
১
২২ জুন ২০২৩। বৃহস্পতিবার। এথেন্সের স্ট্যাভ্রোস নিয়াকোস ফাউন্ডেশন কালচারাল সেন্টারে সিএনএন-এর সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ান মারিয়া হেইদেহ আমানপুরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এমন একটি উক্তি করেছিলেন যা আজও প্রাসঙ্গিক এবং ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতো শোনায়: "যদি আপনি ভারতে সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা না করেন, তাহলে একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে যে ভারত কোনো এক সময় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।" যদি মূল সাক্ষাৎকারটির দিকে তাকাই,
Christiane Amanpour: "If you had a conversation with [Prime Minister Narendra] Modi, whom you know well, what would your message to him be?"
Barack Obama: "Look, if I were speaking to Prime Minister Modi—whom I know well and with whom I, you know, had a good working relationship—part of my argument would be that if you do not protect the rights of ethnic minorities in India, there is a strong possibility that India at some point starts pulling apart. And we've seen what happens when you start fracturing, you know, along these lines. So, the, you know, sort of measures inside India are something that I think is worth raising."
ওবামার মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ভারতের সেসময়ের সরকারি মন্ত্রী এবং নেতৃবৃন্দ তীব্র সমালোচনা করেছেন। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এই মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং ওবামার নিজের রাষ্ট্রপতিত্বের সময়কার মার্কিন বৈদেশিক নীতির বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। এছাড়াও শাসক দলের সমর্থকরা ওবামার বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতি এবং ভারত-মার্কিন সম্পর্ক যখন উদযাপিত হচ্ছিল, তখন সমালোচকদের তোষণ করার অভিযোগ তোলেন। যাহোক, তিন বছর পর আজ যখন আমরা ওবামার সতর্কতাগুলিকে ভারতের বর্তমান ঘটনা প্রবাহের সাথে মিলিয়ে দেখি, তখন তার শব্দগুলি অত্যন্ত নির্ভুল এবং উদ্বেগজনক বলেই প্রমাণিত হয়।
২
ওবামার আশঙ্কা: আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি পাঠ।
বারাক ওবামা বুঝতেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সুসঙ্গতি অঙ্গাঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। তার উক্তিতে তিনি একটি সার্বজনীন ঐতিহাসিক নীতি উল্লেখ করেছিলেন: বহুজাতিক রাষ্ট্রগুলি যখন সংখ্যালঘুদের অধিকার স্বীকার করা থেকে বিরত থাকে, তখন তারা অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং শেষ পর্যন্ত খণ্ডবিভাজনের ঝুঁকিতে পড়ে। ভারতে, যেখানে মুসলিমরা প্রায় ২০ কোটিরও বেশি জনগোষ্ঠী গঠন করে এবং অসংখ্য অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু রয়েছে, ওবামার সতর্কতা সেখানে শুধুমাত্র একটি পর্যবেক্ষণ নয়—এটি সম্ভাব্য সমাধানের দিকে একটি আহ্বান। কিন্তু বছরের পর বছর জুরে ভারতে যা ঘটছে তা এই সতর্কতার প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি করেছে, এবং একই সাথে ওবামার ভবিষ্যতবাণীর ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে আমরা কি দেখি?
ক। পশ্চিমবঙ্গ: সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু।
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে সহাবস্থানের ঐতিহ্য বজায় থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং তার পরবর্তী সময়ে রাম নবমীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় শোভাযাত্রাকে ঘিরে হাওড়া, হুগলি ও মুর্শিদাবাদের কিছু এলাকায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে প্রশাসন ও সুশীল সমাজের মধ্যে নানা আলোচনা তৈরি হয়। ২০২৬ সালের প্রারম্ভেও বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উসকানিমূলক প্রচারণা বা তথাকথিত ভুয়া খবরের জেরে উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার কিছু অঞ্চলে সাময়িক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনাগুলোর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং সংখ্যালঘুদের আইনি সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় নাগরিক সমাজ ও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলো তাদের মতামত ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, জনপরিসর ও উপাসনালয় ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নানামুখী বিতর্ক রাজ্যের সামাজিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। কলকাতার রাজাবাজারসহ কিছু জনবহুল এলাকায় রাস্তায় জুম্মার নামাজ আদায় কিংবা শব্দসীমা ও আইনি নিয়মকানুন মেনে মাইকে আজান প্রচারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে মতপার্থক্য ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলোতে গবাদিপশু পরিবহন ও লেনদেনকে কেন্দ্র করে এবং প্রাচীন উপাসনালয় ও গির্জা ভাঙচুর বা ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি নিয়ে বিভিন্ন সময় সেখানকার মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে উদ্বেগ উঠে এসেছে। এই ধরনের জটিলতাগুলো দূর করতে এবং পারস্পরিক আস্থা বজায় রাখতে যাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অথচ অভিযোগ পাওয়া গেছে যে স্থানীয় সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি কখনও কখনও এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময় ভারসাম্যহীন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের অভিযোগ প্রায়ই লক্ষ্য বস্তু হওয়া বা আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত করে। ওবামার বক্তব্যের প্রথম স্তম্ভ—"সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা"—এই প্রসঙ্গে ঠিক যেখানে চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা চিহ্নিত করে।
খ। আসাম: মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গা এবং রাজ্যবিচ্ছেদের আশঙ্কা।
আসামের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাঙালি এবং স্থানীয় অহমিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অভিবাসন ও ভূমি অধিকারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের জাতিগত টানাপোড়েন চলে আসছে। ১৯৭১ সালের পটভূমি এবং ১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক আসাম চুক্তির শর্তানুযায়ী রাজ্যে অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়াগুলো বিভিন্ন সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট তারিখে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) এর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের অন্তর্ভুক্তি না হওয়াকে কেন্দ্র করে নাগরিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও মানবিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। এই জটিল প্রক্রিয়াগুলো অনেক সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় এবং স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে এক বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে ফেলে।
এই ধরনের নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের রাজনৈতিকীকরণ প্রায়শই ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজনকে তীব্র করে তোলে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বহুজাতিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করার যে প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন, আসামের এই দীর্ঘমেয়াদী নাগরিকত্ব সংকট এবং সামাজিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপট সেই সতর্কবার্তার গুরুত্বকেই নতুন করে তুলে ধরে।
গ। মণিপুর: চলমান কারফিউ এবং রাষ্ট্রীয় ভাঙনের প্রতীক।
উত্তর-পূর্ব ভারতের সংকটগ্রস্ত রাজ্য মণিপুরে ৩ মে ২০২৩ তারিখে মৈতৈ সম্প্রদায় এবং কুকি-জো উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে জাতিগত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদী কারফিউ ও তীব্র সামাজিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে চলমান রয়েছে। ইম্ফল উপত্যকা ও পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে সরকারি হিসাব অনুযায়ী শত শত মানুষের প্রাণহানি এবং হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভূমি অধিকার, সম্পদের বণ্টন এবং তফশিলি উপজাতি (এসটি) মর্যাদা সংক্রান্ত দাবিগুলোকে কেন্দ্র করে মণিপুর হাইকোর্টের ১৪ এপ্রিল ২০২৩ তারিখের একটি আদেশ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কার্যকর সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে, যা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বহুজাতিক রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার সতর্কবার্তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে। বিষ্ণুপুর ও চূড়াচাঁদপুর জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলসহ রাজ্যের বিভিন্ন অংশে বারবার ফিরে আসা সহিংসতা, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা প্রমাণ করে যে সামাজিক সুসংহতি রক্ষা ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে একটি রাষ্ট্রের অখণ্ডতা কীভাবে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ঘ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্য।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে জাতিগত বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে ওবামার সতর্কতার বিপরীতে কি ঘটছে?
# মেঘালয়: মেঘালায় ওয়েস্ট গারো হিলস জেলায় গারো হিলস অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের (GHADC) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ট্রাইবাল ও অ-ট্রাইবাল (বিশেষত বাংলাভাষী সংখ্যালঘু মুসলিম) জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে চিবিনং ও তুরা এলাকায় রাজনৈতিক মনোনয়ন জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সহিংসতা রূপ নেয় এবং পুলিশি হস্তক্ষেপে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর জেরে প্রশাসন সেখানে কারফিউ জারি ও ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করতে বাধ্য হয়, যা স্থানীয় জনমিতি ও অধিকারের সংঘাতকে স্পষ্ট করে।
# অরুণাচল প্রদেশ: ধেমাজি ও অরুণাচল সীমান্ত অঞ্চলে ভূমি বিরোধ ও সাম্প্রতিক গুলিবর্ষণের ঘটনার জেরে অরুণাচল প্রদেশ ও আসাম সীমান্তের লিকাবালি এন্ট্রি পয়েন্টে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় ছাত্র সংগঠনের অর্থনৈতিক অবরোধ এবং দুই পক্ষের মধ্যে পাথর নিক্ষেপের জেরে অরুণাচল পুলিশকে আকাশে গুলি ছুড়তে হয়, যা আঞ্চলিক ও আন্তঃরাজ্য সম্প্রীতির ভঙ্গুর অবস্থাকে নির্দেশ করে।
# মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা: মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে স্থানীয় সুশীল সমাজ এবং ঐতিহ্যবাহী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হলেও মণিপুর ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অস্থিরতার প্রভাবে সেখানেও নিয়মিত নজরদারি বজায় রাখতে হয়। অন্যদিকে, ত্রিপুরায় বাঙালি ও ককবরকভাষী স্থানীয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমি অধিকার ও জনমিতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যে সামাজিক মেরুকরণ ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি হয়।
৩
ওবামার বক্তব্যের বৈধতা: একটি বহুজাতিক রাষ্ট্রের সংকট।
ওবামার যুক্তিটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী। বহুজাতিক এবং বহুধর্মীয় দেশগুলিতে, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং মর্যাদার সুরক্ষা শুধুমাত্র নৈতিক অপরিহার্যতা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। যদি সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তাহীন বোধ করে, যদি তারা আইনি সুরক্ষা বা ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের অভাব অনুভব করে তাহলে তারা প্রান্তিক অঞ্চলে পরিণত হয়। এই প্রান্তিকতা সময়ের সাথে সাথে বিচ্ছিন্নতায় পরিণত হয়, এবং বিচ্ছিন্নতা শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহে। ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা স্পষ্ট, যেমন:
# পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ভোটের রাজনীতির সাথে জড়িত এবং রাজ্যের কিছু অংশে সামাজিক বিভাজন তৈরি করেছে।
# আসামে, নাগরিকত্ব এবং "জাতীয় বিশুদ্ধতা" সংক্রান্ত আলোচনা মুসলিম এবং অন্যান্য সম্প্রদায়গুলির মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
# মণিপুরে, দীর্ঘস্থায়ী সংকট প্রমাণ করে যে যখন ধর্মীয় এবং জাতিগত পরিচয় রাজনৈতিক সংঘর্ষে রূপান্তরিত হয়, এবং যখন সরকার সকল সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন রাজ্য কার্যকরভাবে "ছিন্নভিন্ন" হয়ে যায়।
উপরের ঘটনাগুলো আসলে একটি উদ্বেগজনক প্যাটার্ন প্রকাশ করে, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলি ভোট অর্জনের জন্য ধর্মীয় এবং জাতিগত পরিচয়কে উসকে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত শাসন এবং ন্যায়বিচার দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়। এরফলে নাগরিক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষয় হয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত হয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, সাধারণ মানুষ তাদের সম্প্রদায়ের অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতা ওবামার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত সতর্কতাকে আরও সুগভীর করে তোলে। তিনি বলেননি যে ভারত অবশ্যই ছিন্নভিন্ন হবে, বরং তিনি বলেছিলেন যে যদি সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা না করা হয়, তাহলে এটি একটি "শক্তিশালী সম্ভাবনা"।
৪
সমাধান এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।
ওবামা সতর্ক করার পাশাপাশি, তার বক্তব্যে সমস্যা সমাধানের জন্য দিকনির্দেশনাও দিয়েছিলেন, আর তা হলো সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা করা। এটি শুধুমাত্র নৈতিক বিবৃতি নয়—এটি আসলে রাষ্ট্রের সংহতি বজায় রাখার একটি কৌশল। এর জন্য প্রয়োজন:
# শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো, যা সকল সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করে।
# নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যারা ধর্মীয় বা জাতিগত বিচারে বিশ্বাস করে না।
# রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা, যা পরিচয়ের রাজনীতিকে ছাড়িয়ে যায়।
# শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, যা বৈচিত্র্যকে উদযাপন করে এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি করে।
তিনি ২০২৩ সালে সাংবাদিক ক্রিস্টিয়ান আমানপুরকে সাক্ষাৎকারে যা বলেছিলেন তা ২০২৫-২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং মণিপুরে যেসব ঘটনা ঘটছে তার দ্বারা নিশ্চিত হয়েছে। এটি শুধুমাত্র একজন দ্রষ্টার উপলব্ধির সঠিকতা নয়—এটি বহুজাতিক রাষ্ট্রের অপরিবর্তনীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ভারত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ না নিলে, ওবামার সতর্কতার "শক্তিশালী সম্ভাবনা" বাস্তবতায় পরিণত হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, আসামের মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গা, মণিপুরের চলমান সংকট হলো চোখের সামনে থাকা লক্ষণ, এবং তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৯ আগস্ট ২০২৬