
১
আমার কাংখের কলসী গিয়াছে ভাসি
মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউ লাগিয়ারে
মাঝিরে তোর নৌকার ঢেউলাগিয়া।।
ধীরে নৌকা বাইয়া যদি নদী হইতে পাড়
তবে কি ভাসিতো জলে কলসী আমার
আমার সহে না দেরী, আমি উপায় কি করি
গৃহে যাবার সময় গেল বইয়ারে।।
কিংবা
তুই যদি আমার হইতি রে
ও বন্ধু আমি হইতাম তোর
কোলেতে বসাইয়া তোরে
করিতাম আদর রে
তুই যদি আমার হইতি রে
ও বন্ধু তুই যদি আমার হইতি রে
গাছের বল হয় শিকড় বাকল
মাছের বল হয় পানি
তুমি আমার শীতরও কাঁথা
উজলা ঘরের ছাওনি-
অনেক পরিচিত গান, অনেকেই জানি, কিন্তু গানগুলো কার লেখা তা জানি কি?
গানগুলো সাধক ও গীতিকবি উকিল মুন্সী’র লেখা। প্রয়াত নাট্যকার ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ তার ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমায় তার লেখা,
আমার গায়ে যত দুঃখ সয়
বন্ধুয়া রে করো তোমার মনে যাহা লয়।।
নিঠুর বন্ধু রে, বলেছিলে আমার হবে
মন দিয়াছি এই ভেবে
সাক্ষী কেউ ছিলনা সেসময়।
সাক্ষী শুধু চন্দ্র-তারা,
একদিন তুমি পড়বে ধরা রে বন্ধু
ত্রিভুবনের বিচার যেদিন হয়।।
এবং
আষাঢ় মাইস্যা ভাসা পানি রে
পুবালী বাতাসে-
বাদাম দেইখ্যা, চাইয়া থাকি
আমার নি কেউ আসে রে।।
যেদিন হতে নতুন পানি
আসল বাড়ির ঘাটে
অভাগিনীর মনে কত শত কথা উঠে রে।।
এই দুটি গান ব্যবহারের পর এর হৃদয় স্পর্শ করা কথা ও সুরের জন্য গানগুলো মানুষের অন্তরে জায়গা করে নেয়। এছাড়াও প্রয়াত গায়ক ও প্রখ্যাত বংশীবাদক বারী সিদ্দিকীর বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ বাউল সাধক উকিল মুন্সীর গানগুলোর সাথে অধিকতর পরিচিত হয়।
উকিল মুন্সী নেত্রকোণার খালিয়াজুরী উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১১ জুন জন্মগ্রহণ করেন। একদিকে মসজিদের ইমাম, অন্যদিকে একতারা হাতে গণমানুষের প্রিয় গীতিকবি, এক অপূর্ব বৈশিষ্ট্য তার জীবনাচরণ ও গানে। সবাই তাকে উকিল মুন্সী নামে চিনলেও তার আসল নাম কিন্তু উকিল মুন্সী নয়। তার পারিবারিক নাম আব্দুল হক আকন্দ। উকিল মুন্সী র পিতা ছিলেন একজন ধনাঢ্য তালুকদার। নাম তার গোলাম রসুল আকন্দ। ১৮৮৫ সালে নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার (তৎকালীন খালিয়াজুড়ি) বেতাই নদীর তীরে জৈনপুর গ্রামে গোলাম রসুল আকন্দের প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার নাম রাখেন আব্দুল হক আকন্দ। শৈশবকাল থেকেই আব্দুল হক আকন্দ বাংলা পড়ালেখার পাশাপাশি ফারসি ও আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত হন। যেহেতু তিনি ছিলেন ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, তাই জন্মের পর থেকেই তার বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল ছেলে বড় হয়ে একজন উকিল হবে। তাই তারা ছোটবেলা থেকেই আদর করে তাকে 'উকিল' নামে ডাকতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় উকিল নামের এই ব্যক্তি মসজিদে ইমামতি করলে তার নামের শেষে 'মুন্সী' শব্দটি যোগ হয়। আর এভাবেই সবাই আব্দুল হক আকন্দ নাম ভুলে যায়, তার নাম হয়ে যায় 'উকিল মুন্সী'।
উকিল মুন্সী র বয়স যখন ১০ বছর, তখন তার পিতা মারা যান এবং তিনি এতিম হয়ে পড়েন। এসময় তার জীবনে আরেকটি নির্মম ঘটনা ঘটে। তার মা উকিলেন্নেসা পাশের গ্রামের এক লোককে বিয়ে করে চলে যান। একা উকিল মুন্সী বাধ্য হয়েই মায়ের কাছে যান। ওখানেই থাকতেন। পরে তার এক সৎ ভাই জন্মগ্রহণ করেন, যার ফলশ্রুতিতে তার আদর যত্নের অভাব আরও বেড়ে যায়। অবহেলার শিকার হন তিনি। অভিমানে চলে আসেন নিজ বাড়ি বোয়ালীতে। পিতা-মাতাহীন একটি শিশুর জন্য আদর যত্ন তো দূরে থাক, অবহেলা হয়ে দাঁড়ায় নিত্য সঙ্গী। এই অবস্থায় কিশোরগঞ্জের ইটনার ঠাকুরবাড়িতে ফুফুর কাছে কিছুদিন থাকেন। তবে স্বামীর অনিচ্ছার কারণে তিনি তার ভাইয়ের ছেলে উকিল মুন্সী কে বেশিদিন তার কাছে রাখতে পারেননি। সে সময়ে নেত্রকোণায় ঘাঁটুগানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তিনি ১৭-১৮ বছর বয়সে ঘাঁটুগানের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং এর মাধ্যমে তার সংগীত জগতে প্রবেশ। বিশ শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি থেকে গায়ক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকেন। তার আরেকটা জনপ্রিয় গান,
সোনা বন্ধুয়া রে এতো দুঃখ দিলে তুই আমারে
তোর কারণে লোকের নিন্দন, করেছি অঙ্গের বসন রে।
তুই বিনে দরদী আর নাই সংসারে রে।।
কুমারিয়ার ঘাটিবাটি, কুমার করে পরিপাটি
মাটি দিয়া লিপ দেয় উপরে।
ভিতরে আগুন দিয়া কুমার থাকে লুকাইয়া
তেমনি দমা করলে তু্ই আমারে রে।।
২
মোহনগঞ্জ উপজেলার জালালপুর গ্রামে উকিল মুন্সী’র এক চাচা থাকতেন। তিনি গ্রামের খুব সম্মানিত লোক ছিলেন এবং মানুষ তাকে খুব সমীহ ও সম্মান করতো। উকিল মুন্সী’র বয়স যখন ২১/২২ বছর, তখন তিনি চলে যান তার এই চাচার কাছে। চাচার সুবাদে ও নিজ গুনের কারণে কিশোর ভাতিজা উকিল মুন্সী কে সবাই খুব আদর করতো। একদিন উকিল মুন্সী গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারের সুন্দরী মেয়ের প্রেমে পড়েন। তার নাম হামিদা আক্তার খাতুন বা লাবুশের মা। তার বাবার নাম লবু হোসেন। হামিদা আক্তারের জন্য তার মনে তৈরি হয় উন্মাদনা, না দেখলে তার পরান ছটফট করে ওঠে। এভাবে গ্রামে এক কান দু'কান হতে হতে সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে কথাটি। তিনি গান লিখেন,
ধনু নদীর পশ্চিম পাড়ে, সোনার জালালপুর
সেখানেতে বসত করে, উকিলের মনচোর।
কথাটি তার চাচা কাজী আলিম উদ্দিন সাহেবের কানেও পৌঁছে যায়। যেহেতু লবু হোসেন ছিলেন একজন সাধারণ, দরিদ্র ও সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে অনেক নিচু শ্রেণীর মানুষ, তাই তার চাচা এই সম্পর্ক মেনে নেন না। তিনি উকিল মুন্সী কে তার বাড়ি থেকে বের করে দেন এবং তিনি যেন এই গ্রামে আর ঢুকতে না পারেন সেজন্য সবাইকে সতর্ক করে দেন। উকিল মুন্সী র অবস্থা তখন পাগলের মতো। তিনি আবার তার নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামের কোন আত্মীয়-স্বজন হামিদা আক্তার খাতুনের সঙ্গে তার বিয়েতে রাজি হয় না এবং কেউ তাকে কোনরকম সহযোগিতাও করেন না। এই অবস্থায় উকিল মুন্সী দিশেহারা হয়ে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরতে থাকেন। এমন সময় ইটনা ঠাকুর বাড়িতে থাকা তার সহোদর আব্দুল মজিদ আকন্দর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তিনি আরও ভেঙে পড়েন।
এদিকে ঠিকানাবিহীন উকিল মুন্সীর প্রেমে হামিদা আক্তার খাতুনের প্রাণ কেঁদে ওঠে। তিনি দিনরাত উকিল মুন্সীর বিরহে ছটফট করতে থাকেন। দিনরাত কান্নাকাটি করেন। মেয়ের এমন পাগল প্রায় অবস্থা দেখে পিতা লবু হোসেন বাধ্য হয়ে উকিল মুন্সীর সঙ্গে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে লবু হোসেনের কাছে ঠিকানাবিহীন উকিল মুন্সীকে খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। উকিল মুন্সী কে জানানো হয় যে, তিনি যদি রাজি থাকেন তাহলে কোন আত্মীয়-স্বজন ছাড়াই হামিদা আক্তার খাতুনকে তার সঙ্গে বিয়ে দিবেন। তিনি যেন ওখানে দ্রুত পৌঁছেন। অতঃপর, ৩১ বছর বয়সে উকিল মুন্সী হামিদা আক্তারকে বিয়ে করেন এবং শ্বশুরের দেয়া একটি বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন।
৩
১৯১৮ সালের ১৭ এপ্রিল প্রথম সন্তান প্রখ্যাত গায়ক আব্দুস সাত্তারের জন্ম হয়। এরপর তিনি মদন থানার কুলিয়াটি গ্রামে চলে যান। কুলিয়াটিতে পাঁচ বছর কাটান। গ্রামটি উকিলকে ঘিরে গীতিকবি-গায়কদের মিলন কেন্দ্র বা ঠিকানা হয়ে ওঠে। এ সময় হবিগঞ্জের প্রখ্যাত পীর সৈয়দ মোজাফফর আলী (র.)-এর শিষ্যত্ব নেন ও তারপর থেকেই একতারা বাজিয়ে গান করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জালালপুর ছেড়ে পাশের জৈনপুরে বেতাই নদীর কূল ঘেঁষে বাড়ি করেন। সাত্তারের পর উকিলের আরও এক ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম। উকিলের অপর ছেলের নাম পুলিশ মিয়া এবং মেয়েদের নাম আয়েশা খাতুন ও রাবিয়া খাতুন। ষাটের দশকের প্রথমদিকে এসে আসরে গান করা ছেড়ে দেন। তার আরেকটা জনপ্রিয় গান,
প্রাণ সখি গো
আমি না বুঝিয়া করলাম পিরিতি
আমার দুঃখে দুঃখে জনম গেল সুখ হইল না একরতি।।
পিরিতি যে বিষে ভরা, আগে তো কইলে না তোরা গো
বিষে বিষে হইলাম সারা, কেঁদে কাটাই দিনরাতি।।
দিলাম যারে ষোল আনা, দিয়াও বন্ধের মন পাইলাম না গো
পর কোনদিন আপন হয় না, হয় নারে সঙ্গের সাথী।।
কত অকুলারে কুলে নিলে, আমায় অকুলে ভাসাইলে গো
আমার ভাসতে ভাসতে জনম গেল, কও উকিলের কি গতি।।
উকিল মুন্সী হাজারেরও অধিক গান লিখেছেন। বর্তমানে বেশিরভাগ গানের সন্ধান পাওয়া যায় না। তার দুই শতাধিক গান নিয়ে একটি সঙ্কলন সম্পাদনা করেছেন কবি মাহবুব কবির। উকিল মুন্সী’র জীবদ্দশায় মানুষজন তাকে মরমি কবি উকিল মুন্সি, বাউল ফকির উকিল মুন্সি, দরদি বাউল উকিল মুন্সি, বাউল কবি উকিল মুন্সি প্রভৃতি নামে ডাকতেন। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন একজন বিরহী বাউল। তার গান ও সুরে বিরহের ব্যাকুলতা প্রাধান্য পেয়েছে। অন্তরজ্বালায় দগ্ধ নারীর কান্নায় বিলাপের যে সুর, বিরহের যে ছাপ তা আমরা উকিল মুন্সীর গানে ও সুরে খুঁজে পাই, যে বিরহ নারী-পুরুষ সর্বোপরি সবাইকে ছুঁয়ে যায়। এ জন্যই তিনি বিরহী বাউল।
১৯৭৮ সালে স্ত্রী হামিদা খাতুনের মৃত্যুর কয়েক মাস পর ৬ আগস্ট কোন এক গানের আসর থেকে ফেরার পর তার পুত্র বাউল সাত্তার মিয়া প্রচণ্ড জ্বরে পড়ে। কয়েকদিন সেই জ্বরে ভোগার পর তিনি মারা যান। পুত্রের মৃত্যুতে উকিল মুন্সী পাগলপ্রায় হয়ে যান। তিনি তার পুত্রকে এতোটাই ভালোবাসতেন যে, তিনি শোকে পাথর হয়ে যান। এই শোকের কারণে তিনি খুবই এলোমেলো আচরণ করতেন তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। কয়েকমাস পরে, ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে ৯৩ বছর বয়সে এই মহান মানুষটি সকলকে কাঁদিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। উকিল মুন্সী’র পূর্ব ইচ্ছা ও নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে জৈনপুর গ্রামে বেতাই নদীর কোলঘেঁষা বাড়ির উঠানে একই চালের নিচে পুত্রের পাশে দাফন করা হয়। লেখা শেষ করবো এই মহান সাধকের আরেকটা গান দিয়ে,
আমি মইলে কি লাভ তোর বন্ধুয়ারে
আমি মইলে কি লাভ তোর।
বন্ধুরে মইলে যদি হও সুখী
প্রাণ নিতে রাইখ না বাকি
পাখি উড়ে শূণ্য হোক পিঞ্জর।
দেহ পিঞ্জর হলে শূণ্য, তোমায় লোকে বলুক ধন্য
এই মরণের করি না আর ডর।।
তোর সনে করে পিরিতি, আঁধার হলো চোখের জ্যোতি
ভাবে বুঝি উকিল তোমার পর।।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৪ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। উকিল মুন্সীর চিহ্ন ধরে- ওয়াহিদ সুজন
২। ইন্টারনেট