
১
যুদ্ধক্ষেত্রে শুধুমাত্র রক্তপাত, প্রাণহানি বা গোলাগুলির ঘটনাই ঘটে না; সেখানে মাঝেমধ্যে এমন কিছু উপাখ্যানের জন্ম হয় যা অতিপ্রাকৃত রূপকথাকেও হার মানায়। আবার অনেক সময় সুপরিকল্পিতভাবে এমন কিছু মনগড়া কাহিনীর অবতারণা করা হয়, যা নির্মম বাস্তবতা থেকে আলোকবর্ষ দূরে- যার একমাত্র লক্ষ্য থাকে জনমনকে প্রোপাগান্ডার চাদরে ঢেকে দেওয়া। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ে নির্মিত হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা 'দ্য গ্রিন বেরেটস' কিংবা 'র্যাম্বো: ফার্স্ট ব্লাড পার্ট টু'-এর কথাই ধরা যাক। সেলুলয়েডের পর্দায় মার্কিন সেনাদের এখানে যেভাবে অপরাজিত বীর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা দেখে বোঝার উপায় নেই যে বাস্তবে সেখানে আমেরিকানরা কতটা করুণ ও শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছিল। প্রোপাগান্ডার মোড়কে ঢাকা এই চলচ্চিত্রগুলো মূলত যুদ্ধের নৃশংসতা আর সামরিক ব্যর্থতা আড়াল করার এক চতুর হাতিয়ার।
আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে তৈরি এমন কিছু কালজয়ী সিনেমাও রয়েছে, যা সেলুলয়েডের ফ্রেমে মানবিকতার এক অবিস্মরণীয় দলিল হয়ে আছে। স্টিভেন স্পিলবার্গের 'সেভিং প্রাইভেট রায়ান'-এ ওমাহা বিচের সেই হাড়হিম করা রক্তক্ষয়ী ল্যান্ডিং ও একজন মাত্র সাধারণ সৈন্যকে বাঁচানোর মানবিক মিশন, কিংবা 'শিন্ডলার্স লিস্ট'-এ নাৎসিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অস্কার শিন্ডলারের সাধ্যের বাইরে গিয়ে সহস্রাধিক ইহুদি প্রাণ বাঁচানোর বাস্তব চিত্র আজও বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তবে হলিউডের সিনেমার এই রোমাঞ্চ, আবেগ আর মানবিকতার উপাদান যখন কোনো রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা মেশিনের রসদ হয়ে ওঠে, তখন সত্যের অপমৃত্যু ঘটে এবং আড়াল হয়ে যায় যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা। ঠিক তেমনই এক বাস্তব আর নিখুঁত কাল্পনিকতার অদ্ভুত মিশেলে জন্ম নিয়েছে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম আলোচিত এক চরিত্র— ১০ বছর বয়সী অনাথ শিশু 'সোফিয়া'।
২
মূল ঘটনা: কোস্তিয়ানতিনভকা (Kostiantynivka)-র ফ্রন্টলাইন ও সোফিয়ার গল্প।
পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের কোস্তিয়ানতিনভকা শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রুশ ও ইউক্রেনীয় বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে। জুলাই ২০২৬-এর শুরুতে রাশিয়া দাবি করে যে, দীর্ঘ প্রায় ৯ মাসের তীব্র লড়াইয়ের পর শহরটি এখন পুরোপুরি তাদের কব্জায়। ঠিক এই সময়ই লাইমলাইটে আসে 'সোফিয়া' নামের ১০ বছর বয়সী এক ইউক্রেনীয় মেয়ে। রুশ বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইউক্রেনীয়দের তীব্র ড্রোন ও রকেট হামলায় সোফিয়ার বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং তার মা-বাবা সহ পুরো পরিবার নিহত হয়। ধ্বংসস্তূপের বেসমেন্ট থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এই অনাথ শিশুটিকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে যুদ্ধের ভেতরের এক অদ্ভুত 'মানবিক' গল্প।
৩
রুশ প্রোপাগান্ডা: ক্রেমলিনের সাজানো স্ক্রিপ্ট।
জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেল 'জভেজদা', রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'তাস' এবং যুদ্ধপন্থী রুশ সামরিক ব্লগাররা (Z-bloggers) এই ঘটনাটিকে এক মহাকাব্যিক রূপ দেয়। যেমন:
ক। রুশ সেনাদের আত্মত্যাগ।
সোফিয়াকে উদ্ধারের পর রুশ সেনারা তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে ফেলে যেতে চায়নি। তারা তাদের মূল সামরিক পরিকল্পনা পরিবর্তন করে পুরো এক কোম্পানি সৈন্যের মধ্য থেকে ২০/২৫ জনের বিশেষ দল গঠন করে। এই সেনারা দিনরাত পালা করে মেয়েটিকে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির সুরক্ষিত বেসমেন্টে পাহারা দিতে শুরু করে।
খ। বিলাসবহুল সুরক্ষা ও বিনোদন।
অবরুদ্ধ ও ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মেয়েটির মন ভালো রাখতে রুশ সেনারা তার জন্য দামি খাবার ও ভিডিও গেমসের ব্যবস্থা করে। তার সুরক্ষায় বেসমেন্টের চারপাশে মেশিনগান পোস্ট বসানো হয় এবং শত্রুর ড্রোন ঠেকাতে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ড্রোন দিয়ে রেকি করা হয়।
গ। মোটরসাইকেলে রোমাঞ্চকর উদ্ধার।
প্রায় এক মাস পর, যখন পুরো এলাকা ইউক্রেনীয় ড্রোনের নজরদারিতে স্তব্ধ, তখন রুশ সেনারা সোফিয়াকে ভারী সেফটি গিয়ার ও হেলমেট পরায়। এরপর এক সেনা তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে ড্রোন হামলার ভেতর দিয়ে নিরাপদ স্থানে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
৪
রাশিয়ান অনুসন্ধানী রিপোর্ট: প্রোপাগান্ডার ব্যবচ্ছেদ।
রুশ মিডিয়া এই মানবিকতার গল্প ছড়িয়ে দেওয়ার পরপরই রাশিয়ার স্বাধীন ও নির্বাসিত অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম 'এজেন্টস্টভো' এই ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে নামে। তাদের ডিজিটাল ফরেনসিক ও অনুসন্ধানী রিপোর্টে ক্রেমলিনের সাজানো নাটকের বড় বড় ফাঁকগুলো উন্মোচিত হয়:
ক। তারিখ ও অবস্থানের শুভঙ্করের ফাঁকি।
রুশ প্রোপাগান্ডা দাবি করেছিল, জুলাইয়ের ৭-৮ তারিখের দিকে সোফিয়াকে "মাত্র দুই দিন আগে ফ্রন্টলাইনের বেসমেন্ট থেকে" উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু 'এজেন্টস্টভো' ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ও মেটাডেটা ট্র্যাক করে প্রমাণ করে যে, সোফিয়া নামের এই শিশুটি অন্তত জুন মাসের শুরু থেকেই ফ্রন্টলাইন থেকে বহু দূরে, রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা অধিকৃত দোনেৎস্কের 'শাখতারস্ক' শহরের একটি শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে অবস্থান করছিল।
খ। ছবির অকাট্য প্রমাণ।
উক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রের অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যান্ডেলে ৫ জুন, ২৯ জুন এবং ৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে আপলোড করা ছবিতে সোফিয়াকে অন্য অনাথ শিশুদের সাথে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় খেলাধুলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে অংশ নিতে দেখা যায়। অর্থাৎ, রুশ মিডিয়া যখন তাকে বেসমেন্টে বন্দি ও জুলাইয়ে উদ্ধার হওয়ার গল্প প্রচার করছিল, তার এক মাস আগে থেকেই সে রাশিয়ার নিরাপদ হেফাজতে ছিল।
গ। রাজনৈতিক জবানবন্দি।
'তাস' সোফিয়ার যে ১৫ মিনিটের ভিডিও ইন্টারভিউ প্রকাশ করে, সেখানে ১০ বছরের এক অবুঝ শিশুর মুখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি কিংবা ইউক্রেনীয় সেনাদের নিয়ে রাজনৈতিক ডায়ালগ জুড়ে দেওয়া হয়। স্বাধীন রুশ সাংবাদিকদের মতে, শিশুটিকে ভয় বা প্রলোভনের মাধ্যমে এই স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করানো হয়েছিল।
৫
ইউক্রেনীয় অনুসন্ধানী রিপোর্ট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া।
ইউক্রেনের 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনস অ্যান্ড ইনফরমেশন সিকিউরিটি' এবং ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই ঘটনার ওপর পাল্টা তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে।
ক। ইউক্রেনীয় তদন্তের নির্যাস।
ইউক্রেনীয় রিপোর্টে বলা হয়, কোস্তিয়ানতিনভকা শহরটি রাশিয়া পুরোপুরি দখল করার যে দাবি করেছে, তা সামরিকভাবে মিথ্যা এবং সেখানে তখনও তীব্র লড়াই চলছিল। এই ভুয়া দাবিকে সত্য প্রমাণ করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইউক্রেনীয় শিশুদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার যুদ্ধাপরাধকে আড়াল করতেই সোফিয়াকে প্রোপাগান্ডার ঘুঁটি বানানো হয়েছে।
খ। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া।
ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেটস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শিশুদের উদ্ধার করার নামে তাদের পরিচয় মুছে দেওয়া এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রোপাগান্ডা ভিডিওতে ব্যবহার করাকে আন্তর্জাতিক মহল একটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো একে ক্রেমলিনের "সিনেমাটিক পিআর স্ট্যান্ট" বলে উল্লেখ করেছে।
৬
যুদ্ধের ময়দানে মানবিকতার মুখোশ পরিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর এই খেলা নতুন কিছু নয়, যার সর্বশেষ শিকার কোস্তিয়ানতিনভকার অবুঝ শিশু সোফিয়া। রুশ সেনাবাহিনীর তথাকথিত 'উদ্ধার অভিযানের' এই সিনেমাটিক গল্পটি স্বাধীন সাংবাদিকদের তদন্তে শেষ পর্যন্ত ক্রেমলিনের এক সস্তা রাজনৈতিক চাল হিসেবেই প্রমাণিত হয়েছে। একটি দেশের সামরিক ব্যর্থতা আর শিশুদের জোরপূর্বক দেশান্তরের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ঢাকতে অনাথ শিশুদের ব্যবহার করার এই প্রবণতা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাই যুদ্ধের দামামার মাঝে দাঁড়িয়ে যেকোনো রোমাঞ্চকর গল্পের পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যকে চিনে নেওয়াই এখন বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৩ জুলাই ২০২৬
রেফারেন্স:
১। Meduza (Independent Russian Media): Russian propaganda claimed a girl was 'rescued' from 'liberated' Kostiantynivka. She had been far from the front for weeks.
২। Agentstvo (Investigative Journalism Outlet): Investigative Report on Sofia's Forced Deportation and Propaganda Fake
৩। UA.News (Ukrainian News Agency): Russian fake about a 'rescued' girl from Kostiantynivka debunked by journalists - CSK
৪। Center for Strategic Communications (CSK Ukraine): Fact Check: The Myth of the 'Rescued' Ukrainian Girl in Donbas