
১
বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির দাবার চালে কৌশলগত সমুদ্রপথগুলো বরাবরই সিদ্ধান্তকারী ভূমিকা পালন করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা তেহরান একাধিকবার কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। প্রায় ১০৭ দিনের টানা যুদ্ধের পর জুন মাসে এক অস্থায়ী সমঝোতা হলেও জুলাইয়ে তা ফের ভেঙে পড়ে, এবং সবশেষ গত সপ্তাহে ওমান একটি নতুন কূটনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে সামনে এসেছে—যার মূল কাঠামো ধার করা হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেল থেকে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার তীব্র সংঘাতের মাঝে ওমানের এই কৌশলগত উদ্যোগ কি সত্যিই একটি দীর্ঘমেয়াদি ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান আনতে সক্ষম হবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে জোর আলোচনা।
২
প্রণালি বনাম খাল: আন্তর্জাতিক আইনের ফারাক।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ (UNCLOS) প্রাকৃতিক প্রণালি ও কৃত্রিম খালের মধ্যে স্পষ্ট আইনি পার্থক্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সুয়েজ ও পানামা খাল সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে নির্মিত জলপথ, ফলে মিশর বা পানামা আইনসম্মতভাবেই ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে বাধ্যতামূলক টোল আদায় করতে পারে। এই দুই দেশের উদাহরণকে সামনে রেখে তুরস্কও তাদের দেশের ওপর দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় বাধ্যতামূলক টোল ও রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে ‘ক্যানাল ইস্তাম্বুল’ বা ইস্তাম্বুল খাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ঐতিহাসিক ‘মন্ট্রেক্স কনভেনশন’-এর আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে বসফরাস প্রণালি দিয়ে আসা-যাওয়া করা আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো থেকে তুরস্ক সরাসরি কোনো শুল্ক বা টোল আদায় করতে পারে না। তাই সম্পূর্ণ নিজস্ব ভূখণ্ডে কৃত্রিমভাবে খাল খননের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নৌপথের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করে নিজ দেশের সার্বিক রাজস্ব বৃদ্ধি ও পূর্ণ আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই আঙ্কারার মূল লক্ষ্য।
হরমুজ বা মালাক্কার মতো প্রণালি প্রাকৃতিক আন্তর্জাতিক জলপথ, যেখানে উপকূলীয় রাষ্ট্র চলাচলে বাধা দিতে বা বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি চাপাতে পারে না। যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির ব্রিফিং অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্র শুধু ট্রানজিট পাসেজের জন্য অর্থ দাবি করতে পারে না। এই আইনি বাস্তবতা মেনেই ইরান বারবার হরমুজ অতিক্রমকারী জাহাজের ওপর "সার্ভিস ফি" আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
৩
মালাক্কা মডেল: ওমানের প্রস্তাব ও এর অঙ্কের হিসাব।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যৌথভাবে মালাক্কা প্রণালি পরিচালনা করে—কোনো বাধ্যতামূলক টোল ছাড়াই। এর বদলে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সংস্থা’র তত্ত্বাবধানে জাহাজগুলোর কাছ থেকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অনুদান সংগ্রহ করা হয়, যা নেভিগেশন, পরিবেশ সুরক্ষা ও উদ্ধারকাজে ব্যয় হয়। সিঙ্গাপুরের সামুদ্রিক ও বন্দর কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে এই তিন দেশ ট্রানজিট প্যাসেজের অধিকার প্রয়োগকারী কোনো জাহাজের ওপর কোনো ফি, টোল বা অর্থ দাবি করে না। গত সপ্তাহে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী ওমান ঠিক এই কাঠামোতেই একটি আঞ্চলিক প্রস্তাব ইরানের কাছে পেশ করেছে, যেখানে—
‘হরমুজে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের বদলে যৌথ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হবে;
বাধ্যতামূলক টোলের বদলে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত তহবিল গঠিত হবে, যা নিরাপত্তা, বাতিঘর রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও অনুসন্ধান-উদ্ধার কাজে ব্যয় হবে।’
তবে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় (কাতার)-এর অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের হিসাব অনুযায়ী বাস্তব চিত্রটি বেশ কঠিন—মালাক্কার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত তহবিল থেকে বছরে মাত্র প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার সংগৃহীত হয়, যেখানে তেহরান প্রতিটি জাহাজের জন্য প্রায় ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) ডলার সার্ভিস ফি দাবি করছে বলে জানা গেছে। এই বিশাল ফারাকই দুই পক্ষের অবস্থানকে কার্যত অসামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছে।
৪
সবশেষ অবস্থা: ইরানের প্রত্যাখ্যান ও পাল্টা দাবি (২৯ জুলাই ২০২৬) ।
এই সপ্তাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো—ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ওমানের এই "৫০-৫০" যৌথ করিডোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি জানিয়েছেন, ওমানের প্রস্তাব তেহরানের নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধান দেয় না। এর বদলে ইরান একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে দাবি করা হয়েছে—
‘হরমুজের একটি শিপিং লেন সম্পূর্ণভাবে ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার ভেতর দিয়ে যাবে; দ্বিতীয় লেনও আংশিকভাবে ইরানি জলসীমা দিয়ে যাবে, যার ফলে দুই দিকের জাহাজ চলাচলের ওপরই তেহরানের কার্যত তদারকি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।’
এই পাল্টাপাল্টি প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত ১৪দফা ইসলামাবাদ সমঝোতাপত্র (Islamabad MoU)-এর ৬০ দিনের টোল-মুক্ত সময়সীমা আগামী ২১ আগস্টের মধ্যেই ফুরিয়ে যাচ্ছে—অর্থাৎ হাতে সময় আছে মাত্র প্রায় তিন সপ্তাহ। এই সময়ের মধ্যে স্থায়ী সমাধানে না পৌঁছালে পরিস্থিতি ফের সামরিক সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
৫
সংঘাতের পূর্ণ সময়রেখা: 'অপারেশন এপিক ফিউরি' থেকে ভাঙা সমঝোতা পর্যন্ত।
সংঘাতের প্রকৃত মাত্রা বোঝার জন্য সময়রেখাটি গুরুত্বপূর্ণ:
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: যুক্তরাষ্ট্র ('অপারেশন এপিক ফিউরি') ও ইসরায়েল ('অপারেশন রোরিং লায়ন') যৌথভাবে ইরানে সমন্বিত হামলা শুরু করে, যা পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্যমতে প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই এক হাজারের বেশি স্থাপনায় হামলা হয়। ইরান পাল্টা জবাবে 'অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর' শুরু করে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধের বিস্তৃতি বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
৮ এপ্রিল ২০২৬: পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রথম দুই সপ্তাহের অস্ত্রবিরতি ঘোষিত হয়, যদিও হরমুজ ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য থেকেই যায়।
১৭ জুন ২০২৬: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে ১৪-দফা সমঝোতাপত্রে (MoU) স্বাক্ষর হয়—যাতে ৬০ দিনের আলোচনা-কাঠামো, প্রণালি টোল-মুক্ত পুনরায় চালু ও মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের কথা বলা হয়।
৮ জুলাই ২০২৬: ইরান একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালায়; প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে সমঝোতাপত্র কার্যত "শেষ"।
১৮ জুলাই ২০২৬: ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তুলে সমঝোতাপত্র সংক্রান্ত সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত ঘোষণা করেন।
জুলাই শেষ সপ্তাহ, ২০২৬: নতুন করে উত্তেজনা প্রশমনে ওমান মালাক্কা-মডেলের প্রস্তাব দেয়, যা ইরান প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা প্রস্তাব দেয়।
৬
মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সংকট ও অস্ত্রভাণ্ডার শূন্যতা।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বা টানা প্রায় ৪০ দিনের সামরিক অভিযানের বিস্তৃতি ব্যাপক ছিল। হোয়াইট হাউসের দেওয়া তথ্যমতে, মার্কিন বাহিনী ইরান জুড়ে ১৩ হাজারের বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হেনেছে। একই সময়ে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের দিক থেকে ছোড়া ১,৭০০-এর বেশি বিপজ্জনক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এই সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ব্যয় হয়েছে ৩,৭৫০ কোটি ডলার, যার সিংহভাগই খরচ হয়েছে অত্যাধুনিক দূরপাল্লার গোলাবারুদ, ইন্টারসেপ্টর ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পেছনে। কিন্তু আক্রমণাত্মক এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের কৌশলগত অস্ত্রাগারে যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, তা পুরো মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের জন্য এক তীব্র শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পেনসিলভানিয়া ডিফেন্স অ্যান্ড ইনোভেশন সামিটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক সরঞ্জাম তৈরি দ্রুত করার তাগিদ দেন, যেখানে তার সঙ্গে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তবে পেন্টাগনের ভেতরের চিত্র ভিন্ন; গত সপ্তাহে মার্কিন সিনেটের অর্থ বরাদ্দ কমিটিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ পেন্টাগনের জরুরি সামরিক ঘাটতি মেটাতে অতিরিক্ত ৮,৭০০ কোটি ডলার অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানান। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ' (CSIS)-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কর্নেল মার্ক কানসিয়ান এক বিশ্লেষণে জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ২,৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সর্বোচ্চ ১,৪৩০টিই ব্যবহৃত হয়ে গেছে। অন্যদিকে, ব্যবহৃত ১,০০০-এর বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ২০৩১ সালের আগে এবং ব্যবহৃত থাড (THAAD) ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি আগামী তিন থেকে চার বছরের আগে পূরণ করা মোটেও সম্ভব নয়। প্রতিটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরে খরচ হয় ৪০ লাখ ডলার, যা ইরানের মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের ড্রোন ধ্বংস করতে অপচয় করতে হচ্ছে, ফলে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াশিংটন চরম অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপে পড়েছে।
৭
রাজনৈতিক বাধা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমীকরণ
ওমানের প্রস্তাবিত 'মালাক্কা মডেল' পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচক সাড়া পেলেও কাতারভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় জর্জটাউনের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ। তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় কট্টরপন্থী ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্ব এই প্রস্তাবে পূর্ণ রাজি হবেন কি না, তা অত্যন্ত অনিশ্চিত। যদিও হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকার কারণে প্রতিদিন সাধারণ ইরানিরা তীব্র অর্থনৈতিক দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এবং প্রণালি সচল হওয়া তাদের জন্য জরুরি, তবুও কট্টরপন্থীরা তাদের সর্বভৌম নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে নারাজ। 'ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরান'-এর নীতিবিষয়ক পরিচালক জেসন ব্রডস্কি উল্লেখ করেছেন, ইরান তাদের মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া সামরিক সক্ষমতার বিপরীতে হরমুজের অবরোধকেই একমাত্র ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করে কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চায়।
পেন্টাগন এবং মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূরাজনীতি, যা সামরিক পরিভাষায় ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ নামে পরিচিত। সিআইএ-এর সাবেক কর্মকর্তা এবং ফিলিপ ডেভিডসনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের তাইওয়ান আক্রমণের একটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বার্ষিক ৭০০-৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে কেবল 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র প্রথম দিনেই ৮০৩টি ব্যবহৃত হয়েছিল, যা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বক্তব্যেও উঠে এসেছে। সিএসআইএসের মতে, যদি এই মুহূর্তে তাইওয়ান প্রণালিতে চীন কোনো নতুন সামরিক আগ্রাসন শুরু করে, তবে ওয়াশিংটনের কাছে প্রতিরোধক অস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুদ থাকবে না। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, সাময়িকভাবে ইরানে আক্রমণ স্থগিত করে ওয়াশিংটনের খালি হতে যাওয়া সামরিক ভান্ডার রক্ষা ও এশিয়ার দিকে মনোযোগ ধরে রাখার এই নতুন কূটনৈতিক পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
৮
হরমুজ প্রণালির অব্যাহত সামরিক অচলাবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই বিনষ্ট করছে না, বরং তা বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একদিকে অভ্যন্তরীণ শিল্প পুনরুজ্জীবন ও 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র মতো ব্যয়বহুল অভিযানের মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে তাদের প্রতিরক্ষা ভান্ডারে দেখা দিয়েছে অস্ত্রের সংকট। পেন্টাগনের ৮,৭০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার ঘটনা এবং ক্রুজ ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি ওয়াশিংটনকে কৌশলগতভাবে এক বড় প্রতিরক্ষামূলক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্বাভাবিক রাখতে ওমানের প্রস্তাবিত ‘মালাক্কা মডেল’ একটি বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাতিসংঘের আইন বজায় রেখে এবং বাধ্যতামূলক টোল আদায় না করে একটি যৌথ নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত তহবিলের ব্যবস্থা করা গেলে তা আন্তর্জাতিক জলসীমার অধিকার ও ইরানের কৌশলগত দাবি উভয়কেই সন্তুষ্ট করার মতো একটি টেকসই মধ্যপন্থা হতে পারে।
ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সফলতার জন্য ইরান ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষকেই তাদের একপাক্ষিক অবস্থান থেকে সরে এসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তি মেনে নিতে হবে। তেহরানের উচিত তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দূরীকরণে ওমানের এই যৌথ আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনা নীতিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে বিবেচনা করা এবং কট্টরপন্থী মনোভাব শিথিল করা। অপরপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের সামরিক পুনরুত্থান এবং 'ডেভিডসন উইন্ডো'র বাস্তব রূপ ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সামরিক ও আর্থিক সম্পদ অপচয় না করে দ্রুত আঞ্চলিক কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকে সমর্থন করা। ওমান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতৃত্বাধীন যৌথ নিরাপত্তা পরিষদ এবং আইএমও (IMO)-র মধ্যস্থতায় হরমুজে একটি যৌথ নজরদারি ও সেবামূলক অর্থায়ন কাঠামো চালু করাই হতে পারে এ অঞ্চলের একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী শান্তির চাবিকাঠি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৯ জুলাই ২০২৬
তথ্যসূত্র:
১। Al Jazeera — "Iran and Oman exchange proposals to manage Strait of Hormuz" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://www.aljazeera.com/news/2026/7/28/iran-and-oman-exchange-proposals-to-manage-strait-of-hormuz
২। Al Jazeera — "Iran and Oman swap proposals to manage Strait of Hormuz: What we know" (২৯ জুলাই, ২০২৬) https://www.aljazeera.com/news/2026/7/29/iran-and-oman-swap-proposals-to-manage-strait-of-hormuz-what-we-know
৩। Reuters (via Baird Maritime) — "Oman proposes Malacca-style solution to end Strait of Hormuz dispute" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://www.bairdmaritime.com/shipping/oman-proposes-malacca-style-solution-to-end-strait-of-hormuz-dispute
৪। Global Banking & Finance Review — "Explainer: Why is Oman proposing a new plan to manage the Strait of Hormuz?" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://www.globalbankingandfinance.com/explainer-why-oman-proposing-new-plan-manage-strait-hormuz/
৫। The Times of Israel — "Oman hands Iran Gulf-backed proposal for joint control over Hormuz, with voluntary fees" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://www.timesofisrael.com/oman-hands-iran-proposal-for-joint-control-over-hormuz-with-voluntary-fees/
৬। IBTimes UK — "Oman Pitches Iran Voluntary Fee Plan for Hormuz Ships Modelled on Malacca Strait System" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://www.ibtimes.co.uk/oman-voluntary-fees-strait-hormuz-1811137
৭। Tech Times — "Iran Demands Control Over Both Strait of Hormuz Lanes, Rejects Oman's Voluntary-Fee Plan" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://www.techtimes.com/articles/321913/20260728/iran-demands-control-over-both-strait-hormuz-lanes-rejects-omans-voluntary-fee-plan.htm
৮। Middle East Eye — "Oman proposes joint control of Strait of Hormuz as mediators expect talks 'breakthrough'" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://www.middleeasteye.net/news/oman-proposes-joint-management-strait-hormuz-mediators-expect-breakthrough-talks
৯। House of Commons Library — "US-Iran ceasefire and nuclear talks in 2026" (২৮ জুলাই, ২০২৬) https://commonslibrary.parliament.uk/research-briefings/cbp-10637/
১০। Wikipedia — "Islamabad Memorandum" (হালনাগাদ ২১ জুলাই, ২০২৬) https://en.wikipedia.org/wiki/Islamabad_Memorandum
১১। Al Jazeera — "The missing half of mediation" (২৩ জুলাই, ২০২৬) https://www.aljazeera.com/opinions/2026/7/23/the-missing-half-of-mediation
১২। Al Jazeera — "With US-Iran trust broken again, can Pakistan bring them back to talks?" (১৪ জুলাই, ২০২৬) https://www.aljazeera.com/news/2026/7/14/with-us-iran-trust-broken-again-can-pakistan-bring-them-back-to-talks
১৩। Axios — "US, Iran reach deal to extend ceasefire, open strait" (১৪-১৫ জুন, ২০২৬) https://www.axios.com/2026/06/14/us-iran-ceasefire-extended-hormuz-reopen-trump
১৪। Quwa — "US-Iran War 2026: Operation Epic Fury and the Hormuz Crisis" (২৬ মে, ২০২৬) https://quwa.org/iran/military-news-iran/us-iran-war-2026-operation-epic-fury-the-strait-of-hormuz-crisis-and-the-limits-of-american-air-power/
১৫। U.S. Department of War — "Operation Epic Fury" (দাপ্তরিক তথ্য) https://www.war.gov/Spotlights/Operation-Epic-Fury/
১৬। Fox News — "War with Iran FAQs" https://www.foxnews.com/category/politics/defense/wars/war-with-iran
১৭। NPR — "What operation 'Epic Fury' means for the US, Iran, and beyond" (২ মার্চ, ২০২৬) https://www.npr.org/2026/03/02/nx-s1-5732860/what-operation-epic-fury-means-for-the-us-iran-and-beyond