
১
১০ জুলাই ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক মুক্তির পর থেকেই স্টার সিনেপ্লেক্সের বিভিন্ন শাখায় উপচে পড়া ভিড়। সিনেমা রিলিজের সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও প্রেক্ষাগৃহের 'হাউসফুল' উন্মাদনা আর ছোটদের চোখে 3D চশমার কৌতূহলই বলে দেয়, ডিজনির এই নতুন সৃষ্টি দর্শক হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নিয়েছে। মাল্টিপ্লেক্সটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও সিনেমাটি ঘিরে দর্শকদের এই বিপুল আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। ১৭ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার বিকেলের শো’তে সিনেপ্লেক্সের উত্তরা সেন্টার পয়েন্ট শাখায় ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম।
পূর্বে ২০১৬ সালের অ্যানিমেশন মাস্টারপিসটি দেখার কারণে লাইভ-অ্যাকশন সংস্করণটি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমারও আগ্রহ ছিল। সেই প্রথম সিনেমাটি বক্স অফিসে ঝড় তুলে ঘরে তুলেছিল প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে আসে এর সিকুয়েল ‘মোয়ানা ২’, যার সাফল্য ১ বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্ক ছাড়িয়ে আগের সিনেমাকেও ছাপিয়ে যায়। বিশ্বজুড়ে অগণিত ভক্তদের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্স এবার নিয়ে এসেছে এই লাইভ-অ্যাকশন সংস্করণ।
ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য এই অভিজ্ঞতাটি জীবনের অন্যতম বিশেষ এক স্মৃতি হয়ে থাকবে আমার ছেলে অনঘের জন্য। সিঙ্গাপুরের ইউনিভার্সেল স্টুডিওতে শর্ট-লেন্থ 4Dডি সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা তার থাকলেও, সিলভার স্ক্রিনে এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম ফুল-লেন্থ ফিচার ফিল্ম। অনলাইনে আগেভাগে টিকিট কেটে রাখার স্বস্তি আর হলভর্তি বাচ্চাদের উল্লাসের মাঝে আমাদের ‘মোয়ানা’ দেখার যাত্রাটি ছিল সত্যিই দারুণ। এবার যাই সিনেমার মূল আলোচনায়:
ক। স্টোরি লাইন ও নস্টালজিয়ার মেলবন্ধন।
গল্পের মূল কাঠামোটি ২০১৬ সালের মূল অ্যানিমেশনকেই অনুসরণ করেছে— সাহসী কিশোরী মোয়ানা তার দ্বীপ এবং প্রিয় জনগণকে এক প্রাচীন অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে সমুদ্রের বুকে এক বিপজ্জনক অভিযানে বের হয়। চিরচেনা এই প্লট জানা থাকা সত্ত্বেও লাইভ-অ্যাকশনে এর উপস্থাপন স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে দেয় না। বিশেষ করে মাউই ও মোয়ানার মধ্যকার খুনসুটি এবং আত্মআবিষ্কারের গল্পটি ছোট-বড় সব বয়সী দর্শকের আবেগ ছুঁয়ে গেছে।
খ। অভিনয়ে রক্ত-মাংসের আবেগ ও নেপথ্যের অনুভূতি।
অ্যানিমেশনে কণ্ঠ দেওয়ার এক দশক পর সরাসরি ক্যামেরার সামনে 'মাউই' রূপে ডোয়াইন ‘দ্য রক’ জনসনের আগমন ছিল সিনেমার অন্যতম বড় ইউএসপি (USP বা Unique Selling Point) । এই অভিনেতার কাছে মাউই কেবল একটি চরিত্র নয়, বরং পলিনেশীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি অংশ। এক সাক্ষাৎকারে আবেগপ্রবণ হয়ে দ্য রক বলেন:
"লাইভ অ্যাকশনে মাউই চরিত্রে অভিনয় করা আমার ক্যারিয়ারের অন্য সব কাজ থেকে একদম আলাদা। পর্দায় যখন রক্ত-মাংসের মানুষের মাধ্যমে আমাদের পলিনেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ ফুটে ওঠে, তখন অনুভূতিটাই বদলে যায়।"
জনসন জানান, গত এক দশকে একজন বাবা হিসেবে তার জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও উত্থান-পতন এ চরিত্রটিকে আরও গভীরভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। এছাড়া চরিত্রটির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত আবেগও জড়িত; ‘মাউই’ চরিত্রের মধ্যে তিনি নিজের দাদার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান, যার সাথে জড়িয়ে আছে হাওয়াইতে কাটানো তার শৈশব ও বেড়ে ওঠার দিনগুলোর স্মৃতি।
বিশ্বজুড়ে ৩২ হাজারেরও বেশি আবেদনকারীর মধ্য থেকে কাস্টিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রধান নারী চরিত্রে বেছে নেওয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া সামোয়ান বংশোদ্ভূত নবাগত ক্যাথরিন লাগাইয়াকে। পরিচালক টমাস কাইল বলেন, প্রথম অডিশনেই তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন, যখন এই অভিনেত্রী ‘How Far I’ll Go’ গানটি গেয়ে চরিত্রটির বিশ্ব ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তুলেছিলেন। ক্যাথরিন বলেন, মোয়ানা এমন একজন আদর্শ যিনি তার শৈশবের সঙ্গী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন মোয়ানার সাহস, কৌতূহল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে আজকের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেও সাহায্য করেছে, যার ফলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই চরিত্রটির সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছেন।
গ। সিনেমাটোগ্রাফি ও লাইভ-অ্যাকশন ভিজ্যুয়ালাইজেশন।
অ্যানিমেশন থেকে লাইভ-অ্যাকশনে রূপান্তরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকে কাল্পনিক পৃথিবীকে বাস্তবসম্মত করা। পরিচালক টমাস কাইল এই পরীক্ষায় দারুণভাবে উত্তীর্ণ। সিনেমাটোগ্রাফার পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রের নীল জলরাশি আর সবুজের সমারোহকে এত নিখুঁতভাবে ধারণ করেছেন যে দর্শক নিজেকে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে আবিষ্কার করে। অ্যানিমেশনের সেই ফ্যান্টাসিকে রক্ত-মাংসের মানুষ আর বাস্তবের প্রকৃতির সাথে যেভাবে ব্লেন্ড করা হয়েছে, তা এককথায় অনবদ্য।
ঘ। ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট (VFX) ও 3D জাদু।
এই সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর ভিএফএক্স এবং অ্যানিমেশনের মেলবন্ধন। বাস্তব অভিনয়ের পাশাপাশি এতে কিছু কিছু অ্যানিমেশনের ছোঁয়াও রাখা হয়েছে। সমুদ্র যখন একটি জীবন্ত চরিত্র হিসেবে মোয়ানাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, কিংবা যখন দানবীয় ‘তে কা’র সাথে যুদ্ধ হয়—তখন 3D ইফেক্টগুলো শিশুদের রোমাঞ্চিত করেছে। হলে বাচ্চাদের 3D চশমা পড়ে স্ক্রিনের দিকে হাত বাড়ানোর দৃশ্যটিই প্রমাণ করে ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট কতটা বাস্তবসম্মত ও সফল ছিল।
২
সিনেপ্লেক্স থেকে বের হওয়ার সময় চারপাশের বাচ্চাদের আনন্দঘন কোলাহল এবং অভিভাবকদের সন্তুষ্টিই বলে দিচ্ছিল সিনেমাটি সবার মন জয় করেছে। তবে আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল সিনেমার শেষে আমার ছেলের প্রতিক্রিয়া। তার এই দারুণ ভালো লাগা এবং বের হয়েই পরবর্তী মিশন হিসেবে টম হল্যান্ড অভিনীত স্পাইডার-ম্যান সিরিজের পরবর্তী সিনেমা ‘স্পাইডার-ম্যান ৪’ দেখার বায়না ধরা, এটাই তো একজন সিনেমারসিক বাবার পরম তৃপ্তি! ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটন পরিচালিত মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের ‘স্পাইডার-ম্যান’ ফ্র্যাঞ্চাইজির চতুর্থ কিস্তির আনুষ্ঠানিক নাম এখনো চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়নি। যাহোক ডিজনির চিরচেনা জাদুর সাথে বাস্তব অনুভূতির মিশেলে লাইভ-অ্যাকশন ‘মোয়ানা’ এই সময়ের অন্যতম সেরা পারিবারিক বিনোদন।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৮ জুলাই ২০২৬