
১
মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র যেভাবে বদলে গেছে, তা গত এক দশকে দেখা যায়নি। লাদাখের পাহাড় থেকে দিল্লির যন্তর মন্তর, বিহারের পাটনা থেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা—একটি প্রজন্ম রাস্তায় নেমে প্রথমবারের মতো নরেন্দ্র মোদি সরকারকে হার মানতে বাধ্য করেছে। ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হলেও, প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই বিজয়ের পরে আন্দোলন কি স্তিমিত হয়ে পড়বে, নাকি এটি কেবল প্রথম ঢেউ, যার পেছনে আরও বড় একটি ঢেউ অপেক্ষা করছে?
২
পটভূমি: একটি বিদ্রূপ থেকে জাতীয় বিদ্রোহ।
১৫ মে ২০২৬ তারিখে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণদের উদ্দেশে "তেলাপোকা" ও "সমাজের পরজীবী" বলে মন্তব্য করেন। এই অবমাননাকর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎ ১৬ মে ২০২৬ তারিখে একটি বিদ্রূপাত্মক সংগঠন গড়ে তোলেন—"ককরোচ জনতা পার্টি" (সিজেপি), স্লোগান: "অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর।" প্রথমে এটি নিছক একটি অনলাইন রসিকতা হলেও, মাত্র ৭৮ ঘণ্টায় এর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, আর কয়েক দিনের মধ্যেই তা বিজেপির দলীয় হ্যান্ডেলকেও পেছনে ফেলে দেয়।
এই সময়ে NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং CBSE-র অনস্ক্রিন মূল্যায়ন সংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে ছাত্রসমাজে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও এই ক্ষোভে ইন্ধন জোগায়। এই দুই স্রোত—বিদ্রূপাত্মক অনলাইন আন্দোলন এবং পরীক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে বাস্তব ক্ষোভ—একত্র হয়েই জন্ম দেয় এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক আন্দোলনের।
৩
আন্দোলনের সময়রেখা: জুন থেকে জুলাই।
৬ জুন ২০২৬: সিজেপি, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA) ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার মতো বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে টানা বিক্ষোভ শুরু হয়। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা-সংস্কারই ছিল মূল দাবি।
২০ জুন: আন্দোলনের প্রথম দিনটি ছিল হতাশাজনক—দুই কোটির বেশি ইনস্টাগ্রাম অনুসারী থাকা সত্ত্বেও যন্তর মন্তরে হাজির হন মাত্র কয়েকশো মানুষ, যাদের একটি বড় অংশ ছিলেন সাংবাদিক ও কনটেন্ট নির্মাতা।
২৮ জুন: লাদাখ-ভিত্তিক পরিবেশবিদ ও শিক্ষা-সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। ওয়াংচুক এর আগেও লাদাখের জন্য স্বায়ত্তশাসন ও ষষ্ঠ তফসিলভুক্তির দাবিতে দীর্ঘ অনশন করেছেন এবং ২০২৫ সালে সহিংস বিক্ষোভের অভিযোগে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে প্রায় ছয় মাস আটক ছিলেন। তার যোগদানে আন্দোলন নতুন গতি পায়, যদিও বড় জনসমাগম তখনও অধরাই থেকে যায়।
১৮ জুলাই: ভোররাতে বেসামরিক পোশাকে চল্লিশ জনেরও বেশি পুলিশ যন্তর মন্তরের মঞ্চ সাদা পর্দায় ঢেকে ২৬ দিন ধরে অনশনরত দুর্বল ওয়াংচুককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে। এই ঘটনা "অপারেশন হোয়াইট চাদর" নামে ভাইরাল হয় এবং জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। AISA-র তিনজন গবেষণারত ছাত্রছাত্রী—নেহা বোরা, আমিন অমিতোজ ও মনীশ—একই সময়ে অনশনে সংহতি জানিয়েছিলেন।
২০ জুলাই: সংসদ অভিমুখে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে। দিল্লি পুলিশের হিসাবে প্রায় ১৮০ জন—৬০ বিক্ষোভকারী ও ১১৮ নিরাপত্তাকর্মী—আহত হন, গ্রেপ্তার হন প্রায় ৭০ জন। এই দমননীতিই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছাড়েননি; বরং পরদিন আরও বড় সংখ্যায় ফিরে আসেন।
২৪ জুলাই: সিজেপি নেতারা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন, একই দিনে সোনম ওয়াংচুক তার ২৬ দিনের অনশন ভাঙেন। একই দিনে কলকাতাতেও NEET প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে বিশাল ছাত্র বিক্ষোভ হয়, যা পরবর্তীতে সহিংস সংঘর্ষে রূপ নেয়।
২৫ জুলাই: শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন—মোদির ১২ বছরের শাসনামলে জনচাপে মন্ত্রীর প্রথম পদত্যাগ। সিজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করে।
৪
বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রসারণ।
দিল্লির আন্দোলনের ঢেউ বিহারেও আছড়ে পড়ে, যেখানে পুলিশের গুলিতে অন্তত তিনজন বিক্ষোভকারী আহত হন। পরে ২৬ জুলাই বিহার সরকার এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ২৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার আগে পর্যন্ত রাজ্যে অংশ নেওয়া সব বিক্ষোভকারীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার ও আটকদের মুক্তির ঘোষণা দেয়—বিরোধী নেতা তেজস্বী যাদবের হুঁশিয়ারির পরই এই পশ্চাদপসরণ ঘটে।
পশ্চিমবঙ্গে চিত্রটি জটিলতর। রাজ্যে এখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায়, আর ২৪ জুলাই কলকাতায় NEET প্রশ্নফাঁস নিয়ে বিশাল ছাত্র বিক্ষোভের জবাবে রাজ্য সরকার ব্যাপক ধরপাকড় চালায় এবং আন্দোলনকে "দেশবিরোধী শক্তি"র অনুপ্রবেশ বলে প্রচার চালায়। অন্তত ১১ জন গ্রেপ্তার হন, যাদের ১০ জনই মুসলিম—এই সাম্প্রদায়িক বাছাইয়ের অভিযোগ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। ২৭ জুলাই বিজেপি পাল্টা "তেরঙ্গা র্যালি" বের করে। তবে ২৯ জুলাই চাপের মুখে পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকারও বিহার, অসম ও দিল্লির পথ অনুসরণ করে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা স্থগিত করে। লাদাখ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ—তিন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে একই প্রবণতা স্পষ্ট: প্রাথমিক দমন-পীড়নের পর রাষ্ট্রীয় পশ্চাদপসরণ।
৫
আন্দোলন কি সত্যিই স্তিমিত?
পদত্যাগের পর যন্তর মন্তরে যে নীরবতা নেমে এসেছিল, তা স্তিমিত হওয়ার প্রথম লক্ষণ বলেই অনেকে মনে করছেন। সিজেপির মুখপাত্ররা নিজেরাই স্বীকার করেছেন, আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তাদের কাছে এখনও স্পষ্ট উত্তর নেই—তারা নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করবে কিনা, তাও অনিশ্চিত। এদিকে বিজেপি সরকার দমন ও তোষণের মিশ্র কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে: একদিকে বিভিন্ন রাজ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কসহ শত শত তরুণ-তরুণীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় "রিল প্রজন্ম"-কে টার্গেট করে জনপ্রিয় সংস্কৃতির আদলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ভারতের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ২৯ বছরের কমবয়সী হওয়ায় এই তরুণ ভোটব্যাংক ফিরে পাওয়া বিজেপির জন্য কৌশলগতভাবে জরুরি।
সাংস্কৃতিক সমালোচক রবিকান্ত কিসানা তার বিশ্লেষণে লিখেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুর সমাধান নয়, বরং এক প্রজন্মগত বিক্ষোভের সাময়িক নিষ্পত্তি মাত্র—এটি জেন-জিকে শান্ত করবে না, বরং সাময়িকভাবে ছড়িয়ে দেবে। তার ভাষায়, এই স্বতঃস্ফূর্ত জনতা কোনো একক নেতা বা দলের প্রতি অনুগত নয়; তারা নিজস্ব শর্তে সংঘবদ্ধ হয়েছিল, ফলে বিজয়ের পরও তাদের গতিপথ অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে।
৬
নাকি আরেকটা ঢেউ আসন্ন?
কয়েকটি কাঠামোগত কারণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই আন্দোলন সাময়িক স্তিমিত হলেও সম্পূর্ণ নিভে যায়নি।
প্রথমত, এই আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো প্রথাগত রাজনৈতিক দলের মতো নয়—এটি ডিসকর্ড, টেলিগ্রাম, রেডিট ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিকেন্দ্রীভূতভাবে সংগঠিত হয়েছিল, নেপাল ও মাদাগাস্কারের জেন-জি আন্দোলনের ধাঁচেই। এমন বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্ক একবার তৈরি হয়ে গেলে তা সহজে বিলুপ্ত হয় না; বরং নতুন ইস্যু পেলেই দ্রুত পুনরায় সক্রিয় হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দাবি আংশিক পূরণ হলেও কাঠামোগত অভিযোগগুলো—উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ, ক্যাম্পাসে জাতপাত বৈষম্য, সংরক্ষণ-বিরোধী প্রচারণা, NAAC ও জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) নিয়ে অসন্তোষ—এখনও অমীমাংসিত। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, সিজেপি এই ইস্যুগুলো সামনে আনলে জেন-জি আবার রাস্তায় নামবে কিনা।
তৃতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে যে আন্দোলন এখন আর দিল্লি-কেন্দ্রিক নেই; মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, পাটনা, লখনৌ, আইজলের মতো শহরেও এর প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তারের অভিযোগ নতুন করে ক্ষোভ উসকে দিতে পারে।
চতুর্থত, রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় জ্বালানি হয়ে উঠেছিল—১৮ জুলাইয়ের "অপারেশন হোয়াইট চাদর" ও ২০ জুলাইয়ের পুলিশি দমনই জনসমর্থনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাষ্ট্র যদি ভবিষ্যতে ফের কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা আরেকটি স্বতঃস্ফূর্ত ঢেউয়ের জন্ম দিতে পারে।
তবে বিপরীত যুক্তিও শক্তিশালী: নির্দিষ্ট দাবি পূরণের পর আন্দোলনের নৈতিক কেন্দ্রবিন্দু দুর্বল হয়ে পড়ে, নেতৃত্বহীন স্বতঃস্ফূর্ত জনতা দীর্ঘমেয়াদে সংগঠিত থাকা কঠিন, আর সরকার এখন সতর্ক ও কৌশলী—একদিকে তোষণ, অন্যদিকে নির্বাচিত দমন প্রয়োগ করে আন্দোলনকে বিভক্ত রাখার চেষ্টা করছে।
৭
ভারতের জেন-জি আন্দোলন এই মুহূর্তে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ একটি প্রতীকী ও বাস্তব বিজয়, কিন্তু তা প্রজন্মগত ক্ষোভের সম্পূর্ণ নিরসন নয়। বাংলাদেশ ও নেপালের অভিজ্ঞতা বলছে, বিপ্লব-পরবর্তী নির্বাচনে জেন-জির প্রত্যাশা প্রায়শই পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর কাছেই হার মানে। ভারতেও সিজেপি নির্বাচনী রাজনীতিতে যাবে কিনা তা অনিশ্চিত। তবে যে বিকেন্দ্রীভূত, মিমভিত্তিক, দ্রুত সংগঠিত হতে সক্ষম তরুণ নেটওয়ার্ক এবার নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে, তা সহজে অদৃশ্য হবে না। বর্তমান নীরবতা তাই স্থায়ী সমাপ্তি নয়, বরং পরবর্তী ঢেউয়ের আগে এক কৌশলগত বিরতি হতে পারে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১ আগষ্ট ২০২৬