
১
ফরাসী ভাষাভাষি এক আলজেরীয় পরিবারে আলবেয়ার কাম্যুর জন্ম। নিজেকে একজন দার্শনিক বলে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করলেও, আসলে তিনি মনে প্রাণে একজন কবি। ‘প্রধানত দার্শনিক, পরে সৃষ্টিশীল লেখক’ বললে কাম্যুর পরিচয় অনির্দিষ্ট হয়ে উঠে। তবে তিনি দর্শনের বাড়াবাড়িতে আবদ্ধ হয়েও নিজেকে লেখক হিসাবেই প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। ১৯৫৭ সালে কাম্যু সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পান এবং ১৯৬০ সালে প্যারিসের বাইরে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় কাম্যুর মৃত্যু হয়। বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত সময়কালে লেখা আলবেয়ার কাম্যুর অনন্য সৃষ্টি ‘নাটক-ক্যালিগুলা’। দু’হাজার বছরের প্রাচীন রোমান সম্রাট ‘ক্যালিগুলা’ রোমের ইতিহাসে এক নৃশংসতম নায়ক। উম্মাদের মতো তার ছিল হত্যার নেশা।
সেই ‘ক্যালিগুলা’ নাটকের এক দৃশ্য-
ক্যালিগুলা ডেকে পাঠালেন সতেরো বছরের তরুন কবি সিপিও কে।
ক্যালিগুলা- তুমি কি সত্যিই দেবতায় বিশ্বাস করো,সিপিও?
সিপিও- না।
ক্যালিগুলা- তবে আমার বোধগম্য হলো না।বিশ্বাসই যদি না করো তবে অধার্মিকতা খোঁজার এত আগ্রহ কেন?
সিপিও- না বুঝে অন্যের বিশ্বাসের উপর আঘাত হেনেও কেউ হয়তো অস্বীকার করতে পারে অথবা অন্যের বিশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নে বর্তমান সময়েও কিরকম মিল! সময়-পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলেছে কিন্তু আমরা কি আসলেই এগিয়েছি নাকি একই বৃত্তে ক্রমাগত ঘানি টানছি সিসিফাসের মতো!
নাটকের দৃশ্যে দ্রুসিলার মৃত্যুর পর থেকে ক্যালিগুলা ‘চাঁদ’ খুঁজতে থাকে। উদ্ভ্রান্ত সম্রাট বলে, ‘এখনও পাইনি, আরও খুঁজতে হবে, আরও... আমাকে যে এমন কিছু পেতে হবে, যা আর কেউ পেতে পারে না...’ খুঁজতে গিয়েই ক্যালিগুলা বাজি রাখে নিজের জীবন। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ের সে বাজি রাখে গোটা দেশটাকে, অগণিত মানুষকে। এক অর্থহীন শূন্যতার ভেতর একা দাঁড়িয়ে সে গোটা সমাজের ওপর নামিয়ে আনে এক রক্তক্ষয়ী অভিশাপ। আজ ধর্ম-অধর্ম, আস্তিক-নাস্তিক, নারীবাদ, শোভেনিজম, এলজিবিটিকিউ সহ বিভিন্ন ইস্যুতে সমাজে যারা বিভেদের দেয়াল গড়ছেন, তারা জানেন এর পরিণাম কত মারাত্মক, কত সুদূরপ্রসারী, ঠিক যেমন জানতেন সম্রাট ক্যালিগুলা। এক উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী যখন বলেন ‘...স্বেচ্ছাচারী উন্মাদ সম্রাট আমরা দেখেছি। কিন্তু ক্যালিগুলা ঠিক উন্মাদ নয়। কারণ ও জানে ও কী করতে চায়।’ সে স্থির ভাবে জানে সব কিছু, সে পারে মানুষের বুকের মধ্যে ভয়কে প্রতিষ্ঠা করতে। তাই সে হাসিতে ফেটে পড়ে বলতে পারে, ‘...মান, সম্মান, বোধবুদ্ধিগুলি কেমন একে একে খসে পড়ছে দেখো। ভয়। ভয় একটা মহান আবেগ, একেবারে শুদ্ধ, সহজ এবং পরিপূর্ণ...’।
আমরা নাটকের এক দৃশ্যে দেখি,
ক্যালিগুলা- কেউ একা হতে পারে না, কারণ আমাদের চারপাশে ভিড় করে থাকে আমাদের অতীত, আমাদের ভবিষ্যৎ, তাড়া করে বেড়ায় আমাদের...’।
সিপিও- তবে মানুষের নিভৃত নিরাময় কীসে ? কোথায় আছে আশ্রয়? তোমার মধ্যে তেমন কিছু নেই?
ক্যালিগুলা- আছে।ও রকমই কিছু একটা আছে ঘৃণা!
২
ক্যালিগুলার শরীর চুঁইয়ে পড়া সে ‘ঘৃণা’ যেন ক্রমাগত ঢুকে পড়েছে আমাদের শরীরে, রক্তকণিকায়। ঘৃণার সে বিষবাষ্প যেন ক্যালিগুলার মতোই একটা উদ্ভ্রান্ত দানব! সাংখ্য-যোগ-তন্ত্রের বাঙলায় ক্রমাগত চেপে বসতে চাচ্ছে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৮ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। পদ্য-পাগলের পাণ্ডুলিপি – পূর্ণেন্দু পত্রী
২। ইন্টারনেট