
১
স্কুলজীবনে অনুবাদে পড়া গ্রিক পুরাণ, হোমারের ‘ইলিয়াড’ আর ‘ওডিসি’র পাতাগুলোয় কত হাজার দিন যে ট্রয় নগরীর প্রাচীর আর ভূমধ্যসাগরের নীল তরঙ্গে ভেসেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আর শৈশব থেকে বুকের ভেতরে জমিয়ে রাখা ভালোলাগা নতুন রূপ পেয়েছিল যখন তুরস্ক ভ্রমণের সুযোগ পাই। চানাক্কালে অঞ্চলের হিসারলিক পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ‘ট্রয়’ নগরীর ধ্বংসাবশেষ দেখার দিনটি আজও স্মৃতিতে ভাস্বর। ট্রয়ের পথে চানাক্কালে শহরের প্রান্তে স্থাপিত ট্রোজান হর্সের ভাস্কর্যের নিচে দাঁড়িয়ে আমি সেদিন যেন তিন হাজার বছর আগের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের রণধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম।
ক্রিস্টোফার নোলান যখন হোমারের এই চিরন্তন ক্লাসিককে সেলুলয়েডে রূপ দেওয়ার ঘোষণা দিলেন, তখন থেকেই দিন গুনছিলাম। অবশেষে গতকাল, শুক্রবার (২৪ জুলাই ২০২৬), সন্ধ্যা ৬:৪৫-এর শো-তে স্টার সিনেপ্লেক্স সেন্টারপয়েন্ট উত্তরায় হাজির হলাম ‘দ্য ওডিসি’ দেখতে। অনলাইনে আগাম টিকিট কাটা ছিল বলে রক্ষে, তা না হলে প্রেক্ষাগৃহের কাউন্টার থেকেই হয়তো খালি হাতে ফিরতে হতো। নোলান, হোমার এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি—এই তিনের মেলবন্ধনে সিনেপ্লেক্সের অন্ধকার হলের সিলভার স্ক্রিনে চোখ রাখা ছিল আমার জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
২
প্রাচীন মহাকাব্যের প্রেক্ষাপট: চতুর বীর থেকে ট্রমার প্রতীক।
হোমারের মহাকাব্যের মূল গল্পটা কমবেশি সবাই জানি। ইথাকা দ্বীপের রাজা, লাতের্তেস ও আন্তিক্লিয়ার পুত্র ওডিসিউস কেবল শারীরিক শক্তির বাহাদুরিতে বীর হননি; তিনি অমর হয়েছেন তার অসামান্য বুদ্ধিমত্তা, তীক্ষ্ণ বিচক্ষণতা ও কূটনীতির গুণে। দশ বছরব্যাপী ট্রোজান যুদ্ধে গ্রিকদের বিজয়ের মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। তার মাথায় জন্ম নেওয়া রণকৌশল, বিশাল আকারের ‘ট্রোজান হর্স’-এর ভেতরে গ্রিক সৈন্যদের লুকিয়ে রেখে ট্রয় নগরীতে প্রবেশ করানো এবং এক রাতে সেই অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটানো—ইতিহাসের অন্যতম সফল রণকৌশল।
তবে নোলান গল্পটি যেখানে শুরু করেন, তা বিজয়ের বাহ্যিক উল্লাসের গল্প নয়। যুদ্ধ শেষে ওডিসিউসের নিজ রাজ্য ইথাকায় ফেরার দীর্ঘ ১০ বছরের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ও রোমাঞ্চকর যাত্রাই নোলানের সিনেমার মূল ক্যানভাস। পথিমধ্যে একচোখা দৈত্য সাইক্লপস পলিফেমাস, জাদুকর সির্সি, ছলনাময়ী সাইরেন, কিংবা মারাত্মক স্কিলা ও চ্যারিবডিসের মতো প্রাকৃতিক ও অলৌকিক বাধা অতিক্রম করে তিনি অবশেষে দীর্ঘ ২০ বছর পর ছদ্মবেশে নিজ ভূখণ্ডে ফেরেন। পুত্র তেলেমাখাসের সহায়তায় স্ত্রী পেনেলোপিকে ঘিরে থাকা লোভী সুযোগসন্ধানী পাত্রদের ধনুর্বিদ্যায় পরাস্ত করে উদ্ধার করেন নিজের পরিবার, সম্মান ও সিংহাসন।
নোলানের দৃষ্টি কেবল এই অ্যাডভেঞ্চারে থমকে থাকেনি। তিনি দেখিয়েছেন ট্রয় নগরীর নির্মম পতন এবং এক রাতের রক্তগঙ্গা ওডিসিউসের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষত তৈরি করেছিল। হেক্টরের শিশুপুত্র অ্যাস্তিয়ানাক্সকে প্রাচীর থেকে ফেলে দেওয়ার আদেশ কিংবা নিরপরাধ নারী-শিশুদের আর্তনাদ তাকে বীরত্বের অহংকার থেকে ঠেলে দিয়েছিল অপরাধবোধের ক্লান্তিতে। প্রজ্ঞা যখন কেবল ধ্বংসের কাজে লাগে, তখন তা আত্মাকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করে—ওডিসিউসের সেই অভ্যন্তরীণ ট্রমা ও চরম অনুশোচনাকেই নোলান ফুটিয়ে তুলেছেন তার সিনেমার বিশাল ক্যানভাসে।
৩
নোলানের সিনেম্যাটিক ক্যানভাস: প্রযুক্তি ও অভিনয়শৈলী।
প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দিক থেকে নোলান এই সিনেমায় নিজেকে আরও এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে গেছেন বলে মনেকরি। এটিই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা সম্পূর্ণ আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার ফিল্ম ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। সিজিআই-এর অলীক দুনিয়া এড়িয়ে মরক্কো, গ্রিস, ইতালি, আইসল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মতো ছয়টি ভিন্ন দেশের বাস্তব সেটে শুটিং সিনেমাটিতে এনে দিয়েছে অতুলনীয় গভীরতা। সাইক্লোপস পলিফেমাসের দৃশ্যটি ধারণ করতে ছয় মিটারের প্রকাণ্ড পাপেট ও অ্যানিমেট্রনিক্সের যে নিখুঁত ব্যবহার করা হয়েছে, তা দর্শকনয়নকে এক নিমেষে প্রাচীন গ্রিসে নিয়ে যায়। তবে আরও ভালো হতো, তিনি সিনেমার শুটিং-এর জার্নিটা যদি চানাক্কালের সেই প্রাচীন ট্রয় থেকে শুরু করতেন।
তিনবারের অস্কারজয়ী সুরকার লুডভিগ গোরানসন ঐতিহ্যবাহী অর্কেস্ট্রা এড়িয়ে ৩৫টি ব্রোঞ্জের গং, সিনথেসাইজার এবং প্রাচীন গ্রিক বাদ্যযন্ত্র ‘লায়ার’ ও ‘আউলোস’ বাঁশির সংমিশ্রণে যে আবহসংগীত তৈরি করেছেন, তা যেন যুদ্ধের মানসিক অস্থিরতাকেই পর্দায় প্রতিধ্বনিত করে।
ওডিসিউস চরিত্রে ম্যাট ডেমন এককথায় তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছেন। তার ক্লান্ত চোখ ও বিষণ্ণ ভঙ্গিমায় ফুটে উঠেছে যুদ্ধ পরবর্তী হতাশায় আক্রান্ত এক মানুষ। পেনেলোপি চরিত্রে অ্যান হ্যাথাওয়ে কেবল বিরহী স্ত্রী নন, রাজ্য রক্ষায় দৃঢ়চেতা এক রানির ভূমিকায় অসাধারণ। টম হল্যান্ড (টেলেমাকাস), রবার্ট প্যাটিনসন (অ্যান্টিনাউস) এবং দেবী অ্যাথেনা চরিত্রে জেন্ডায়ার উপস্থিতি পুরো সিনেমাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ডায়ালগ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও আমার কাছে খারাপ লাগেনি, আমি এই প্রসঙ্গে ক্রিস্টোফার নোলানের বক্তব্যের সাথে একমত। আরও জানতে লিঙ্কটি পড়ুন: (https://www.facebook.com/share/p/1BADPuzU3Y/)
৪
যুদ্ধের চিরন্তন রূপক: ট্রোজান হর্স থেকে আধুনিক ভূ-রাজনীতি।
সিনেমাটি দেখার পর যখন রাতে গাড়িতে করে বাসায় ফিরছিলাম, তখনো চোখের সামনে ভাসছিল সিনেমাটির সেই দৃশ্যগুলো। আমার মাথার ভেতরের ঘোরটা যেন কাটছিলই না। গাড়ির জানালার বাইরে ঢাকা শহরের আলো-আঁধারির দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম—হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষের ধ্বংসাত্মক প্রবণতা কি আদৌ বদলেছে?
তিন হাজার বছর আগে ট্রয় নগরীকে ছলে-বলে-কৌশলে গুঁড়িয়ে দিতে ওডিসিউস সাজিয়েছিলেন 'ট্রোজান হর্স'-এর ন্যারেটিভ। আর তাতে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন সত্য, কিন্তু যুদ্ধজয়ের পর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ দূর হতে তার লেগেছিল দীর্ঘ দুই দশক! আসুন দেখি আজকের পৃথিবীতে, ক্ষমতার লড়াইয়ে ভূ-রাজনৈতিক অধিপতিরা যুদ্ধের ন্যারেটিভ কীভাবে সাজান? ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ন্যারেটিভ ছিল ‘উইপন্স অভ মাস ডেস্ট্রাকশন’, আর ২০২৬ সালে ইরানে আক্রমণের পথ প্রশস্ত করতে তারা সামনে নিয়ে আসেন ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ এর মতো অজুহাত। ট্রয়ের যুদ্ধ ইতিহাসের পাতা থেকে একদিন হোমারের পুরাণে আশ্রয় নিয়েছে, ইরান যুদ্ধও হয়তো একদিন শেষ হবে, তবে যেকোন যুদ্ধ শেষ হলেও যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ হয়? ফ্ল্যাগে মোড়ানো কফিনে যে মার্কিন সেনাদের ডেডবডি আমেরিকায় ফিরেছে তাদের পরিবারের ক্ষত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দূর করতে পারবেন কি?
একটি বিধ্বংসী যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হোমারের প্রাচীন বীর ওডিসিউসের মনে অন্তত অনুশোচনা জেগেছিল, তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিল তিল করে পুড়ে বীর থেকে মানবিক মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। আজকের পৃথিবীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পদের মতো পরাশক্তি শাসকদের মনে যদি সেই অনুশোচনা বা কিঞ্চিৎ পরিমাণও অনুভূতি থাকত, তবে হয়তো 'শাজারেহ তাইয়েবেহ' প্রাথমিক স্কুলে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ১২১ জন কিংবা তারও অধিক নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ যেত না। ওডিসিউসের মতো রাজনৈতিক কিংবা সামরিক পদক্ষেপের বাতাবরণে বলির পাঁঠা হওয়া সেই নিষ্পাপ শিশুদের রক্তে হয়তো থমকে যেত যুদ্ধ নামের তাণ্ডব।
৫
‘দ্য ওডিসি’ কেবল হোমারের প্রাচীন মহাকাব্যের ভিজ্যুয়াল অনুবাদ নয়; এটি ক্রিস্টোফার নোলানের হাত ধরে হয়ে উঠেছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, যুদ্ধ-পরবর্তী মানবিক অনুশোচনা এবং চিরন্তন রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ের এক জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক মাস্টারপিস। নোলান আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, যুদ্ধের আসল ক্ষতি যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে না, তা ঘটে মানুষের আত্মা বা চেতনার ভেতরে।
আমার ব্যক্তিগত রেটিং: (৫/৫)
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৫ জুলাই ২০২৬