
১
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মেরুকরণ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ডালপালা মেলছে যা বিশ্বমঞ্চের গতিপথ নির্ধারণকারী প্রধান শক্তিগুলোর কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। দীর্ঘদিন শীতল সম্পর্কের বেড়াজালে আটকে থাকার পর, সুন্নি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দুই সামরিক পরাশক্তি মিসর এবং তুরস্ক তাদের অতীত বৈরিতা ও মতাদর্শগত তিক্ততা ভুলে এক সম্পূর্ণ নতুন কৌশলগত সামরিক, গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলছে। ইরানের ওপর পশ্চিমা ও ইসরাইলি আগ্রাসনের হুমকি, গাজা সংকট এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সম্পদ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কায়রো ও আঙ্কারার এই ঘনিষ্ঠতা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই এই মঞ্চে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান। পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ১৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে আঙ্কারা সফর এবং সামরিক নীতিনির্ধারকদের সাথে বৈঠক এই সমীকরণকে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থেকে উন্নীত করে একটি শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় ‘প্রতিরক্ষা অক্ষ’ বা ‘সামরিক ত্রয়ী’র দিকে ধাবিত করছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের একচ্ছত্র নীতি নির্ধারণী কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে এই উদীয়মান জোটটি যেভাবে ক্ষমতা ও নিরাপত্তার নিজস্ব ভারসাম্য তৈরি করতে যাচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্য তথা বৈশ্বিক প্রতিরক্ষার ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে।
২
কায়রো-আঙ্কারা সামরিক অংশীদারত্ব: বিমান মহড়া থেকে পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার প্রজেক্ট।
মিসর ও তুরস্কের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক এখন কেবল ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক করমর্দন বা টেবিলে বসে নেওয়া মৌখিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত বাস্তব, দৃশ্যমান এবং বিধ্বংসী সামরিক রূপ পরিগ্রহ করেছে।
ক। যৌথ বিমান ও নৌমহড়ার সফল পুনরাবৃত্তি।
দীর্ঘ ১৩ বছরের এক চরম কূটনৈতিক ও সামরিক বরফদশার অবসান ঘটিয়ে গত বছর পূর্ব ভূমধ্যসাগরে দুই দেশ তাদের ঐতিহাসিক যৌথ নৌ-অনুশীলন ‘সি অব ফ্রেন্ডশিপ’ পুনরায় শুরু করার মাধ্যমে সামরিক ক্ষেত্রে এক বড় চমক সৃষ্টি করে। এর সফল ধারাবাহিকতা হিসেবে, অতি সম্প্রতি মিসরের মাটিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও তাৎপর্যপূর্ণ যৌথ বিমান মহড়া পরিচালিত হয়েছে, যা দুই দেশের বিমানবাহিনীর আকাশযুদ্ধে একযোগে কমান্ড করার সামর্থ্যকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।
খ। স্টিলথ ফাইটার ‘কান’ প্রজেক্টে মিসরের সংযুক্তি।
দুই দেশের সামরিক ও প্রযুক্তিগত ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও যুগান্তকারী মাইলফলক হলো তুরস্কের নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার জেট 'কান'-এর উন্নয়ন ও উৎপাদন সহযোগী অংশীদার হিসেবে মিসরের সরাসরি যুক্ত হওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। রাডারে সহজে ধরা না পড়া এবং আকাশযুদ্ধে চরম আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম এই যুদ্ধবিমানটি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ দুটির বিমানবাহিনীতে যুক্ত করার চূড়ান্ত লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, যা তেল আবিবের একক আকাশ আধিপত্যকে মারাত্মকভাবে কোণঠাসা করবে।
গ। আসেলসানের আঞ্চলিক আধিপত্য ও প্রযুক্তিগত স্থানীয়করণ।
তুরস্কের বিশ্ববিখ্যাত এবং শীর্ষস্থানীয় সরকারি প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘আসেলসান’ অতি সম্প্রতি কায়রোতে ‘আসেলসান ইজিপ্ট’ নামে তাদের পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক প্রতিনিধি কার্যালয় চালু করেছে। এর সমান্তরালে, দেশ দুটি চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন, ভারী চালকবিহীন স্থলযান (UGV) এবং দূরপাল্লার কামানের আধুনিক গোলা যৌথভাবে উৎপাদন করার জন্য বেশ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চুক্তি সই করেছে, যা মিসরের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের পশ্চিমা উৎসের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে।
৩
চতুর্মুখী চার্টার ও ‘আরব-ইসলামিক কোয়াড’ গঠনের রূপরেখা।
আঙ্কারা এবং কায়রোর এই প্রতিরক্ষা বলয় নিজেদের দ্বিপক্ষীয় ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর অঞ্চলের সুন্নি পরাশক্তিগুলোকে একক প্ল্যাটফর্মে আনার দূরদর্শী মিশন নিয়ে এগোচ্ছে।
ক। আলামেইনের চারপক্ষীয় বৈঠক।
মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় শহর আলামেইনে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক চতুর্থ বৈঠকে মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অভূতপূর্ব সম্মিলন ঘটে। এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল কেবল দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট চারপক্ষীয় কৌশলগত প্রতিরক্ষা কাঠামো বা ‘আরব-ইসলামিক কোয়াড’ গড়ে তোলা।
খ। ত্রিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম এবং সম্পদের মহাজোট।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক গবেষক মোহাম্মদ আবেদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই উদীয়মান জোটটি কেবল কোনো কাগজের চুক্তি নয়, বরং এটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উপাদানের সংমিশ্রণ। তুরস্কের বিশ্বমানের উচ্চ সামরিক প্রযুক্তি ও আধুনিক অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা, সৌদি আরবের সুবিশাল অফুরন্ত আর্থিক তারল্য ও বিনিয়োগ সক্ষমতা এবং মিসর ও পাকিস্তানের বিশাল পেশাদার সামরিক জনবল, যুদ্ধবিদ্যা ও পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তির এই বৈপ্লবিক সমন্বয় ঘটলে তা বৈশ্বিক শক্তির মানচিত্রে অপরাজেয় এক সামরিক ব্লক তৈরি করতে পারে।
৪
আঙ্কারায় পাক সেনাপ্রধানের সফর: ত্রিমুখী সামরিক সমীকরণের নতুন চালিকাশক্তি।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সাম্প্রতিক আঙ্কারা সফরটি কোনো সাধারণ বা প্রথাগত সৌজন্যমূলক দ্বিপক্ষীয় সফর না; বরং তা এই অঞ্চলের উদীয়মান প্রতিরক্ষা অক্ষের সমীকরণে এক নতুন গতিবেগ সঞ্চারের মোক্ষম মোড়। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে পাকিস্তানের এই অন্তর্ভুক্তি কায়রো ও আঙ্কারার মধ্যকার উদীয়মান সামরিক যোগাযোগকে সম্পূর্ণ নতুন একটি কৌশলগত মাত্রায় উন্নীত করেছে। রাওয়ালপিন্ডির বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনীকে মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে যুক্ত করার মাধ্যমে তুরস্ক আসলে মুসলিম বিশ্বের প্রধান প্রধান সামরিক শক্তিগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট একক প্ল্যাটফর্মে আনার মিশনকে অনেকখানি এগিয়ে নিলো। আঙ্কারায় তুর্কি প্রতিরক্ষা শিল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে পাক সেনাপ্রধানের উচ্চপর্যায়ের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তির সাথে পাকিস্তানের নিজস্ব ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল প্রযুক্তির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র তুরস্ক এবং কৌশলগত অবস্থানে থাকা মিসরের সাথে পাকিস্তানের এই নতুন রসায়ন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের একচ্ছত্র নীতি নির্ধারণী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধী প্রাচীর গড়ে তোলার স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
এই সফরের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অর্জন ছিল তুরস্ক ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর নিয়মিত যৌথ মহড়াসমূহে মিসরকে পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক আলোচনা সম্পন্ন করা। এর ফলে, মিসরের সুবিশাল ও আধুনিক বিমানবহর এখন তুর্কি প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের যুদ্ধকৌশলের সাথে সমন্বিত হয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যৌথ অপারেশনের সামর্থ্য অর্জন করবে। প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে তুরস্ক তাদের বিশ্বখ্যাত চালকবিহীন ড্রোন প্রযুক্তির ইলেকট্রনিক্স ও এভিওনিক্স ব্যবস্থা পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে আরও উন্নত করার বিষয়ে একমত হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনবে। তিন দেশের শীর্ষ সামরিক নীতিনির্ধারকদের এই গভীর ও সরাসরি যোগাযোগ প্রমাণ করে যে, এটি কেবল কোনো লোকদেখানো রাজনৈতিক জোট নয়, বরং সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবমুখী এক সামরিক অংশীদারত্ব। পাকিস্তানের পারমাণবিক ও পর্বতসম সামরিক জনবল, তুরস্কের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং মিসরের লজিস্টিক ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের এই ত্রিমুখী মহাসম্মিলন মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর ক্ষমতার ভারসাম্যকে চিরতরে বদলে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
৫
ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের তীব্র উদ্বেগ: ক্ষমতার ভারসাম্য হারানোর শঙ্কা।
মিডল ইস্ট মনিটরের বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, কায়রো, আঙ্কারা এবং রাওয়ালপিন্ডির এই ক্রমবর্ধমান সামরিক বোঝাপড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। এই তিন বৃহৎ মুসলিম দেশের মধ্যকার অভূতপূর্ব প্রতিরক্ষা সমন্বয় মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলে মার্কিন মদদে চলা ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে উল্টে দিয়ে এই ত্রিমুখী অক্ষ ক্ষমতার এক নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরি করতে যাচ্ছে। ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই উদীয়মান সামরিক ব্লকটির প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে এবং একে তাদের কৌশলগত স্বার্থের জন্য বড় হুমকি মনে করছে।
ক। আমেরিকার কৈফিয়ত তলব।
তুর্কি ও মিসরীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান বৈঠক এবং সামরিক সরঞ্জামের লাইসেন্সিং চুক্তির গভীরতা ও গতি দেখে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে কায়রোর জেনারেলদের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতো চরম ইসরাইল-পন্থী নেতৃত্বের উপস্থিতিতেও এই সামরিক অক্ষ মার্কিন রক্তচক্ষুকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজেদের স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা নীতিতে অবিচল রয়েছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই ত্রিপক্ষীয় সমীকরণকে ভাঙার প্রচ্ছন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও তিন দেশের সামরিক কূটনীতি নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা আশঙ্কা করছেন যে, এই অক্ষের কারণে ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সিদ্ধান্তগুলোতে মার্কিন হস্তক্ষেপের সুযোগ চিরতরে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
খ। ইসরাইলের অস্তিত্বের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ।
ইসরাইলের প্রধান সামরিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যমগুলো খোলামেলা স্বীকার করছে যে, মিসরের সুবিশাল আধুনিক সমরাস্ত্রের ভাণ্ডার এবং তাদের নতুন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর ‘দ্য অক্টাগন’-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এক বড় উদ্বেগ। এর সাথে তুরস্কের ড্রোন ও পঞ্চম প্রজন্মের রাডার-ফাঁকি প্রযুক্তির মেলবন্ধন এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক ও কৌশলগত সামরিক ব্যাকআপ তেল আবিবের জন্য এক ভয়াবহ ভূরাজনৈতিক ও সামরিক দুঃস্বপ্ন তৈরি করছে। তেল আবিবের নীতিনির্ধারকরা বিশেষভাবে শঙ্কিত কারণ এই যৌথ শক্তির কারণে আকাশে ইসরাইলি বিমানবাহিনীর দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য ও দাপট মারাত্মকভাবে খর্ব হতে পারে। সর্বোপরি, গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মাঝে এই ধরনের একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ মুসলিম সামরিক ব্লকের উত্থান ইসরাইলের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের নীতিকে পুরোপুরি থমকে দেবে।
৬
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্র।
এই গভীর ও টেকসই সামরিক অক্ষ কেবল কামানের গোলা আর যুদ্ধবিমানের চ্যাসিসের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং এর নিচে রয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের মজবুত ভিত। দেশগুলো ২০২৮ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৯ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ১৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার চুক্তি কার্যকর করার পাশাপাশি মিসরে তুর্কি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, এই অক্ষ লিবিয়ার দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধে কায়রো-আঙ্কারার যৌথ রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আঞ্চলিক বিরোধের টেকসই সমাধানের পথ প্রশস্ত করছে। সর্বোপরি, সুয়েজ খাল এবং লোহিত সাগরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুট ও সামুদ্রিক চ্যানেল রক্ষায় পশ্চিমা নৌবাহিনীর আধিপত্যের বিকল্প গড়ে তোলাই এই উদীয়মান ব্লকের প্রধান লক্ষ্য। এরফলে সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ভূ-অর্থনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি হচ্ছে, যা এই জোটকে দীর্ঘ মেয়াদে স্বনির্ভর ও টেকসই করে তুলবে।
৭
তুরস্ক, মিসর এবং পাকিস্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা অক্ষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা মানচিত্রকে সম্পূর্ণ নতুন করে অঙ্কন করার সক্ষমতা রাখে। দীর্ঘকাল ধরে এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রতিরক্ষার জন্য পশ্চিমা শক্তির ছাতার নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, যা তাদের সার্বভৌমত্বকে চরম সংকটে ফেলেছিল। কিন্তু বর্তমান ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের চরম ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় এ অঞ্চলের নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলে দিয়েছে এবং তারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একমাত্র পথ হলো নিজস্ব আধুনিক সমরাস্ত্রের সক্ষমতা এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক সামরিক জোট গঠন করা। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিতর্কিত গ্যাস ফিল্ডের নিরাপত্তা এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজ খালের সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই জোটটি একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য স্থানীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারে। যদি কায়রো, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের এই সামরিক অক্ষ তাদের প্রযুক্তির বিনিময়, যৌথ অর্থায়ন এবং রণকৌশলগত বোঝাপড়াকে অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই তিন পরাশক্তি মিলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় এমন এক অপরাজেয় দেয়াল গড়ে তুলবে, যা যেকোনো বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ডিটারেন্স হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, এই উদীয়মান শক্তির উত্থান ও ফলাফল বিশ্বরাজনীতিতে পশ্চিমা একমেরুকেন্দ্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে মাল্টি পোলার বিশ্বব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করছে, যা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার সমীকরণকে পাল্টে দেবে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তাদের ঐতিহ্যবাহী কৌশলগত অস্ত্র—যেমন নিষেধাজ্ঞা জারি, অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং সামরিক সাহায্য বন্ধ করার প্রচ্ছন্ন হুমকি প্রয়োগ করে এই জোটকে ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বরাজনীতির এই সন্ধিক্ষণে এসে আঙ্কারা, কায়রো বা রাওয়ালপিন্ডির কেউই আর পিছপা হতে রাজি নয়, কারণ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এই জোটকে সফল করা এখন তাদের সময়ের দাবি। তুরস্কের সামরিক ও প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতা, মিসরের ভৌগোলিক ও সমরাস্ত্রের উপযোগিতা এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক ও পর্বতসম সামরিক শক্তির এই ঐতিহাসিক মহা-সম্মিলন কেবল ইসরাইলের বেপরোয়া আঞ্চলিক আধিপত্যকেই লাগাম পরাবে না, বরং লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের জলসীমাকে পশ্চিমা করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৬ জুলাই ২০২৬