
১
‘কাষ্ঠ-নলে দাবানল পুড়ে যায় বন জঙ্গল
মন পোড়া পিরিত বন্ধু তাহা নয়
কত বিরহীনির তুমি অন্তর তলে
বিনা কাষ্ঠে আগুন জ্বলে
জলে গেলে জ্বলে দ্বিগুণ নিভে না– না নিভে না...
তুমি জানো নারে প্রিয় তুমি মোর জীবনের সাধনা
তোমায় প্রথম যেদিন দেখেছি মনে আপন মেনেছি
তুমি বন্ধু আমার বেদন বুঝো না’
বিখ্যাত এই মরমী গানটা মুজিব পরদেশীর কণ্ঠে অনেকেই শুনেছেন কিন্তু এর গীতিকারের নাম জানে ক’জনা! ২০১৩ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত কবিয়াল বিজয় সরকার এই বিখ্যাত গানের স্রষ্টা। এই গুণীশিল্পীর জন্ম ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯০৩ সালে নড়াইলের সদর উপজেলার ডুমদি গ্রামে। তার বাবার নাম নবকৃষ্ণ অধিকারী, আর মায়ের নাম হিমালয়া দেবী। দশ ভাইবোনের মধ্যে বিজয় সরকার ছিলেন সবার ছোট। তার আসল নাম বিজয় অধিকারী হলেও সুর, সঙ্গীত ও অসাধারণ গায়কী ঢঙের জন্য তিনি ‘সরকার’ উপাধি লাভ করেন। তবে ‘পাগল বিজয়’ হিসেবেও সমধিক পরিচিত কবিয়াল বিজয় সরকার প্রায় ১৮০০ গান লিখেছেন এবং সুর করেছেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি বিজয় সরকার গেয়েছেন,
‘নবী নামের নৌকা গড় আল্লাহ নামের পাল খাটাও
বিসমিল্লাহ বলিয়া মোমিন কূলের তরী খুলে দাও’
২
বিজয় সরকারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় জ্যাঠাতুত ভাই অভয় চন্দ্রের বাড়ীতে। কিছুদিন লেখাপড়ার পর তাকে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দেয়া হয়। পাঠশালার পাঠ শেষে তিনি ভর্তি হন হোগলাডাঙ্গা ইউপি স্কুলে এবং তারপরে বাঁশগ্রাম এমই স্কুলে। এখানে কিছুদিন পড়াশোনার পর তিনি ভর্তি হন সিংগা শোলপুর কেপি ইন্সটিটিউশনে এবং সেখান থেকেই ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হন।
টাবরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার পেশাগতজীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি কিছুদিন গোপালপুর কাচারীর নায়েবের দায়িত্ব পালন করেন। প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী এই সংগীত সাধক মঞ্চে বসেই অনেকবার গান রচনা করে তাৎক্ষনিকভাবে সুর করে তা পরিবেশন করেছেন। তার প্রথম স্ত্রী বীণাপাণি দেবীর মৃত্যুর খবরে গানের আসরেই তিনি গেয়েছেন,
‘পোষা পাখী উড়ে যাবে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে
সে আমারে ভুলবে কেমনে সজনী একদিন ভাবি নাই মনে...’
প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তিনি প্রমদা দেবীকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে প্রমদা দেবীরও মৃত্যু হয়। প্রিয়জনের কথা স্মরণ করে লিখেছেন,
‘আমি যারে বাসি ভালো সে কি রে তা জানে
জানলে ব্যাথা অমন করে দিত না আর প্রাণে
আমি যার লাগিয়া সদাই কান্দি গো
কান্না পৌঁছায় না তার কানে...’
৩
বাল্যকাল থেকে তিনি ছিলেন ভাবুক প্রকৃতির। মাধ্যমিক শিক্ষার গন্ডি পেরোতে না পারলেও স্কুলজীবন থেকেই তিনি গান রচনা ও সুর করে নিজে গাইতেন। পাঠশালার শিক্ষক নেপাল বাবুর কণ্ঠও ছিল মধুময়। তাঁরই উৎসাহ ও প্রশিক্ষণে বিজয় সরকারের সংগীত জীবনের ভিত্তি রচিত হয়। কিশোর বিজয় সরকার সংগীত চর্চার পাশাপাশি গ্রামে মঞ্চস্থ বিভিন্ন যাত্রায়ও অংশগ্রহণ করতেন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এর ‘নক্সী কাথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থের নায়ক-নায়িকা ‘রূপাই’ ও ‘সাজু’র প্রেমকাহিনী নিয়ে তিনি গেয়েছেন,
‘নক্সী কাঁথার মাঠেরে সাজুর ব্যাথায় আজো রে
বাজে রূপাই মিয়ার বাঁশের বাঁশি…’
বিজয় সরকারের ভাবধারা ও সংগীত প্রসঙ্গে পল্লী কবি জসিম উদ্দিন বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে দেশীয় গ্রাম্য গায়কদের মুখে বিজয়ের রচিত বিচ্ছেদ গান শুনিয়া পাগল হই। এমন সুন্দর সুর বুঝি কেহই রচনা করিতে পারে না।’ ১৯৩৫ সালে কলকাতার এ্যালবার্ট হলে কবিগানের এক আসর বসে। ওই আসরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লী কবি জসিম উদ্দিন, কবি গোলাম মোস্তফা, কন্ঠ শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহম্মেদ উপস্থিত ছিলেন। তারা বিজয় সরকারের গান শুনে মুদ্ধ হয়ে আর্শীবাদ করেন। ১৯৩৭ সালে কলকাতার বিধান স্ট্রীটের রামকৃষ্ণ বাগচী লেনের এক দ্বিতল বাড়ীতে কবি গোলাম মোস্তফা, কবি জসীম উদ্দিন ও গায়ক আব্বাস উদ্দীনের সাক্ষাৎ লাভ করেন। বিজয় সরকার এই স্মরণীয় মুহুর্তে এই বিচ্ছেদ গানটি পরিবেশন করে তাঁদেরকে অভিভূত করে দিয়েছিলেন।
‘সজনী ছুঁসনে আমারে
গৌররূপে নয়ন দিয়ে আমার জাত গিয়েছে
আমাকে স্পর্শ করিসনে যার কুল মানের ডর আছে...’
৪
১৯৮৩ সালে কলকাতা থেকে বিজয় সরকার রচিত ২৭০টি গান নিয়ে বিজয় সরকারের গানের সংকলন প্রকাশিত হয়। দীর্ঘকাল মানুষকে গান শুনিয়ে বার্ধক্যজীবনে বিজয় সরকার পশ্চিম বাংলার কেউটিয়ায় নিজগৃহে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শেষ জীবনে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে অন্ধত্বের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করেন। তার ছেলে কাজল ও বাদল অধিকারী এবং মেয়ে বুলবুলি ভারতে বসবাস করেন। এই দেশ বরেণ্য চারণ কবি, কবিগান গায়ক বিজয় সরকার ৪ ডিসেম্বর ১৯৮৫ তারিখে ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। কবিয়াল বিজয় সরকার আজ আমাদের মাঝে বেঁচে নাই, কিন্তু তার গানগুলো আজও বেঁচে আছে শ্রোতাদের মাঝে-
‘এই পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে
সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে
যখন নগদ তলব তাকিত পত্র নেবে আসবে যবে
মোহ ঘুমে যে দিন আমার মুদিরে দুই চোখ
পাড়াপড়শী প্রতিবেশী পাবে কিছু শোক
তখন আমি যে এই পৃথিবীর লোক ভুলে যাবে সবে’
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৩ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। বিজয় সরকারের জীবন ও সংগীত- সঞ্জীব দাশ
২। কবিগান (ইতিহাস ও রূপান্তর) - স্বরোচিষ সরকার
৩। কবিয়াল বিজয় সরকার (দর্শন সৃষ্টি ও সাধনা)- ইয়াসমিন আরা সাথী
৪। কবিয়াল বিজয় সরকার (জীবন ও কর্ম) - লিঠু মণ্ডল
৫। ইন্টারনেট