
১
টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী।
হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।।
বেগ সংসার বড্হিল জাঅ।
দুহিল দুধু কি বেন্টে ষামাঅ।।
বলদ বিআএল গবিআ বাঝেঁ।
পিটা দুহিএ এ তিনা সাঝ্যেঁ।।
জো সো বুধী সৌধ নিবুধী
জো ষো চৌর সৌ দুষাধী।।
নিতে নিতে ষিআলা ষিহে ষম জুঝঅ
ঢেন্টণপাএর গীত বি(চি)রলেঁ বুঝঅ।।
আমাদের খুব পরিচিত একটা চর্যাগীতি, লেখা হয়েছে অপভ্রংশ এবং পয়ারের মাঝামাঝি পাদাকুলক ভিত্তিক একটি ছন্দে। লিখেছিলেন সিদ্ধাচার্য ঢেন্টণপাদানাং। ১৯০৭ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের পুঁথিশালা থেকে চর্যাপদগুলো আবিষ্কার করে ‘চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়’ নামে যে বইটি প্রকাশ করেছিলেন তার ৩৩ নাম্বার চর্যাগীতি এটি। একদিকে এগুলো যেমন বাঙলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন আবার অন্যদিকে বিশিষ্ট একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের সাধনসঙ্গীতও বটে। তাই এই চর্যাগীতিগুলো একসময় সুর করে গাওয়া হতো। সুরের ধরণটা কিরকম হতে পারে বা কিভাবে গাওয়া হতো তা নিশ্চিতভাবে জানার উপায় নেই। শ্রী রাজ্যেশ্বর মিত্র ‘বাঙলার সঙ্গীত’ প্রথম খণ্ডে উল্লেখ করেছেন যে সঙ্গীতরত্নাকরে চর্যার গায়েন রীতি সম্পর্কে কিছু আলোচনা আছে কিন্তু সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা যায়না। ডঃ নীহাররঞ্জন রায় বলেছেন, ‘এগুলি প্রায় সমসাময়িক লোচন পণ্ডিতের রাগতরঙ্গিণী বা কিছু পরবর্তীকালের শার্ঙ্গদেবের সঙ্গীত রত্নাকরের (১২১০-১২৪৭ খৃস্টাব্দ) পদ্ধতি অনুযায়ী গাওয়া হত কিনা বলা কঠিন’। এতে ব্যবহৃত হয়েছে রাগ পটমঞ্জুরী। আসলে সব ধর্মেই কবিতা আর সুরের কোথায় যেন একটা টান আছে।
জনপ্রিয় মত চর্যাগীতিগুলো রচিত হয়েছে ১০০০ থেকে ১২০০ খৃস্টাব্দের মধ্যে। ডঃ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এরকম মত দিলেও ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ, রাহুল সংকৃত্যায়নের মতে এই গীতিগুলি আরো পুরাতন, ৮ম শতাব্দীর দিকে। তবে তখনো যেহেতু বাঙলাভাষার উদ্ভব ঘটেনি তাই ধারণা করা হয় যে চর্যাগুলি অপভ্রংশ অবহট্ঠে রচিত হয়েছিল এবং পরে গায়েনদের মুখে মুখে অথবা অনুবাদ করে এগুলিকে ১০-১২ শতাব্দীর দিকে প্রাচীন বাঙলা ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছিল। ডঃ সুনীতি কুমারের মতে যেহেতু চর্যাগুলি প্রাচীন বাঙলায় রূপান্তরিত হয়েছে সেহেতু এর রূপ কখনো অপভ্রংশ বা অপভ্রংশ গন্ধী-অপভ্রংশ মাগধী, আবার কখনো অর্ধ মাগধী বা শৌরসেনী। চর্যাগীতির মধ্যেই সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে মাগধী অপভ্রংশ থেকে উদ্ভুত বাঙলার প্রথম ব্যবহার ঘটেছে। সেযুগে ভাষা হিসেবে শৌরসেনী অপভ্রংশ সুপ্রতিষ্ঠিত, অভিজাত মহলে প্রচলিত এবং লিপিকারদেরও প্রাচীন বাঙলা ভাষার চেয়ে শৌরসেনী অপভ্রংশ ভাষাটা ভালোভাবে জানা থাকায় চর্যাপদের মধ্যে এই ভাষার শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
এই চর্যাগীতিটিতে যে অঞ্চলের ছাপ পাওয়া যায় তা সম্ভবত প্রাচীন সিলহট্ট (শ্রীহট্ট/পাট্টিকের), চাটিগাঁ, কামরূপ কমতা অঞ্চলের। তবে ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত মনেকরেন চর্যার বিষয়বস্তু ঠিক আধুনিক কালের ভৌগলিক সীমায় আবদ্ধ বাঙলার নয়, সেসময়ের বাঙলা ছিল আরো বিস্তৃত তাই বর্তমান বাঙলার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভাষার কিছু শব্দ এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। রাহুল সংকৃত্যায়ন সম্ভবত এখানেই ভুল করে একে প্রাচীন ওড়িয়া বা বিহারী বলে মনে করেছেন।
আপাত দৃষ্টিতে বা বর্তমান কালের বাঙলায় এই চর্যাগীতিটির অর্থ করলে দাঁড়ায়, টিলায় আমার ঘর, প্রতিবেশী নেই। হাড়িতে ভাত নেই, নিত্যই ক্ষুধিত (অতিথি)। (অথচ আমার) ব্যাঙের সংসার বেড়েই চলেছে (ব্যাঙের যেমন অসংখ্য ব্যাঙাচি বা সন্তান, তেমনি আমার সন্তানের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান)। দোয়ানো দুধ আবার বাঁটে ঢুকে যাচ্ছে (যে খাদ্য প্রস্তুত তাও নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে)। তবে এই চর্যাগীতিগুলোর গূঢ় অর্থও কিন্তু আছে। সেজন্যই হয়তো হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন যে এই চর্যাগুলি সন্ধ্যাভাষায় লেখা। তবে চর্যাগীতি সবগুলিই কিন্তু এ ভাষায় লেখা হয়নি। শুধুমাত্র ৩৩ এবং ২ নাম্বার চর্যাপদ পুরোপুরি সন্ধ্যাভাষায় রচিত, বাকীগুলিতে আংশিক বা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে একটা কথা বলে রাখি, সন্ধ্যা আসলে কোন বিশিষ্ট ভাষা নয়, এটি আসলে একধরণের সাঙ্কেতিক প্রয়োগ রীতি। ভাষার কিছু কিছু বিশিষ্ট শব্দ নির্দিষ্ট আভিধানিক অর্থে বা পরিচিত পারিভাষিক অর্থে প্রযুক্ত না হয়ে অন্য কোন প্রতিকী অর্থে প্রযুক্ত হতে পারে। তবে কোন্ শব্দটি কি অর্থে প্রযুক্ত হবে তা সেই সম্প্রদায়ের মধ্যে পূর্ব নির্দিষ্ট। সহজিয়া তত্ত্বের বা তান্ত্রিক ধর্মাচরণে গোপনীয়তা অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এজন্যই আসলে চর্যাগীতিগুলোতে সন্ধ্যা ভাষার সাঙ্কেতিক প্রয়োগরীতির সমাহার ঘটেছে। বিশেষত তান্ত্রিক পদ্ধতিতে অনেক সময় যৌন যৌগিক আচার অনুষ্ঠান থাকে, যা স্পষ্ট ভাষায় বা প্রকাশ্যে বলা যায়না, হয়তো সেজন্যই সান্ধ্যরীতির উদ্ভব ঘটেছে।
২
চর্যাগীতির ভাষার এই অস্পষ্টতা বা হেঁয়ালি ভাব শুধু এগুলিরই বৈশিষ্ট্য নয়, মধ্যযুগীয় সাধু-সাধকদের সবার কবিতাতেই এই হেঁয়ালিভাব ফুটে উঠেছে। কবীর, বাঙলার সহজিয়া বৈষ্ণব, বাউল, নাথপন্থী সবার সঙ্গীতের ভাষাই কমবেশি একই রকম, উপমা উৎপ্রেক্ষাও এক, হেঁয়ালিপনাও এক। এই হেঁয়ালিপনার কারণ জানতে হলে যেসময়ে এটি লেখা হয়েছিল সে সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপটটা একটু আলোচনা করা দরকার। চর্যাগীতগুলির বিষয়বস্তু সহজিয়া বৌদ্ধ সাধনপদ্ধতি সম্পর্কিত। বাঙলার এই সহজিয়া বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় যে, যেসময়ে এগুলি লেখা হয়েছে তখন বৌদ্ধ ধর্মের বিবর্ণ দশা চলছে। আসলে পালযুগ পর্যন্তই বৌদ্ধ ধর্ম বাঙলাদেশে রাজানুকুল্য লাভ করেছিল এবং এযুগেই তা তান্ত্রিকতার স্পর্শে পরিবর্তিতও হয়ে গিয়েছিল। সেনযুগে বৌদ্ধ ধর্ম শুধু রাজানুকুল্য থেকে বঞ্চিতই হয়নি তাদের নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছে। সেন আমলে অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ/ বিহার ধ্বংস করা হয়েছিল এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রাণ বাঁচাতে নেপাল- তিব্বতের দিকে পালিয়ে যেতে হয়। সেকারণেই চর্যাগীতিগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে নেপালে, বাঙলার মাটিতে নয়।
এবার এই ৩৩ নাম্বার চর্যাগীতিটির গূঢ় অর্থে যাওয়া যাক। চর্যাপদে কবি বলেছেন, টিলার ওপরে আমার ঘর, সেখানে প্রতিবেশী কেউ নেই; হাড়িতে ভাত নেই তবু নিত্যই অতিথির ভিড় লেগেই থাকে। এর রূপক অর্থ, অসদ্রূপ কায় বাক্ চিত্তের সমস্ত প্রকৃতিদোষ যে মহাসুখচক্রে লয়প্রাপ্ত হয়েছে, তান্ত্রিকদের মতে, সেই মহাসুখচক্র কায়ারূপ পর্বতের শিখরে অবস্থিত বলে তাকে বলা হচ্ছে টিলা। পাশের চন্দ্র সূর্য অর্থাৎ গ্রাহ্য- গ্রাহকভাব তাতেই লীন হয়েছে বলে প্রতিবেশী কেউ নেই। হাড়িতে ভাত নেই অর্থাৎ দেহের মধ্যে চিত্ত নেই, গুরু প্রসাদে নিত্যই তিনি তা বুঝতে পেরেছেন, নৈরাত্ম- অতিথি নিত্য নিত্য তার দেহে ভিড় করেছে। নিরাবয়ব অর্থাৎ সর্বশূন্য এই সংসারের জ্ঞান নিত্যই বেড়ে যাচ্ছে, পরমবিজ্ঞানে তার চিত্ত অধিষ্ঠিত। দোয়ানো দুধ আবার গরুর বাঁটে ফিরে যাচ্ছে, এরমানে- বজ্রাগার থেকে এসে তার বোধিচিত্ত মহাসুখ চক্রে গমন করছে। দুগ্ধ অর্থ এখানে বোধিচিত্ত। বলদ প্রসব করলো, গাভি বন্ধ্যা, তিন সন্ধ্যা তাকে পাত্র ভরে দোয়ানো হলো। বোধিচিত্ত এখানে বলদের রূপক। সক্রিয় মন থেকে রূপজগতের সৃষ্টি হয় বলে, বোধিচিত্তকে বলদ বলা হয়েছে। বলদ প্রসব করে মানে বোধিচিত্তরূপ জগতের সৃষ্টি করে। এই বোধিচিত্ত যখন জাগতিক মোহ অতিক্রম করে নৈরাত্মতা লাভ করে, তখন তার দৃশ্য- দর্শনের বোধ তিরোহিত হয়। বোধিচিত্তের সহজ প্রকৃতি হচ্ছে এই নৈরাত্ম- সেই নৈরাত্মাকে এখানে বলা হয়েছে বন্ধ্যা গাভী। কায়, বাক্ ও চিত্তের আভাসে গঠিত অবিদ্যাপীঠ কবির দ্বারা সর্বদা দোহন করা হচ্ছে। ‘যে বোকা, সেই আবার বুদ্ধিমান, যে চোর, সেই আবার সাধু’-এর তাৎপর্য, যে চিত্ত সবিকল্প জ্ঞানের সাহায্যে বিষয় সুখকে অন্যায়ভাবে আহরণ করে সেই তো চোর, আবার সেই চোরই নির্বিকল্প জ্ঞান লাভ করলে হয় সাধু। শেষে কবি বলেছেন, নিত্য নিত্য শেয়াল সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ করে। এর মানে, সব সময় মরণের ভয়ে ভীত সংসার চিত্ত হচ্ছে শেয়ালের মতো, তা যখন বিশুদ্ধ হয়, তখন সে সহজানন্দরূপ সিংহের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এগিয়ে আসে, সহজানন্দকে আয়ত্ব করবার জন্য সে তখন ব্যগ্র হয়। স্বভাবতই এই বিরোধমূলক রূপকের জন্যে ‘ঢেন্টণপাদের গীত বিরলে বুঝই’- কোন কোন লোক বুঝতে পারে, সবাই পারেনা।
কিন্তু কবীর সম্ভবত বুঝতে পারেছিলেন। ১৪৪০ সালে কাশির কাছেই লাহারতারায় (বর্তমানকালে বারানসিতে) এক তাঁতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মধ্যযুগের অতীন্দ্রিয়বাদী কবি ও সন্ত কবীর (১৪৪০—১৫১৮) । তার রচনা ভারতের ভক্তি আন্দোলনকে বেশ গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এমনকি শিখধর্মকেও কবীরের মতবাদ গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তার মতবাদের বর্তমান উত্তরসূরি হল কবীর পন্থ নামে পরিচিত একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়, যেটি সন্ত মৎ সম্প্রদায়গুলির অন্যতম।
৩
১৯০১ সালের জনগণনায় "কবীরপন্থী"-দের সংখ্যা ছিল ৮৪৩,১৭১। বর্তমানে এদের সংখ্যা প্রায় ৯,৬০০,০০০। এরা ছড়িয়ে আছে মূলত উত্তর ও মধ্যভারতে এবং অনাবাসী ভারতীয়দের মধ্যে। যেটা বলছিলাম, ঢেন্টণপাদের গীত আর কেউ না বুঝলেও কবীর ঠিকই বুঝেছিলেন, আর তাই চর্যাপদের ৩৩ নাম্বার গীতটির সঙ্গে তার একটি দোহার আশ্চর্য মিল খুঁজে পাওয়া যায়,
অব কেয়া করে গান গাঁব-কতুআলা
শ্ব মাংস পসারি গীধ রাক্ষউআলা।
মূষ কী নাও বিলাই কাঁড়ারী
শোএ মেড়ুক নাগ পহারী।
বলদ বিয়াঅএ গাভী ভই বাঞ্ঝা।
বাছুরী দুহাওএ এ তিন সাঞ্ঝা।
নিতি নিতি শৃগাল সিংহ সনে যুঝে
কহে কবীর বিরলজন বুঝে।।
শ্লোকটির অর্থ করলে যেটা দাঁড়ায়, গাঁয়ের কোতোয়াল এখন কি গান করে! কুকুর মাংসের কথা ভুলে গেছে, গৃধ্র এখন মাংস পাহারা দিচ্ছে। মূষিকের নৌকা, বিড়াল কাণ্ডারি। ব্যাঙ শুয়ে আছে, নাগ এখন প্রহরী। বলদ প্রসব করল, গাই বন্ধ্যা; তিন সন্ধ্যা বাছুরকে দোয়ানো হলো। নিত্য শৃগাল সিংহের সঙ্গে যুদ্ধ করে। এই কথা বলছেন কবীর, তার কথা বুঝতে পারে বিরলসংখ্যক লোক।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী- হুমায়ুন আজাদ
২। চর্যাগীতিকা- মুহম্মদ আবদুল হাই ও আনোয়ার পাশা সম্পাদিত
৩। চর্যাগীতি পরিচয়- ডঃ সত্যব্রত দে
৪। চর্যাপদ- অতীন্দ্র মজুমদার
৫। ইন্টারনেট