
১
আছে তোরই ভিতর অতল সাগর
তাঁর পাইলি না মরম।
তার নাই কুল কিনারা শাস্ত্র ধারা
নিয়ম কি রকম।
দেহতত্ত্বের গান। বাউলের গানেই দেহতত্ত্বের সুর বাজে। এই দেহের মাধ্যমেই স্রষ্টার সন্ধান মেলে কারণ ‘যা আছে ভান্ডে বা শরীরে তা আছে ব্রহ্মাণ্ডে’। অনেকে বলেন বাঙলা ‘আউল’ বা ‘আকুল’ শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে ‘বাউল’ শব্দটি এসেছে, যারা আকুল হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কেউ বলেন এরা বায়ু সাধক অর্থাৎ ‘বাই’ বা ‘বাউ’ ‘ল’ প্রত্যয় যোগে ‘বাউল’ নাম হয়েছে, এরা হলো বায়ুগ্রস্থ বা উম্মাদ শ্রেণী। আবার সংস্কৃত ‘বাতুল’ শব্দ থেকে ‘বাউল’ শব্দটির উৎপত্তি বলে কেউ কেউ মনেকরেন, তবে এরা সংসারের নিয়ম-কানুনের ধার ধারেনা। অসংখ্য তালি বা পট্টিমারা আলখেল্লা, হাতে একতারা, কাঁধে ঝুলি, হাতে বাঁকা লাঠি, জটাধারী, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর মুখে লম্বা দাড়ি নিয়ে ভাবুক প্রকৃতির এই লোকগুলো পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায়। এরা সমাজ বন্ধন বা বিশেষ কোন ধর্মের অনুশাসন মানেনা, এরা মরমী প্রেমিক বা সাধক।
২
বাঙলার আদি সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল নদীয়া। যতদূর জানা যায় এই নদীয়াতেই বাউল মতবাদের উদ্ভব ঘটেছিল। ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের পরের দিকে বৈষ্ণব ও সুফি প্রভাবের মিশ্রণে গোবরা, হজাত, খুশি বিশ্বাস প্রমুখ মুসলমান এবং আউল চাঁদ, বীরচন্দ্র প্রভৃতি হিন্দুর প্রচেষ্টায় ভাববিদ্রোহী দল গঠিত হয়। চিশতি, সুহ্রাওয়ার্দি এবং দরবেশদের মতো এরা গানের মাধ্যমে সাধনা করে। সুফি সাধকদের মতই এরা উদাসীন এবং গানে বিভোর। এদের প্রভাবেই বাউল মতের সৃষ্টি। প্রাচীনতম বাউলদের মধ্যে আরোও বিখ্যাত ছিলেন হরিগুরু, বনচারী, অখিলচাঁদ ইত্যাদি। তবে বাউল সাধকদের মধ্যমণি হলেন লালন ফকির। লালন গবেষক এস এম লুৎফর রহমান তাঁর ‘লালন-জিজ্ঞাসা’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘লালন শাহ দরবেশী ফকীরী সাধনাকে বৈষ্ণব সহজিয়া সাধনার সঙ্গে সমীকৃত করে এক নতুন সাধন-পদ্ধতি উদ্ভাবিত করেন। এই সাধনার গোপন প্রক্রিয়াসমূহের মধ্যে দরবেশী আচারের সঙ্গে বৈষ্ণবতান্ত্রিক সহজিয়া যোগাচারের সংমিশ্রণ লক্ষণীয়। লালন শাহের সাধন-প্রক্রিয়ায় ‘কলেমা’র সঙ্গে ‘মন্ত্র’, ‘বীজমন্ত্রে’র সঙ্গে ‘ইসমে আজম’, পরিচ্ছদে ‘ডোরকৌপীন’ এর সঙ্গে ‘খিলফা-ঝোলা-আশা’ প্রভৃতি স্থান লাভ করেছে। দুদ্দু শাহ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সাধনার এই ধারা হলো- ‘দরবেশী বাউলে’র ধারা। এর উদগাতা লালন নন- সপ্তদশ শতকের নিত্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্র’। আসলে প্রাচীন লোকায়ত দর্শনই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে, নানা বিবর্তনের পথ পেরিয়ে এবং নানা স্থান থেকে নানা উপাদান নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করে ‘বাউল মতবাদ’এ এসে পরিণতি লাভ করেছে। তবে নানা রূপান্তরের মধ্যেও বাঙলার প্রাকৃতজনের দর্শন তার আদিম বস্তুবাদী অন্তঃসারকে পরিত্যাগ করেনি। লালন শিষ্য দুদ্দু শাহ তাই বলেন,
বস্তু ছাড়া নাহি আর আল্লা কিংবা হরি
এহি মত দেখ সবে নর-বস্তু ধরি
রজঃবীর্য এই দুই বস্তু যেবা চিনে
লালন শাঁইজিকে সেই জন চিনে।
নারীর রজঃ এবং পুরুষের বীর্য, এই দুই বস্তু থেকেই যেহেতু মানুষ রূপ বস্তুর উদ্ভব তাই বস্তুর বাইরে অন্য কোন কিছুকে স্বীকার করা বাউলদের মতে অর্থহীন। এখান সেই প্রাচীন দেহাত্মবাদের অনুসৃতি। তবে লালনের দেহসাধনা জোর দেয় আপন দেহশুদ্ধির ওপরে কারণ দেহশুদ্ধির সাধনা সিদ্ধ না হলে মনশুদ্ধি কখনো হয়না। মানুষের শরীরই হলো সাধনার ভিত্তিভূমি। দেহটা হলো যন্ত্র, আর তাকে ধারণ করে আছে মন রূপী যন্ত্রী। দেহস্থ মন, বুদ্ধি, অহংকার এসব মুলসত্তারই শক্তি। এই শক্তিরই খেলা চলছে দেহযন্ত্রের ভেতরে। দেহের স্নায়ু, পেশী ও গ্রন্থির কার্যকারিতা স্বাভাবিক ও দোষমুক্ত থাকলে দেহের মধ্যস্থিত মন বা মূলসত্ত্বার স্ফুরণ ঘটবে। অর্থাৎ দেহশুদ্ধ হলে মনও শুদ্ধ হবে। এই শুদ্ধমনই আত্মস্বরূপ উপলব্ধির সহায়ক। মনকে একাগ্র করে ধ্যানের যোগ্য করার আনন্দদায়ক নানারকম সহজপন্থা লালন সাধনায় আছে। এর ওপরে রয়েছে শ্বাসপ্রশ্বাসের ওপর সাধকের আধিপত্য বিস্তার করার গুরুত্ব। তন্ত্রের প্রধান তিনটি নাড়ী হলো ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না। মেরুদন্ডের বাম দিকের নাড়ী বা ইড়া এবং ডানদিকের নাড়ী বা পিঙ্গলার শ্বাস ইচ্ছেমত নিয়ন্ত্রণ করে দেহকে চিরদিনের জন্য ব্যাধিমুক্ত করা সম্ভব। সুষুম্নার ওপর সাধকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আয়ত্ত হলে মনকে ধ্যানের দ্বারা মহাপুরুষে পরিণত করা সম্ভব। সাধকদেহ চুরাশি ক্রোশ অর্থাৎ চুরাশি আঙ্গুল ব্যাপ্ত এবং দৈর্ঘ্যপ্রস্থে সমান। তাতে সৃষ্টি ও স্রষ্টা একাকার হয়ে যায়। চুরাশি আঙ্গুল বা সাড়ে তিন হাত সাধকদেহকে রূপক আকারে হেরাগুহা বা কাহাফ বলা হয়। সাধকদেহের পাত্র হলেন গুরু রসের রসিক। গুরুরস আস্বাদনের দ্বারা গুপ্ত রহস্যজগত নিহার ও বিহারের মাধ্যমে জগতের দৃষ্ট ও অদৃষ্ট সব বিষয়ের ওপরে সূক্ষ্ম জ্ঞানময় হাল সাধকদেশের পাত্র। এই সাধকদেশের আশ্রয় হলো প্রকৃতিস্বরূপ। প্রকৃত স্বরূপের সান্নিধ্য লাভ করে রিপু ইন্দ্রিয়ের অবসান ঘটিয়ে সাধক জিতেন্দ্রিয় হয়ে ওঠেন।
৩
বাউলরা জগত সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি সম্পর্কে একেবারে উদাসীন থাকতে পারেনি। শ্রেনীবিভক্ত সমাজে সুবিধাভোগী শ্রেণীর ভাবাদর্শের প্রচারকরা সামাজিক বৈষম্যের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন ধর্ম ও ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে, কিংবা নিম্নবর্গের মানুষের ইহজগতের বঞ্চনাজনিত দুঃখকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছেন পরলোকের অনন্ত সুখের আশ্বাস দিয়ে। বাউলরা জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন এইসব বঞ্চনার বিরুদ্ধে।
কেমন ন্যায় বিচারক খোদা বলগো আমায়
তাহলে ধনী-গরিব কেন এ ভুবনে রয়
ভালমন্দ সমান হলে
আমরা কেন পড়ি তলে
কেউ দালান-কোঠার কোলে
শুয়ে নিদ্রা যায়।
সেই আমরা মরণের পরে
যাব নাকি স্বর্গপুরে
কে মানিবে এসব হেরে
এই দুনিয়ায়?
তবে কেবল অভিযোগ নয়, বাউল সাধকরা ভবিষ্যতের এক শোষণহীন, বৈষম্যহীন সমাজের কল্পনাও করেছেন।
এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে
যেদিন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান
জাতিগোত্র নাহি রবে
শোনায়ে লাভের বুলি
নেবে না কাঁধের ঝুলি
ইতর আশরাফ বলি
দূরে ঠেলে না দেবে
আমির ফকির হয়ে এক ঠাই
সবার পাওনা খাবে সবাই
আশরাফ বলিয়া রেহাই
ভবে কেউ নাহি পাবে।
৪
লালন ভোগী বা স্বভাব উদাস নন বলেই দেহকে ছেড়ে মনই তাঁর অন্বিষ্ট।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মনোবেড়ি
দিতাম পাখির পায়।।
‘অচিন পাখি’ অর্থাৎ ‘নামহীন প্রভু’। তাঁকে দেখা যায় না কিন্তু তিনি অলক্ষ্য থেকে আমাদের দেখেন। তিনি আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলছেন আর আমরা তার খেলার পুতুল। লালনের এই ‘অচিন পাখি’ রূপকের আড়ালে আসলে সাধনার গূঢ় তত্ত্বই প্রকাশ পেয়েছে। লালনের এই উপলব্ধি তাঁর একান্ত নিঃসঙ্গ সাধন লব্ধ।
আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা
তার উপরে সদর কোঠা
আয়না মহল তায়।।
এখানে আট কুঠুরি হলো শরীরের আটটা গ্রন্থি, পিটুইটারি, থাইমাস, থাইরয়েড, প্যারা থাইরয়েড, অ্যাল ড্রিনাল, প্যারোটিড, প্যাংক্রিয়াস এবং টেসটিস অথবা ওভারিস। আমাদের এই শরীরটা টিকে আছে এই গ্রন্থিগুলো দিয়ে নিয়মিতভাবে হরমোনের নিঃসরণের কারণে। আর এই আটটি গ্রন্থির সঙ্গে শরীরের নয়টি দ্বার সংযুক্ত, দ্বারগুলো হলো দুই কান, দুই চোখ, নাকের দুই ফুটো, মুখ, জননেন্দ্রিয় এবং পায়ু। মানুষের শরীরের এই নয়টি দ্বার স্নায়ুগ্রন্থির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। লালন বলেছেন এই শরীর হলো রহস্যময়, পৃথিবীর আর সব রহস্য এই রহস্যের কাছে হার মানে, কারো সাধ্যি নেই একে ব্যবহার করবার। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাউল মতবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী এবং হাজী শরীয়তুল্লা। রংপুর এবং ফরিদপুরের এই দুই ব্যক্তির প্রতিবাদে এবং পরবর্তীতে শরীয়তুল্লার পুত্র দুদু মিয়ার সংস্কার কার্যে বাউল মত ক্ষীণ হয়ে যায়।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৫ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। আট কুঠুরি নয় দরজা-সমরেশ মজুমদার
২। অখন্ড লালন সঙ্গীত-আবদেল মাননান
৩। প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন-যতীন সরকার
৪। বঙ্গে সুফি প্রভাব ও সুফিতত্ত্বের ক্রমবিকাশ-প্রদ্যোৎ ভট্টাচার্য
৫। ইন্টারনেট