
১
ইতিহাসের পাতায় সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং তা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর। যখন কোনো বিশাল ভূখণ্ডে বৈচিত্র্যময় জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ একত্রিত হয়, তখন কেবল তরবারির জোর বা বাহ্যিক বলপ্রয়োগ দিয়ে সাময়িক আনুগত্য পাওয়া গেলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সংহতি আসে না। এই ঐতিহাসিক সত্যটি অনুধাবন করে বিভিন্ন যুগের কতিপয় দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক সমাজকে এক সুতোয় বাঁধতে নিজেই 'দার্শনিক' বা 'আদর্শিক পথপ্রদর্শক'-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মৌর্য সম্রাট অশোকের 'ধম্ম' কিংবা ষোড়শ শতকের মুঘল সম্রাট আকবরের 'দ্বীন-ই-ইলাহী' কোনো প্রথাগত বা ঈশ্বরকেন্দ্রিক গোঁড়া ধর্ম ছিল না; বরং তা ছিল political unity (রাজনৈতিক ঐক্য), ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতা এবং সামাজিক পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখার এক একটি রাজকীয় কৌশল বা 'রাষ্ট্রীয় দর্শন' (State Ideology)।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের এই আদর্শিক অন্বেষণের এক চরম ও আধুনিক প্রকাশ দেখা যায় বিংশ শতাব্দীতে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের 'কামালবাদ' (Kemalism) বা ‘সেন্ট্রাল সেকুলার ডগমা’-র মধ্যে। ১৯২২ সালে উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি সমাজকে রাতারাতি প্রথাগত ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিমা ও ধর্মনিরপেক্ষ ছাঁচে ফেলার যে রূপান্তর প্রক্রিয়া আতাতুর্ক শুরু করেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রাজনৈতিক ধর্ম’ (Political Religion) বা ‘নাগরিক ধর্ম’ (Civil Religion)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। অশোক বা আকবর যেখানে বহুত্ববাদকে মেলাতে ধর্মীয় চেতনাকে নমনীয় করেছিলেন, আধুনিক যুগের শাসকেরা সেখানে নিজস্ব আধ্যাত্মিক, দার্শনিক বা রাজনৈতিক মতাদর্শ ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে জনমানসের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ বা ‘হেজেমনি’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। পরিশেষে বলা যায়, যুগ, মাধ্যম ও কৌশলের পরিবর্তন ঘটলেও, বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে এক সূত্রে বেঁধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সুসংহত করার এই রাজকীয় প্রবৃত্তিটি ইতিহাসে আজও চিরন্তন রয়ে গেছে।
২
ধম্ম থেকে রুহনামা: আধ্যাত্মিকতার মোড়কে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের অন্বেষণ।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মৌর্য সাম্রাজ্য আর একবিংশ শতকের তুর্কমেনিস্তানের शासनকাঠামোর মধ্যে সময়ের বিশাল ব্যবধান থাকলেও, উভয় শাসকের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের মূল সুতোটি ছিল এক ও অভিন্ন। সম্রাট অশোকের 'ধম্ম' এবং প্রেসিডেন্ট নিয়াজভের 'রুহনামা' প্রমাণ করে যে, কেবল বাহ্যিক বলপ্রয়োগ বা সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকদের ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বজায় রাখা যায় না। তাই প্রাচীন স্তম্ভলিপি বা আধুনিক ধর্মগ্রন্থের সমান্তরালে নিজস্ব নৈতিক আচরণবিধি চাপিয়ে দিয়ে তাঁরা মূলত জনমানসের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ বা ‘হেজেমনি’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধকে কৌশলে রাষ্ট্রের প্রতি পরম আনুগত্য প্রকাশের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, যুগ ও মাধ্যমের পরিবর্তন ঘটলেও, নৈতিকতার মোড়কে ক্ষমতা সুসংহত করার রাজকীয় প্রবৃত্তিটি ইতিহাসে আজও চিরন্তন রয়ে গেছে।
ক। সাম্রাজ্যের চালিকাশক্তি হিসেবে দার্শনিক শাসন।
খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ অব্দে কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ মৌর্য সম্রাট অশোকের মনস্তত্ত্বে গভীর রূপান্তর ঘটালেও, তাঁর 'ধম্ম' (Dharma) প্রচার কেবল ব্যক্তিগত অনুশোচনা ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি বিশাল, বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় সাম্রাজ্য সুসংহতভাবে পরিচালনার চরম বাস্তবমুখী political strategy (রাজনৈতিক কৌশল)। অশোক দূরদর্শিতার সাথে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল তরবারির জোর বা সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রজাদের ওপর নিরঙ্কুশ শাসন কায়েম রাখা অসম্ভব। তাই বাহ্যিক বলপ্রয়োগের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক অনুশাসন যে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং কার্যকর, এই সত্যটিই তিনি তাঁর শাসনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরিশেষে, এই দর্শনের মাধ্যমেই তিনি মৌর্য সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা ও নাগরিকদের পরম আনুগত্য নিশ্চিত করতে সক্ষম হন।
খ। অশোকের ধম্ম: সামাজিক নৈতিকতার আচরণবিধি।
সম্রাট অশোকের প্রবর্তিত 'ধম্ম' কোনো প্রথাগত, অলৌকিক বা ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্ম ছিল না; বরং তা ছিল সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ এবং মানবতাবাদী সমাজ বিনির্মাণের এক অনন্য আচরণবিধি। এতে কোনো জটিল যজ্ঞ, আচার-অনুষ্ঠান বা সুনির্দিষ্ট কোনো দেবতার উপাসনা করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। এর মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে ছিল সামাজিক নৈতিকতার ওপর—যেমন পিতা-মাতার প্রতি গভীর ভক্তি, সর্বজীবে অহিংসা, সমাজ ও পরিবারের দাস-কর্মচারীদের প্রতি মানবিক আচরণ এবং পরমতসহিষ্ণুতা। তৎকালীন ভারতের বৈদিক হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনদের মতো তীব্র বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সমাজকে একটি অভিন্ন সুতোয় বাঁধতেই এই অনন্য জীবনদর্শনকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরিশেষে, এই দর্শনকে স্থায়ী রূপ দিতে এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতেই তা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাহাড় ও পাথরের স্তম্ভে স্তম্ভে খোদাই করা হয়েছিল।
গ। নিয়াজভের 'রুহনামা': আধুনিক রাষ্ট্রীয় নীতি।
সম্রাট অশোকের প্রাচীন আদর্শিক কৌশলের সবচেয়ে কাছাকাছি এবং কৌতূহলোদ্দীপক আধুনিক প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা যায় তুর্কমেনিস্তানের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাপারমুরাত নিয়াজভের পদক্ষেপে। ২০০১ সালে তিনি 'রুহনামা' (The Book of Soul) নামক একটি আকর গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যা সমগ্র তুর্কমেন জাতির আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক গাইডলাইন হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত হয়। এটি প্রথাগত অর্থে কোনো নতুন ধর্ম না হলেও, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের প্রাত্যহিক চিন্তা ও সামাজিক আচরণকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা। একবিংশ শতকের এই আধুনিক আচরণবিধির মাধ্যমে তিনি মূলত সোভিয়েত-উত্তর একটি ছিন্নভিন্ন সমাজে নতুন জাতিসত্তা ও তীব্র জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটাতে চেয়েছিলেন। পরিশেষে, এই বইয়ের দর্শনকে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের পরম ও নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভের একটি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ঘ। প্রাচীন স্তম্ভলিপি ও আধুনিক রুহনামার ক্ষমতার রাজনীতি।
প্রাচীন স্তম্ভলিপি এবং আধুনিক রুহনামার প্রচার কৌশলের দিকে তাকালে ক্ষমতার রাজনীতি ও জনমানস নিয়ন্ত্রণের এক অভিন্ন মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট ধরা পড়ে। সম্রাট অশোক যেমন 'ধম্ম-মহামাত্র' নামক বিশেষ রাজকর্মচারী নিয়োগ করে তাঁর অনুশাসন ছড়িয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট নিয়াজভও তেমনি তুর্কমেনিস্তানের সব মসজিদে পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি 'রুহনামা' রাখা আইনগতভাবে বাধ্যতামুলক করেছিলেন। কেবল ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও এই বইয়ের জ্ঞান থাকা আবশ্যক করা হয়েছিল। প্রাচীন ও আধুনিক—সময়ের বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও উভয় শাসকের মূল political objective (রাজনৈতিক উদ্দেশ্য) ছিল আধ্যাত্মিকতা, ঐতিহ্য বা নৈতিকতার মোড়কে জনগণের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ বা 'হেজেমনি' প্রতিষ্ঠা করা। পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিন্নতা থাকলেও নৈতিক অনুশাসনের छদ্মাবরণে নাগরিকদের কাছ থেকে পরম ও নিরঙ্কুশ আনুগত্য লাভ করার এই রাজনৈতিক কৌশলটি ইতিহাসে আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
৩
বহুত্ববাদের মেলবন্ধন: আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী ও সুকান্তর পঙ্কসিলার রাজনৈতিক দর্শন।
ষোড়শ শতকের মুঘল ভারত এবং বিংশ শতকের ইন্দোনেশিয়ার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, উভয় রাষ্ট্রের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল বহু-ধর্মীয় ও বহু-সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীকে এক সুতোয় বাঁধা। সম্রাট আকবরের 'দ্বীন-ই-ইলাহী' এবং প্রেসিডেন্ট সুকান্তর 'পঙ্কসিলা' কোনোটিই প্রথাগত ধর্ম ছিল না, বরং তা ছিল ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সেতু গড়ার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। আকবর যেমন 'সুলহ-ই-কুল' বা সর্বজনীন শান্তির মাধ্যমে দরবারের অভিজাতদের আনুগত্য চেয়েছিলেন, সুকান্তও তেমনি পাঁচটি স্তম্ভের মাধ্যমে একটি সমন্বয়বাদী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। উভয় শাসকই অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল সামরিক শক্তি বা আইন দিয়ে বৈচিত্র্যময় সমাজ শাসন করা অসম্ভব, যদি না রাষ্ট্রের পেছনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক দর্শন থাকে। পরিশেষে বলা যায়, এই দুই দর্শনই প্রমাণ করে যে সমাজে স্থায়ী রাজনৈতিক সংহতি অর্জনের জন্য শাসকদের মাঝেমধ্যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অভিভাবকের ভূমিকা নিতে হয়।
ক। বহুত্ববাদী সমাজে সাংস্কৃতিক সেতুর অন্বেষণ।
মুঘল ভারতের সিংহভাগ জনসংখ্যা ছিল হিন্দু, অথচ তৎকালীন প্রধান শাসকশ্রেণি ও রাজশক্তি ছিল মুসলিম। দূরদর্শী সম্রাট আকবর গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল সাময়িক সামরিক চুক্তি বা রাজপুতদের সাথে वैবাহিক সম্পর্ক দিয়ে এই বিশাল অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী আনুগত্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব ঘোচাতে এবং সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করতে প্রজাদের সাথে রাজক্ষমতার একটি গভীর সংযোগ প্রয়োজন ছিল। আর এই লক্ষ্যেই তিনি একটি অভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক সেতু অন্বেষণ করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে মুঘল সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
খ। দ্বীন-ই-ইলাহী: শান্তি ও সমন্বয়ের সংকলন।
১৫৮২ সালে সম্রাট আকবর প্রবর্তন করেন 'দ্বীন-ই-ইলাহী', যার মূল আদর্শিক ভিত ছিল সর্বজনীন শান্তি বা 'সুলহ-ই-কুল'। এটি কোনো কিতাব বা পুরোহিততন্ত্র নির্ভর প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ছিল না, বরং ছিল একটি সমন্বয়বাদী (Syncretic) জীবনদর্শন। এতে তৎকালীন ভারতের প্রধান প্রধান বিশ্বাস—যেমন ইসলাম (বিশেষ করে সুফিবাদ), হিন্দু ধর্ম, জরাথুষ্ট্রবাদ এবং খ্রিস্টধর্মের সুকুমার গুণগুলোকে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছিল। পরিশেষে, এই শান্তিবাদী সংকলনের মাধ্যমে তিনি সমাজের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈরিতা দূর করে একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
গ। আকবরের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও রাজকীয় কর্তৃত্ব।
সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শিয়া-সুন্নি উগ্র দ্বন্দ্ব এবং হিন্দু-মুসলিম মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব স্থায়ীভাবে ঘুচাতে আকবর নিজেকে সকল মতবাদের ঊর্ধ্বে একজন 'আধ্যাত্মিক অভিভাবক' (ইনসান-ই-কামিল) হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল দরবারের শক্তিশালী অভিজাত ও মনসবদারদের ধর্মীয় সংকীর্ণতা ভুলিয়ে সরাসরি সম্রাটের ব্যক্তিত্ব ও দর্শনের প্রতি পরম অনুগত রাখা। যদিও এটি সাধারণ মানুষের মাঝে ধর্ম হিসেবে ছড়িয়ে পড়েনি, কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষ ও অবিচল রাজনৈতিক ভিত তৈরিতে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। পরিশেষে, এই অনন্য কৌশলের মাধ্যমেই তিনি নিজের রাজকীয় কর্তৃত্বকে ধর্মীয় অনুশাসনের ঊর্ধ্বে একচ্ছত্র ও নিষ্কণ্টক করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ঘ। সুকান্তর পঙ্কসিলা: ইন্দোনেশিয়ার আধুনিক দর্শন।
সম্রাট আকবরের বহুত্ববাদী ও সমন্বয়বাদী কৌশলের এক চমৎকার আধুনিক রূপান্তর ঘটে হাজার হাজার द्वीप ও শত শত জাতি-ধর্মের দেশ ইন্দোনেশিয়ায়। ১৯৪৫ সালে স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকান্ত 'পঙ্কসিলা' (Pancasila) নামক একটি অবিভাজ্য রাষ্ট্রীয় দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন। এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, মানবিকতা, জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচার—এই পাঁচটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে এই দর্শনটি দাঁড়িয়ে ছিল। পরিশেষে, এই প্রগতিশীল ভাবনার মূল লক্ষ্যই ছিল ঔপনিবেশিক শাসন-উত্তর একটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন জাতিকে একক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সুসংহত করা।
ঙ। সমন্বয়বাদী জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় সংহতি।
পঙ্কসিলা কোনো প্রথাগত বা আলাদা ধর্ম ছিল না, তবে এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে একটি অসাম্প্রদায়িক ও সমন্বয়বাদী জাতীয়তাবাদ তৈরি করা। সম্রাট আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহীর রাজনৈতিক দর্শনের মতোই, বহুত্ববাদী এই সমাজকে এক সুতোয় বাঁধতে একে দেশের সংবিধানে মূল নীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক, রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক সংস্থাই এই রাষ্ট্রীয় দর্শন বা আচরণবিধি মেনে চলতে আইনগতভাবে বাধ্য থাকে। পরিশেষে, এই অনন্য মতাদর্শই বিভিন্ন দ্বীপে বিভক্ত ও ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময় ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রীয় সংহতি ও অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখার প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
৪
মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এবং 'কামালবাদ': খেলাফতের ধ্বংসস্তূপে আধুনিকতার ছাঁচ।
ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে দেখা গেছে, বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় সাম্রাজ্য বা নবগঠিত রাষ্ট্রকে একক আদর্শিক সূত্রে বেঁধে রাখতে শাসকেরা নিজস্ব দর্শন বা রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের আশ্রয় নেন। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের 'ধম্ম' কিংবা ষোড়শ শতকে মুঘল সম্রাট আকবরের 'দ্বীন-ই-ইলাহী' কোনো প্রথাগত ধর্ম ছিল না; বরং তা ছিল political unity (রাজনৈতিক ঐক্য) ও সামাজিক পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখার রাজকীয় কৌশল। বিংশ শতাব্দীতে এসে এই একই মনস্তাত্ত্বিক ধারার এক চরম ও আধুনিক প্রকাশ দেখা যায় মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের 'কামালবাদ' (Kemalism) বা ‘সেন্ট্রাল সেকুলার ডগমা’-র মধ্যে। ১৯২২ সালে উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি সমাজকে রাতারাতি প্রথাগত ইসলামি ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিমা ও ধর্মনিরপেক্ষ ছাঁচে ফেলার যে রূপান্তর প্রক্রিয়া আতাতুর্ক শুরু করেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘সিভিল রিলিজিয়ন’ বা নাগরিক ধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
ক। কামালবাদের 'ছয়টি স্তম্ভ'।
আতাতুর্ক তাঁর নতুন তুরস্ককে যে আদর্শিক ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, তা কামালবাদের 'ছয়টি স্তম্ভ' (Six Arrows) নামে পরিচিত। এটি ছিল মূলত ইউরোপীয় আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের একটি রাষ্ট্রীয় রূপ:
১. প্রজাতন্ত্রবাদ: রাজতন্ত্র ও মধ্যযুগীয় খেলাফতের সম্পূর্ণ অবসান।
২. জাতীয়তাবাদ: বহুজাতিভিত্তিক উসমানীয় পরিচয়ের বদলে একক ও অবিভাজ্য 'তুর্কি' জাতীয়তাবাদ।
৩. জনতাবাদ: শ্রেণির বৈষম্য ঊর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরের জনগণের সার্বভৌমত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠা।
৪. রাষ্ট্রবাদ: দেশের অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নের দ্রুত উন্নয়নে রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ।
৫. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ: রাষ্ট্র, শিক্ষা ও সমাজজীবন থেকে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব সম্পূর্ণ দূর করা।
৬. বিপ্লববাদ: সমাজকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে ঐতিহ্যগত স্থবিরতা ভেঙে ক্রমাগত প্রগতিশীল সংস্কার।
খ। বর্ণমালা পরিবর্তন: স্মৃতির বিনির্মাণ ও অতীত বিচ্ছেদ।
কামালবাদের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও র্যাডিক্যাল সংস্কার ছিল ১৯২৮ সালের তুর্কি বর্ণমালা আইন। শত শত বছর ধরে তুর্কি ভাষা লেখা হতো আরবি ও ফারসি হরফে। আতাতুর্ক তা আইন করে নিষিদ্ধ করেন এবং ল্যাটিন বা রোমান হরফ প্রবর্তন করেন। এর উদ্দেশ্য কেবল শিক্ষার হার বাড়ানো ছিল না; এর গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল উসমানীয় এবং ইসলামি অতীতের সাথে আধুনিক তুর্কি প্রজন্মের ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাতারাতি এক প্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের লেখা বই, আইনি দলিল এবং ধর্মীয় সাহিত্য পড়ার যোগ্যতা হারায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের 'ইমাজিন্ড কমিউনিটিজ' তত্ত্ব অনুযায়ী, এটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক তুর্কি জাতিসত্তা 'কল্পনা' করার রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।
গ। হাগিয়া সোফিয়া: পবিত্র স্থান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ জাদুঘর।
সাংস্কৃতিক রূপান্তরের আরেকটি বড় প্রতীকী পদক্ষেপ ছিল ১৯৩৪ সালে ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক হাগিয়া সোফিয়াকে (Hagia Sophia) মসজিদ থেকে জাদুঘরে রূপান্তর করা। বাইজান্টাইন আমলের এই বিশাল চার্চটিকে সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ ইস্তাম্বুল বিজয়ের পর মসজিদে রূপান্তরিত করেছিলেন, যা ছিল দীর্ঘকাল ধরে উসমানীয় গৌরবের সর্বোচ্চ প্রতীক। আতাতুর্কের মন্ত্রিসভা এটিকে জাদুঘরে পরিণত করে বিশ্বকে এই স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, নতুন তুরস্ক আর কোনো ইসলামি খেলাফতের উত্তরাধিকার বহন করে না; বরং এটি এখন একটি ধর্মনিরপেক্ষ, বিজ্ঞানমনস্ক এবং বৈস্মিক ঐতিহ্যের অংশীদার। (উল্লেখ্য, এই ধর্মনিরপেক্ষকরণ প্রক্রিয়ার প্রতীকী চাপ বজায় রাখতে সে সময় সুলতান আহমেদ মসজিদ বা ব্লু মস্ক-কেও সাময়িকভাবে বন্ধ ও আংশিক ব্যবহার করা হয়েছিল)।
ঘ। পোশাক সংস্কার ও ধর্মীয় প্রতীকের অবসান।
১৯২৫ সালে 'হ্যাট ল' পাসের মাধ্যমে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় টুপি বা 'ফেজ' পরা আইনিভাবে নিষিদ্ধ করা হয় এবং পুরুষদের জন্য পশ্চিমা ধাঁচের হ্যাট পরা বাধ্যতামুলক করা হয়। একই সাথে সুফি তরিকা ও দরগাহগুলোর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রাচীন ভারতে সম্রাট অশোক যেমন তাঁর ধম্ম প্রচারের জন্য 'ধম্ম-মহামাত্র' নিয়োগ করেছিলেন, আতাতুর্ক তেমনি রাষ্ট্রীয়ভাবে 'দিয়ানত' গঠন করেন। এর মাধ্যমে ধর্মের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অর্থাৎ, ধর্মীয় আচার থাকবে, কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হবে কামালবাদী রাষ্ট্রের সেকুলার নির্দেশিকা ও আইনি পরিধির মধ্যে।
ঙ। মুয়াম্মার গাদ্দাফির 'সবুজ কিতাব' (লিবিয়া)।
আতাতুর্কের মতো বিংশ শতকের আরেকজন শাসক নিজের রাজনৈতিক-সামাজিক দর্শন রাষ্ট্রীয় ছাঁচে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন; তিনি লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ১৯৭৫ সালে তিনি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শন নিয়ে প্রকাশ করেন 'দ্য গ্রিন বুক' (The Green Book)। তিনি সমসাময়িক পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্র—দুটিকেই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে একটি 'তৃতীয় আন্তর্জাতিক তত্ত্ব' (Third Universal Theory) প্রদান করেন। গাদ্দাফি লিবিয়ার পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে এই বইয়ের দর্শনের আলোকে সাজাতে চেয়েছিলেন, যা সম্রাট অশোকের ধম্মের মতোই একটি রাষ্ট্রপ্রধানের নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত জীবনবিধান ও রাষ্ট্রীয় অনুশাসন ছিল।
৫
তিন শাসকের দর্শনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ।
সম্রাট অশোক, সম্রাট আকবর এবং মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পদ্ধতি ভিন্ন হলেও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সংহতি। রোমিলা থাপারের (Asoka and the Decline of the Mauryas) মতে, কলিঙ্গ যুদ্ধ-উত্তর মৌর্য সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে অশোক আধ্যাত্মিক নৈতিকতা ও অহিংসাকে সামাজিক হাতিয়ার করেন; অন্যদিকে ইরফান হাবিবের (Akbar and His India) বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুঘল সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বে আকবর সুফিবাদ ও সর্বধর্মের নির্যাস নিয়ে 'সুলহ-ই-কুল' বা সর্বজনীন শান্তির মাধ্যমে রাজকীয় আনুগত্য গঠন করেছিলেন। এর বিপরীতে বার্নার্ড লুইসের (The Emergence of Modern Turkey) মতে, উসমানীয় খেলাফতের পতনের পর আতাতুর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত পথ বেছে নিয়ে তীব্র ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও পশ্চিমা আধুনিকীকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব উচ্ছেদ করেন।
এই তিন শাসকের রাষ্ট্রীয় দর্শন বাস্তবায়নের কৌশলগুলোর মধ্যেও গভীর রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের মিল ও অমিল স্পষ্ট ধরা পড়ে। নয়নজ্যোত লাহিরীর (Ashoka in Ancient India) বর্ণনা অনুযায়ী, অশোক স্তম্ভে লিপি খোদাই ও 'ধম্ম-মহামাত্র' নিয়োগ করে ওপর থেকে তাঁর অনুশাসন প্রচার করেছিলেন, যেখানে এম. আথার আলীর (Mughal India) মতে, আকবর কেবল দরবারের নির্দিষ্ট অভিজাতদের দীক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাঁর দর্শনের পরিধি সীমিত রেখেছিলেন। অপরদিকে এরিক জে. জুরচারের (Turkey: A Modern History) গবেষণা দেখায়, আতাতুর্ক তাঁর কামালবাদ প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন (যেমন বর্ণমালা বদল, হ্যাট ল) ও সরাসরি রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেন। প্রাচীন ও মধ্যযুগের শাসকেরা যেখানে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ধর্মকে নমনীয় করেছিলেন, আধুনিক যুগের আতাতুর্ক সেখানে নতুন প্রজাতন্ত্রের ভিত গড়তে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত করার কঠোর পথ বেছে নিয়েছিলেন।
৬
ইতিহাসের গতিপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রপ্রধানেরা যখনই ওপর থেকে কোনো 'রাজনৈতিক ধর্ম' বা কৃত্রিম সামাজিক ছাঁচ চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন, তা সাময়িকভাবে সফল হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সম্রাট আকবরের 'দ্বীন-ই-ইলাহী' যেমন তাঁর দরবারের বাইরে আমজনতার মন জয় করতে পারেনি, মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের 'কামালবাদ' বা মুয়াম্মার গাদ্দাফির 'সবুজ কিতাব'-ও তেমনি সমাজের গভীর মজ্জায় লুকিয়ে থাকা ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে লিবিয়ার নাটকীয় শাসনবদল কিংবা আধুনিক তুরস্কের রাজনীতিতে ইসলামের নতুন মাত্রায় পুনরুত্থান এবং ২০২০ সালে হাগিয়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তর—তা স্পষ্ট করে দেয় যে, মানুষের মজ্জাগত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রীয় ডিক্রি দিয়ে চিরতরে অবদমিত করা যায় না। মানুষের সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব দীর্ঘ সময় পর হলেও তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ভারসাম্য বজায় রাখার পথ খুঁজে নেয়।
প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক—তিনটি ভিন্ন কালখণ্ডের এই রাজনৈতিক দর্শনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে শাসকদের মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের এক চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠে। সম্রাট অশোক এবং সম্রাট আকবর যেখানে বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সমাজকে একসূত্রে বাঁধতে প্রথাগত ধর্মীয় চেতনাকে নমনীয় ও সমন্বয়বাদী করার কৌশল নিয়েছিলেন, আতাতুর্ক সেখানে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনে মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভাঙতে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত করার 'র্যাডিক্যাল সেকুলার' পথ বেছে নেন। প্রাচীন যুগে অহিংসა ও স্তম্ভলিপির মাধ্যমে নৈতিক আচরণবিধি প্রচারের যে রাজকীয় প্রয়াস ছিল, আধুনিক যুগে তা রূপান্তরিত হয়েছে কঠোর আইন প্রণয়ন, বর্ণমালা পরিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের ছদ্মাবরণে। তবে কৌশলগত বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও, প্রতিটি দর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল এক—একক আইডেন্টিটি বা পরিচয়ের আড়ালে নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাকে সুসংহত করা।
পরিশেষে বলা যায়, সম্রাট অশোকের 'ধম্ম', আকবরের 'দ্বীন-ই-ইলাহী', সুকান্তর 'পঙ্কসিলা' কিংবা আতাতুর্কের 'কামালবাদ'—কোনোটিই স্রেফ খেয়ালি ভাববিলাস ছিল না, বরং তা ছিল বিশাল ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষার একেকটি চরম বাস্তবমুখী রাষ্ট্রীয় কৌশল। যখনই কোনো রাষ্ট্রनायक সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে নিজেই 'দার্শনিক' বা 'আদর্শিক পথপ্রদর্শক'-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তখনই জন্ম নিয়েছে এমন সব অনন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরীক্ষা। যুগ, মাধ্যম এবং প্রচারের ভাষা বদলে গেলেও, বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে একক আদর্শিক সুতায় বেঁধে পরম আনুগত্য লাভ করার এই রাজকীয় প্রবৃত্তিটি মানব সভ্যতায় চিরন্তন ও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। তবে আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে কামালবাদের মতো তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও ভাষাগত রূপান্তরের ঘটনা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য উদাহরণ হিসেবেই চিরকাল চিহ্নিত থাকবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৭ জুন ২০২৬