পড়া দারুণ রোমাঞ্চকর বইগুলোর মধ্যে গ্রিক কবি হোমারের ‘দি ওডিসি’ অন্যতম। এর আগেও এই কালজয়ী মহাকাব্যের সিনেমারূপ দেখা গেছে, তবে এবার অস্কারজয়ী ব্রিটিশ নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলানের হাত ধরে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে পর্দায় আসছে ‘দ্য ওডিসি’। নিখুঁত গল্পশৈলী আর আধুনিক নির্মাণ কৌশলের মেলবন্ধনে তৈরি এই চলচ্চিত্রটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করতে যাচ্ছে।
৬ জুলাই ২০২৬ (সোমবার) তারিখে লন্ডনের লেস্টার স্কয়ারে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিশাল কাঠের ট্রোজান ঘোড়া এনে সাজানো অনুষ্ঠানস্থলে সিনেমাটির জমকালো ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। আর এই প্রিমিয়ার ও ট্রেলার মুক্তির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সিনেমা প্রেমীদের মধ্যে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
২
‘দ্য ওডিসি’ সিনেমার মূল খুঁটিনাটি।
ক। স্টোরি লাইন।
আমার আগের একটি লেখায় তুরস্কের হিসারলিক পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘ট্রুভা’ ভ্রমণের রোমাঞ্চকর গল্প শেয়ার করেছিলাম। যারা বিখ্যাত ‘ট্রয়’ সিনেমাটি দেখেছেন কিংবা ইতিহাস ও পুরাণে তুরস্কের ট্রুভায় সংঘটিত সেই রক্তক্ষয়ী ট্রোজান যুদ্ধের কথা জানেন, তাদের জন্য এই সিনেমার গল্পের ধারাবাহিকতা বোঝা বেশ সহজ ও একই সাথে চমৎকার হবে; কারণ নোলানের এই সিনেমার মূল গল্পটি শুরুই হয়েছে ঠিক তার পর থেকে।
দীর্ঘ ও ভয়াবহ ট্রোজান যুদ্ধ জয়ের পর ইথাকার রাজা ওডিসিয়াস যখন সমুদ্রপথে নিজের রাজ্যে এবং তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী পেনেলোপি ও পুত্র টেলেমেকাসের কাছে ফিরে আসছিলেন, তখনই শুরু হয় আসল সংকট। নিজের প্রিয় মাতৃভূমিতে ফেরার জন্য তাকে দীর্ঘ ১০টি বছর ধরে সমুদ্রের বুকে নানা অলৌকিক, অতিপ্রাকৃতিক এবং চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। পথিমধ্যে একচোখা দানব সাইক্লপ্স, মায়াবী ডাইনি সার্সি এবং জলদেবী ক্যালিপ্সোর মতো পৌরাণিক সব ভয়ঙ্কর বাধা পেরিয়ে ওডিসিয়াসের বেঁচে থাকার এবং ঘরে ফেরার এই মহাকাব্যিক লড়াই-ই এই সিনেমার মূল উপজীব্য।
খ। বাজেট ও লোকেশন।
সিনেমাটির আনুমানিক নির্মাণ বাজেট প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ইউনিভার্সাল স্টুডিওর অন্যতম বড় বাজি এবং ক্রিস্টোফার নোলানের ক্যারিয়ারের অন্যতম ব্যয়বহুল প্রজেক্ট। মরক্কো, গ্রিস, ইতালি ও আইসল্যান্ডের মতো নয়নাবিরাম সব বাস্তব লোকেশনে এই মহাকাব্যের চিত্রধারণ করা হয়েছে। তবে সিনেমাটির একটি বড় অংশের শুটিং গ্রিসে হলেও, এজিয়ান সাগরের ঠিক এপারেই অবস্থিত তুরস্কের হিসারলিক অঞ্চলে (যা ঐতিহাসিক ট্রয়ের আসল ধ্বংসাবশেষ) কেন কোনো দৃশ্য ধারণ করা হলো না, সেই কারণটা আমার জানা নেই। হয়ত কোনো লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ বা নোলানের নিজস্ব ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনার কারণেই ট্রয়ের ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে থাকা এই অঞ্চলটি বাদ পড়েছে।
গ। সিনেমাটোগ্রাফি ও এআই প্রযুক্তি।
এই সিনেমার সবচেয়ে বড় রেকর্ড হলো— এটি ইতিহাসের প্রথম ফিচার ফিল্ম যা সম্পূর্ণরূপে IMAX 70mm ফিল্ম ক্যামেরায় শুট করা হয়েছে। IMAX 70mm হলো চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ফিল্ম ফরম্যাট, যা সাধারণ ৩৫ মিমি ক্যামেরার চেয়ে প্রায় ৯ গুণ বড় এবং উচ্চ রেজোলিউশনের (প্রায় 18k) নেগেটিভ ছবি ধারণ করতে পারে। এই ক্যামেরায় শুট করা দৃশ্যগুলো থিয়েটারের বিশাল পর্দায় অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত, উজ্জ্বল এবং জীবন্ত ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা দেয়। নোলান সাধারণত প্র্যাক্টিক্যাল ইফেক্টসে বিশ্বাসী হলেও, পৌরাণিক দানব ও সমুদ্রের অবাস্তব দৃশ্যগুলোকে নিখুঁত করতে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও আধুনিক কম্পিউটেশনাল প্রযুক্তির (AI-driven VFX Tools) সাহায্য নেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, জেমস ক্যামেরনের 'অ্যাভাটার' চলচ্চিত্রে ফ্লুইড সিমুলেশন প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদান রেখে অস্কারজয়ী প্রথম বাংলাদেশি নাফিস বিন জাফর যেভাবে অনন্য গৌরব অর্জন করেছিলেন, নোলানের এই টেকনিক্যাল টিমে সেরকম কোনো বাংলাদেশি মুখ আমি খুঁজে পাইনি। হলিউডের এত বড় একটি ভিজ্যুয়াল মাস্টারপিসে আমাদের দেশের কাউকে সরাসরি যুক্ত থাকতে দেখলে একজন চলচ্চিত্রপ্রেমী হিসেবে আমার সত্যিই ভীষণ ভালো লাগতো।
৩
তারকাবহুল কাস্টিং ও পর্দার পেছনের গল্প।
সিনেমাটি পরিচালনা, চিত্রনাট্য ও প্রযোজনা করেছেন ক্রিস্টোফার নোলান এবং সহ-প্রযোজক হিসেবে আছেন তার স্ত্রী এমা থমাস। এই সিনেমার তারকাবহুল কাস্টিংয়ে রয়েছেন হলিউডের প্রথম সারির অভিনেতারা:
ক। ওডিসিউস (ম্যাট ডেমন)।
গ্রিক মহাকাব্যের বীর ওডিসিউস চরিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আমার অন্যতম প্রিয় হলিউড অভিনেতা ম্যাট ডেমন। ১৯৯৭ সালে তার অভিনীত বিখ্যাত আইনি থ্রিলার ‘দি রেইনমেকার’ সিনেমাটি দেখার পর থেকে আজ অবধি তার প্রায় সব সিনেমাই আমার দেখা হয়েছে, তাই পর্দায় তার উপস্থিতি আমার জন্য সবসময়ই বিশেষ কিছু। ক্রিস্টোফার নোলানের জাদুকরী পরিচালনায় এটি ডেমনের ক্যারিয়ারের তৃতীয় চলচ্চিত্র, যার ফলে এবারও দর্শকদের মাঝে তাকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ আকাশচুম্বী। সিনেমার শুটিংয়ের অভিজ্ঞতাকে একেবারেই ব্যতিক্রমী ও কঠিন উল্লেখ করে ম্যাট ডেমন জানান, প্রতিটি লোকেশনের চ্যালেঞ্জ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মরক্কো থেকে আইসল্যান্ডের মতো দুর্গম ও বৈরী সব স্থানে কাজ করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে তিনি রসিকতা করে বলেন, শুটিংয়ের সময় তার মনে হয়েছে যেন তিনি একটি নয়, বরং একসঙ্গে ছয় কিংবা সাতটি ভিন্ন সিনেমায় কাজ করছেন!
খ। পেনেলোপি (অ্যান হ্যাথাওয়ে)।
ওডিসিউসের বিশ্বস্ত ও লড়াকু স্ত্রী পেনেলোপির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন অস্কারজয়ী তারকা অ্যান হ্যাথাওয়ে। কিছুদিন আগে ব্যক্তিগত জীবনে তার দ্বিতীয়বার মা হতে যাওয়ার মধুর ঘোষণাটি দেওয়ার পর, লন্ডনের জমকালো লালগালিচায় তিনি সবার নজর কেড়েছেন। প্রিমিয়ারে সুন্দর একটি গাউনের সাথে নিজের বেবি বাম্প নিয়ে হাজির হয়ে মাতৃত্বের দীপ্তিতে পুরো অনুষ্ঠানস্থল আলোকময় করে তোলেন এই অভিনেত্রী।
গ। টেলেমেকাস ও দেবী অ্যাথেনা (টম হল্যান্ড ও জেনডায়া)।
সিনেমায় ওডিসিউসের পুত্র টেলেমেকাস চরিত্রে টম হল্যান্ড এবং দেবী অ্যাথেনা চরিত্রে দেখা যাবে তার বাস্তব জীবনের সঙ্গী জেনডায়াকে। রুপালি পর্দায় এই জুটির রসায়ন দেখতে ভক্তরা মুখিয়ে আছেন, বিশেষ করে জেনডায়াও শুটিং সেটে টমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানান। এই প্রজেক্টের ঠিক পরপরই দর্শকদের প্রিয় এই তারকা জুটিকে আবার নতুন 'স্পাইডার-ম্যান' সিনেমাতেও একসঙ্গে দেখা যাবে।
ঘ। অন্যান্য চরিত্রে।
সিনেমার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মধ্যে জলদেবী ক্যালিপসোর মায়াবী রূপে হাজির হয়েছেন আমার আরেক প্রিয় তারকা চার্লিজ থেরন। দক্ষিণ আফ্রিকান এই অস্কারজয়ী অভিনেত্রীর 'ইটালিয়ান জব' (২০০৩) সিনেমাটি দেখার পর থেকেই আমি তার অভিনয়ের ভীষণ ভক্ত, আর এই সিনেমা নিয়ে তিনি চমৎকার মন্তব্য করে বলেছেন— এমন গল্প পর্দায় আনার সাহস শুধু নোলানেরই আছে। অন্যদিকে, প্রধান খলনায়ক 'অ্যান্টিনাস' চরিত্রে দেখা যাবে রবার্ট প্যাটিনসনকে, যার রহস্যময় নেতিবাচক লুক ইতিমধ্যেই দর্শকদের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। নোলান স্বয়ং প্যাটিনসনের এই ভিলেন চরিত্রটিকে কিংবদন্তি অভিনেতা অ্যালান রিকম্যানের (হ্যারি পটারের স্নেইপ খ্যাত) চিরস্মরণীয় অভিনয়শৈলীর সাথে তুলনা করেছেন।
৪
ট্রেলার মুক্তি ও দর্শকদের উন্মাদনা।
ইউটিউবে প্রকাশিত ট্রেলারটি ইতিমধ্যেই দর্শকদের মধ্যে ঝড় তুলেছে। ট্রেলারে দেখানো সাইক্লপ্স এবং ডাইনি সার্সির সিকোয়েন্সগুলো আমার গায়ের লোম খাড়া করে দিয়েছে। সম্পূর্ণ আইম্যাক্স ক্যামেরায় ধারণকৃত এই সিনেমার ভিজ্যুয়ালকে দর্শকরা "চোখ ধাঁধানো" এবং "নিখুঁত" বলে বর্ণনা করছেন। সিনেমাটি নিয়ে উন্মাদনা এতটাই বেশি যে, অ্যাডভান্স টিকিট ছাড়ার মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে থিয়েটারের IMAX 70mm-এর শোগুলো সম্পূর্ণ সোল্ড-আউট হয়ে যায়, যার দরুন টিকিটের মূল সাইটগুলোও ক্র্যাশ করে। ওডিসিয়াস ও পেনেলোপির আবেগঘন অভিনয় দেখে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং অস্কার বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাট ডেমন এবার 'সেরা অভিনেতা'র অস্কার দৌড়ে বেশ এগিয়ে থাকবেন।
৫
কাস্টিং বিতর্ক ও নোলানের যুক্তি।
তারকাবহুল এই কাস্টিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক দেখা গেছে। ওডিসিয়াসের পুত্র টেলেমেকাস চরিত্রে টম হল্যান্ডের অভিনয় নোলানের মহাকাব্যিক গাম্ভীর্যের সাথে কতটা খাপ খেয়েছে, তা নিয়ে কিছু সমালোচক সংশয় প্রকাশ করেছেন; পাশাপাশি প্রাচীন গ্রিক পটভূমি হওয়া সত্ত্বেও মডার্ন ইংলিশ ভাষা ব্যবহার করায় ঐতিহাসিক ও গোঁড়া সিনেমা প্রেমীদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অবশ্য নোলান নিজেই নিজের সিদ্ধান্তকে ডিফেন্ড করে বলেছেন— এটি দর্শকের সাথে সিনেমার সংযোগ সহজ করার জন্য একটি স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে পর্দায় ভাষার ব্যবহার কিংবা কাস্টিং নিয়ে যতই বিতর্ক বা সমালোচনা হোক না কেন, ইতিপূর্বে নোলানের 'ইন্টারস্টেলার', 'ইনসেপশন' কিংবা 'ওপেনহাইমার'-এর মতো বিশ্ব কাঁপানো বিখ্যাত সিনেমাগুলো দেখার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি— এবারও তিনি আমাদের এক নতুন মাস্টারপিস উপহার দিতে যাচ্ছেন।
৬
বিশ্বজুড়ে বহুল প্রতীক্ষিত এই চলচ্চিত্রটি আগামী ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে থিয়েটারে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। ২ ঘণ্টা ৫২ মিনিটের এই সিনেমাটি যে একটি বক্স অফিস সুনামি আনতে যাচ্ছে— তা নিয়ে চলচ্চিত্র মহলে কোনো সন্দেহ নেই। একজন সিনেমা প্রেমী দর্শক হিসেবে বাংলাদেশের স্টার সিনেপ্লেক্সে এটি কবে রিলিজ পাবে এবং বড় পর্দায় নোলানের এই জাদুকরী সৃষ্টি উপভোগ করব, তা দেখতে অধীর আগ্রহে মুখিয়ে আছি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১০ জুলাই ২০২৬