
১
‘যা নাই ভাণ্ডে (দেহে) তা নাই ব্রহ্মাণ্ডে’। কথাটা আরেকটু ভেঙ্গে বলার জন্যই এই লেখার অবতারনা। কবি আল মাহমুদ তার ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যে লিখেছেন-
‘আবাল্য শুনেছি মেয়ে বাংলাদেশ জ্ঞানীর আঁতুড়
অধীর বৃষ্টির মাঝে জন্ম নেন শত মহীরূহ।’
বাঙ্গালীর আদিম কৌম সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। এই মাতৃতান্ত্রিক বাংলার দার্শনিক চিন্তার ঐতিহ্যকে বাংলায় বলা হয় ‘ভাব’। এই ভাবটি আজও বাঙালির চিন্তার জগতকে আলোড়িত করে। বাংলার মরমী সুফিসাধক, প্রেমময়ী বৈষ্ণব-বাউলের বিশুদ্ধ জীবনকে আচ্ছন্ন করে আছে এই ভাব। ভাবের শিকড়টি বাংলার আদিম কৌমসমাজে প্রোথিত বলেই সম্ভবত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই ভাবটি নারীবাদী, যেহেতু আদিম কৌম সমাজ মাতৃকেন্দ্রিক ছিল। এই নারীবাদী ভাবদর্শন শুধু আউল-বাউলদের না, শহুরে কবি-লেখকদের মাঝেও সঞ্চারিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-
‘ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি।
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে’।
এখানে ‘মা’ হচ্ছে ‘দেশ বা সমাজ’। ‘মা’ আবার ‘নারী’ বা ‘প্রকৃতি’। আমাদের জাতীয় কবি নজরুলও লিখেছেন-
‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লীজননী
ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনী।
রৌদ্র তপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল।
আম কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল।
ঝঞ্ছার সাথে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল লয়ে অশনি’।
২
বাঙালি কবিদের এই নারীভাবনাটি দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য? যদি এটি বাংলার দীর্ঘকালীন ঐতিহ্যই হয়, তাহলে কবে এবং কিভাবে এর সূচনা ঘটলো? এর উত্তর খুঁজে পেতেও যেতে হবে সুদূর অতীতে। কারণ এই বাংলায় সাতক্ষীরার কপোতাক্ষ নদের তীরে কপিলমুনি গ্রামে জন্মেছিলেন মহা জ্ঞানী কপিল, তাকে বলা হয় ‘আদি-বিদ্বান’। অনেকের মতে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান ‘কপিলাবস্তু’ তার নামেই হয়েছে। ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন দর্শন ‘সাংখ্য দর্শন’ এর প্রবর্তক কপিল মুনির সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দের দিকে বলে অনেকে মনেকরেন। তবে জার্মান অধ্যাপক Richard Garbe তার Die Sāmkhya-Philosophie বইতে কপিলের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দ বলে নির্ধারণ করেছেন। অর্থাৎ কপিলে’র জন্ম বুদ্ধের অনেক আগে, বুদ্ধের শিক্ষক আলার কালাম এবং উদ্দক রামপুত্ত কপিলের দর্শনের অনুসারী ছিলেন। সেকারণেই বুদ্ধের দর্শনে কপিলের ছাপ রয়েছে। আমার এই লেখায় সেটিই বারবার আসবে। কপিলের প্রচারিত দর্শনটি বাংলার ভাব-দশর্নের আদিমতম স্তর! এখন প্রশ্ন হলো এই সাংখ্য দর্শনটি কি? ‘সাংখ্য’ শব্দটি এসেছে ‘সংখ্যা’ শব্দটি থেকে। কপিল মহাবিশ্বের উদ্ভব ব্যাখ্যা করার সময় ২৫টি জাগতিক পদার্থের উল্লেখ করেছেন। তবে ‘প্রকৃতি’ই সাংখ্যদর্শনের মূল উপজীব্য। প্রকৃতিই চিহ্নিত হয়েছে বিশ্বের ‘আদ্যাশক্তি’ রূপে। এটি হলো সেই শক্তি যার আগে অন্য কোন শক্তি ছিলনা এবং তার থেকেই সব কিছুর সৃষ্টি। তবে এই শক্তি ঈশ্বর নয়।
‘ঈশ্বরাসিদ্ধেঃপ্রমাণাভাবাৎ’ অর্থাৎ ঈশ্বর নেই কারণ তার প্রমাণ নেই কিন্তু প্রমাণ আছে কেবল প্রকৃতির। সেই প্রকৃতি থেকেই বিশ্বের সবকিছুর সৃষ্টি, প্রকৃতিই আদি- এটাই সাংখ্যদর্শনের সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত স্থাপিত হয়েছে খুবই শক্ত ভিত্তির উপর, তা হলো বস্তুজ্ঞান, এই বস্তু আর প্রকৃতি কিন্তু অভিন্ন। এটা পরে ব্যাখ্যা করবো। যাহোক কপিল সংসারে মানুষকে দুঃখ ভোগ করতে দেখেছেন এবং একই সঙ্গে তিনি দুঃখ থেকে মুক্তি লাভের উপায় নিয়েও ভেবেছেন। মানুষ সংসারে ত্রিবিধ দুঃখ ভোগ করে। এগুলো হলো- (১) আধ্যাত্মিক (২) আধিভৌতিক এবং (৩) আধিদৈবিক। আগেই যেটা বলেছি, তার মতে জগতের মূল হলো প্রকৃতি এবং প্রকৃতির মূল হলো শূন্য। তিনি এজন্য প্রকৃতিকে ‘অমূল-মূল’ বলেছেন। তার মানে প্রকৃতির মূল শূন্য। প্রকৃতির সাথে পুরুষের সংযোগের ফলে প্রথমে উৎপন্ন হয় মহৎ; এরপর অহঙ্কার; এরপর পঞ্চ তন্মাত্র; এরপর একাদশ ইন্দ্রিয় এবং এরপর স্থূল ভূত। মহৎ অর্থ-চেতনা। অহঙ্কার হলো- ‘আমি জ্ঞান’। পঞ্চ তন্মাত্র হলো- শব্দ, র্স্পশ, রূপ, রস ও গন্ধ। একাদশ ইন্দ্রিয় হলো- পাঁচটি কর্ম্মেন্দ্রিয়, পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং অন্তরিন্দ্রিয়। আর স্থূল ভূত হলো- ক্ষিতি, জল, তেজ, মরুৎ এবং আকাশ।
৩
গৌতম বুদ্ধ এই শূন্যতাকে আরও গভীর তত্ত্বীয় রূপ দিয়েছেন। কপিল বলেছেন, অচেতন জড় প্রকৃতির বিকার বা পরিণামের ফলেই সমস্ত বিশ্ব ব্যাপার উৎপন্ন হয়েছে। আর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড হল ত্রিগুণা প্রকৃতির পরিণাম বা অভিব্যক্তি। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ, প্রকৃতির এই তিনটি গুণের কারণেই বিভিন্ন ধরনের পদার্থ সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। মহাবিশ্ব হলো প্রকৃতির তিনটি গুণের পরিণাম। এই তিনটি গুণ যখন সাম্যাবস্থায় বা একইরকম থাকে তখন সে অবস্থাকে বলে ‘অব্যক্ত’ কিন্তু এই সাম্যাবস্থা ভেঙ্গে গেলে সেই অব্যক্ত প্রকৃতিই জগৎ রূপে অভিব্যক্ত হয়। প্রকৃতির আরেক নাম স্বভাব, জীব যখন প্রকৃতির নিয়ম নীতির সঙ্গে পরিপূর্ণরূপে যুক্ত থাকে তখন তাকে বলে প্রকৃতিস্থ বা স্বাভাবিক কিন্তু এর ব্যত্যয় ঘটলে তাকে বলে অপ্রকৃতিস্থ বা অস্বাভাবিক। কপিল বলছেন যে, ‘প্রকৃতির সহিত সংযোগই পুরুষের দুঃখের কারণ এবং এই সংযোগের উচ্ছেদেই দুঃখ নিবারণের উপায়। তাহাই পুরুষার্থ। প্রকৃতি-পুরুষের সংযোগের উচ্ছেদই দুঃখ মুক্তি।’ কিন্তু, কী ভাবে? বিবেক জ্ঞানই দুঃখ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে। আমি অচেতন প্রকৃতি নই, আমি হলাম চৈতন্যময় পুরুষ। এই উপলব্ধিই হচ্ছে বিবেকজ্ঞান। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতিই ‘প্রধান’ হলেও ‘পুরুষ’ এর অস্তিত্বও স্বীকার করে। এই প্রকৃতি ও পুরুষকে আধুনিক দর্শনের ভাষায় ‘বস্তু’ ও ‘ভার’ বলে অভিহিত করা হয়। ‘বস’ ধাতুর সঙ্গে ‘তুন্’ প্রত্যয় যোগে ‘বস্তু’ শব্দটি গঠিত। ‘বস’ ধাতু দ্বারা বোঝায় বাস করা অর্থাৎ যা বাস করে। আবার প্রকৃষ্টরূপে সাধিত যে-কৃতির নাম প্রকৃতি (প্র-কৃ+ক্তি) সে কৃতি স্বয়ংসিদ্ধ। সাংখ্য মতে ‘প্রকৃতি’ মানে শুধু ‘বস্তু’ নয়, প্রকৃতি মানে হলো ‘নারী’। জড় জগতে যেমন বস্তুই প্রধান, জীব জগতও তেমনি নারী প্রধান। পুরুষ থাকলেও তার ভূমিকা গৌণ, নারী থেকেই যেহেতু সব জীবের সৃষ্টি তাই নারীই প্রকৃতি। যদি আরও স্পষ্ট বা সুনির্দিষ্ট করে বলতে হয় তবে প্রকৃতি হলো নারীর জননাঙ্গ। অর্থাৎ জন্ম প্রক্রিয়ায় নারীর জননাঙ্গেরই যে মূল ভূমিকা- আদি সাংখ্যদর্শনের মাঝে এ বিষয়টিরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। প্রকৃতির আরেকটি রূপ হলো ‘প্রজা’। এই প্রজা শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ [প্র-জিন্(জন্মানো)+ড] অর্থাৎ ‘যা জন্মায়’। এই অর্থে সন্তান-সন্ততির মতো মানুষসহ সমস্ত প্রাণীও প্রজা বা প্রকৃতি।
নিষাদ জাতির মেধা-মনন থেকে উৎসারিত ‘যোগ’ এবং ‘তন্ত্র’ সাংখ্য দর্শনের মতোই প্রাচীন ও প্রকৃতি প্রধান। ‘তন্ত্র’ প্রকৃতিকে অবলোকন করেছে দেহের মধ্যে। ‘তন্ত্র’ সাধনা আসলে দেহ-সাধনার মধ্য দিয়েই প্রকৃতির পরিচর্যা। তন্ত্রের উদ্ভব নিষাদ কৌম সমাজের জাদুবিশ্বাসমূলক সরল বস্তুবাদের মধ্য থেকে। সেই তন্ত্রের মূলকথা ছিল, ‘ব্রহ্মাণ্ডে যে গুণাঃ সন্তি তে তিষ্ঠন্তি কলেবরে’ অর্থাৎ যা নাই ভাণ্ডে(দেহে) তা নাই ব্রহ্মাণ্ডে।’ আর ‘যোগ’ও সেই একইরকম পরিচর্যার ধারক। তন্ত্রের সেই দেহবাদী ভাবনাটি ক্রমশ নারীবাদী একটা রূপ ধারণ করে। মানবশরীর হয়ে উঠে নারীর শরীর এবং গড়ে উঠে তন্ত্র সাধনার নানাবিধ গুপ্ত বিধিবিধান। শেষ পর্যন্ত তন্ত্রের মানে দাঁড়াল-আদিম নারীশক্তির আরাধনা করে অতিপ্রাকৃত শক্তি অর্জন করা। এই ভাবনাটি একই সঙ্গে বাংলার বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মসম্প্রদায়কে প্রভাবিত করেছিল বলেই বাংলার বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মের স্বরূপটি তান্ত্রিক। বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মের সহজযানীরা বিশ্বাস করতেন জপ বা প্রার্থণা করে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব না। পরমজ্ঞান সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা-স্বয়ং গৌতম বুদ্ধও জানতেন না। তাদের মতে সবার পক্ষেই বুদ্ধত্ব লাভ সম্ভব এবং এই বুদ্ধত্বের অধিষ্ঠান দেহের মধ্যে। তাদের মতে দেহবাদ বা কায়সাধনই একমাত্র সত্য আর শূন্যতা হলো প্রকৃতি এবং করুণা হলো পুরুষ। এখানেই সহজযানীদের সঙ্গে বাউল মতবাদের মিল। তাদের এই ধারণা আসলে সাংখ্যদর্শনের প্রভাব। এই শূন্যতা ও করুণার মিলনে অর্থাৎ নারী ও পুরুষের মিলনে বোধিচিত্তের যে পরমানন্দ অবস্থা হয় তাই মহাসুখ। এই মহাসুখই একমাত্র সত্য। সহজযানের লক্ষ্য ছিল মহাসুখ। সহজযানীরা মৃত্যুর পর মুক্তিলাভে বিশ্বাস করতেন না। এই ধারণাই উনিশ শতকে লালনের গানে প্রকাশ পেয়েছে-
শুনি মলে (মরলে) পাব বেহেস্তখানা/ তা শুনে তো মন মানে না/
বাকির লোভে নগদ পাওনা/ কে ছাড়ে এ ভুবনে/
সহজ মানুষ/ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে ...
৪
মধ্যযুগের বাঙালি চিন্তাবিদেরা তাদের চিন্তাশীল পূর্বপুরুষের এ রকম গভীর গভীরতর বক্তব্যে নিশ্চয়ই উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। তাদের পক্ষে উজ্জীবিত হয়ে ওঠাই ছিল স্বাভাবিক। কবি আল মাহমুদ তার ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যে তাই লিখেছেন,
‘মধ্যযুগের এক যুবক গোস্বামী
দেহেই পেতে চায় পথের নির্দেশ’।
বাংলার প্রাকৃতজন তাদের চেতনায় প্রকৃতি সঙ্গত বস্তুবাদকেই ধরে রেখেছে। বৌদ্ধ-হিন্দু-ইসলামের মতো শাস্ত্রীয় ধর্মগুলো যখন বাংলার লোকসাধারণের মাঝে প্রচারিত ও প্রবর্তিত হয়েছে, তখন লোক সাধারণ সেসব ধর্মের শাস্ত্রীয় অনুশাসনেরও লোকায়ন ঘটিয়ে নিয়েছে। আর ধর্মশাস্ত্রের লোকায়ন মানে অদৃশ্য পরলোকের বদলে প্রত্যক্ষদৃষ্ট প্রকৃতি ও ইহলোকের আধারে ধর্মকে স্থাপন করা। এভাবেই বাংলার লোকসাধারণের আচরিত ধর্মগুলো হয়ে গেছে লৌকিক বৌদ্ধ, লৌকিক হিন্দু এবং লৌকিক ইসলাম (শব্দটি সম্ভবত ডঃ মুহম্মদ এনামুল হক প্রথম ব্যবহার করেন)। এই লৌকিক বৌদ্ধ ধর্মেরই একটি বিশেষ প্রকরণ হলো ‘সহজযান’ আর এখান থেকেই এসেছে সহজিয়া। বৌদ্ধ ও বৈষ্ণব সহজিয়াদের চিন্তার সঙ্গে সুফিবাদ প্রভাবিত লৌকিক ইসলামের সংযোগ প্রাকৃতজনের দর্শনচিন্তাকে পুষ্ট করে কৌম ঐতিহ্যসম্পন্ন বাঙ্গালির বাউল মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে। বৈষ্ণব সহজিয়ারা মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের ধ্বংসাবশেষ।
৫
সহজিয়াদের মতো লালনের বাউল মতবাদে কপিল-কথিত ‘প্রকৃতি’ শব্দটির রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। এই বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, ‘বাউলসাধনায় নারীর একটি স্বতন্ত্র গুরুত্ব ও মূল্য আছে। নারী বা প্রকৃতি বাউলের সাধনসঙ্গিনী। বাউলের দেহকেন্দ্রিক যে সাধনা, নারী ছাড়া তা অসম্ভব ও অর্থহীন। (মনে রাখতে হবে বাংলায় ‘তন্ত্রের’ উদ্ভব হয়েছিল। সেই তন্ত্রের মূলকথা ছিল- ‘যা নাই দেহভান্ডে, তা নাই ব্রহ্মান্ডে।’ অর্থাৎ, যা মানবশরীরে নেই, তা মহাবিশ্বে নেই! ... সেই ভাবনা ক্রমশ নারীবাদী রূপ নিল। মানবশরীর হয়ে উঠল নারীর শরীর, গড়ে উঠল তন্ত্র সাধনার নানাবিধ গুপ্ত বিধিবিধান।)...‘মহাযোগ’ অর্থাৎ রজঃস্বলা রমনীর বিশেষ তিন দিনে পুরুষ ও প্রকৃতির যুগল মিলনেই চলে ‘মানুষ-ধরা’র সাধনা। বাউল মতের উদ্ভবের সঙ্গেও নারীর সম্পর্ক রয়েছে-চৈতন্য-পার্ষদ নিত্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্রের গুরু হিসেবে প্রচারিত ‘মাধববিবি’-কেও কেউ কেউ এই মতের প্রবর্তনার সঙ্গে যুক্ত করে থাকেন। এই মরমী সাধনার আদিরূপের অনেক গুপ্ত রহস্য নবি-দুহিতা হজরত ফাতেমা অবগত ছিলেন বলেও বাউল -ফকিরদের বিশ্বাস। সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গেও নারীর রয়েছে নিগূঢ় সর্ম্পক। বাউলের সাধনা ও উপলব্ধিতে নারীর রূপ-স্বরূপের যে পরিচয়-গুণ-মাহাত্মের যে বৈশিষ্ট্য, তা সবচেয়ে আন্তরিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে বাউলসাধনা ও দর্শনের শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার লালন সাঁই-এর পদাবলিতে।’
বাংলায় বৌদ্ধসমাজে স্থবিরবাদ নামে যে দার্শনিক মতের উদ্ভব হয়েছিল, তারা মনে করতেন, যে কেউ নিরাসক্তি এবং মানসিক অনুশীলনের উচ্চ স্তরে পৌঁছলে অতিপ্রাকৃতিক শক্তির অধিকারী হতে পারে। বুদ্ধ যাদুবিদ্যা চর্চার নিন্দা করতেন অথচ স্থবিরবাদীরা যাদুবিদ্যা চর্চা করতেন। বজ্রযানীদের প্রধান দেবী হলেন তারা। ইনি ছিলেন বুদ্ধ এবং বোধিসত্ত্বদের স্ত্রী। মাতঙ্গী পিশাচী ডাকিনী যোগীনি-প্রমূখ তুচ্ছ দেবীও বজ্রযানীদের আরাধ্য ছিল। বজ্রযানীরা বিশ্বাস করতেন দেবদেবীদের করূণা ভিক্ষা করে লাভ নেই। এদের বাধ্য করতে হবে। যে গ্রন্থে এ কাজ করার উপায় তাদের বলা হতো ‘তন্ত্র’। যে কারণে বজ্রযানকে বলা হয় তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম। মন্ত্র এবং যন্ত্র -এ দুই হলো বজ্রযানের সাধনার উপকরণ। যন্ত্র হল মোহিনী প্রতীক, যা সঠিক ভাবে আঁকতে হয় আর তাদের প্রধান মন্ত্র হলো- ‘ওম মনিপদ্মে হূম’ অর্থাৎ মনিই প্রকৃত পদ্ম। এই মন্ত্রটি বুদ্ধ এবং প্রজ্ঞাপারমিতার এবং বোধিসত্ত্ব এবং তারা দেবীর যৌনমিলনের প্রতীক। বজ্রযান কেবলি যৌন সাধনপন্থ নয়, এটি বৌদ্ধধর্মের একটি রহস্যময় রূপ। তবে বজ্রযানে ধ্যানের গুরুত্বকে অবহেলা করা হয়নি। বজ্রযানীর উদ্দেশ্য ছিল যৌনচর্চার মাধ্যমে দেবীর কৃপা লাভ করে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা অর্জন। বজ্রযানী সাধকদের বলা হত সিদ্ধাচার্য। বৌদ্ধ ধর্মের মহাযানপন্থার বইপুস্তক সংস্কৃত ভাষায় লেখা হলেও বজ্রযানী সিদ্ধাচার্যগণ লিখতেন বাংলায়। আর তাদের ভাবনার সঙ্কলনই হলো, ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ যা বাংলা ভাষার আদিরূপ। বজ্রযানী কবিরা সুরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ধর্মতত্ত্ব পৌঁছে দিতেন। বাংলায় এভাবেই সংগীতের মাধ্যমে দর্শন চর্চা শুরু হয়েছে। বজ্রযান থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে সহজযানের উদ্ভব আর এই সহজযান থেকেই সহজিয়া। বজ্রযানীরা রহস্যময় আচার অনুষ্ঠান পালন করলেও সহজযানীরা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা অস্বীকার করে। তাদের মতে কাঠ-মাটি-পাথরের তৈরি দেবদেবীর কাছে মাথা নোয়ানো বৃথা। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে বাউল মতবাদের সঙ্গে সহজযানের কি সম্পর্ক? আগেই বলেছি, বাউলদের মতো সহজযানীরাও ছিলেন দেহবাদী। এভাবে সেই প্রাচীন লোকায়ত দর্শনই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে বিবর্তিত হয়ে বাউল মতবাদে এসে পরিণতি পেয়েছে। নানা রূপান্তরের মধ্যেও বাংলার প্রাকৃতজনের দর্শন তার আদিম বস্তুবাদী অন্তঃসারকে ত্যাগ করেনি। লালনের শিষ্য দুদ্দু শাহ্ তাই বলেন-
বস্তুকেই আত্মা বলা যায়
আত্মা কোনো অলৌকিক কিছু নয়
কিংবা
বস্তু ছাড়া নাহি আর আল্লা কিংবা হরি
এহি মত দেখ সবে নর-বস্তু ধরি
রজঃবীর্য এই দুই বস্তু যেবা চিনে
লালন সাইজিকে সেইজন চিনে।
অর্থাৎ নারীর রজঃ ও পুরুষের বীর্য- এই দুই বস্তু থেকেই যেহেতু নর বা মানুষ রূপ বস্তুর উদ্ভব, সেহেতু বস্তুর বাইরে অন্যকিছুকে স্বীকার করা বাউলদের মতে অর্থহীন। এখানেও সেই প্রাচীন দেহাত্মবাদের অনুসৃতি!
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৬ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। নীহাররঞ্জন রায়-বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব)
২। আবদুল মমিন চৌধুরী-প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি
৩। এ কে এম শাহনাওয়াজ-বাংলার সংস্কৃতি বাংলার সভ্যতা
৪। সুনীল চট্টোপাধ্যায়-প্রাচীন ভারতের ইতিহাস
৫। ড. বিনয়তোষ ভট্টাচার্য-বৌদ্ধদের দেবদেবী
৬। যতীন সরকার-প্রাকৃতজনের জীবনদর্শন
৭। আবুল আহসান চৌধুরী-লালন সাঁইয়ের সন্ধানে