
১
‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,
মায়াবী করুণ-
যতদূরে থাকো ফের কথা হবে, কেননা মানুষ যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক’।
কবি আবুল হাসানের কবিতা উদ্ধৃত করে কথাগুলো লিখেছেন কবি ও অধ্যাপক সুরাইয়া খানম।
কবি মাত্র ২৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। মৃত্যুর কথা জেনেও তিনি কবিতা লিখে গেছেন অবলীলায়। অসম্ভব হৃদয়বান কবির মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয় ক্ষণায়ু জন কিটস এবং সুকান্ত ভট্টচার্যের কথা। কবির জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত কবিতায় ভরপুর ছিল। উদাম হাওয়া, পথের ধূলো, গাছের পাতা, পাখির ডানা, নদীর জল, দিনের কোলাহল কিংবা রাতের নিস্তব্ধতায় তিনি খুঁজে পেতেন তার কবিতা লেখার উপকরণ।
‘আত্মসমালোচনা এবং নৈতিকতার এক তীক্ষ্ণ চাদর জড়ানো ছিল সেই কৃশ দেহটিতে। অস্থির ছিলেন? হ্যাঁ, অপরূপভাবে শরবিদ্ধ এক হরিণের মতো, এক যন্ত্রণাহত সিংহের মতো অস্থির, আবার ছিলেন এক অস্থির আলোর পাখিও। মানুষের অসাধুতা প্রতারণা, কূটকচালী তাঁকে আহত করতো, কিন্তু তিনি বলতেন, রাজহাঁসের মতো তিনি নোংরা পানিতে চলেছেন। কখনো তাঁর মুখে ঈর্ষার কথা ছিল না। হঠাৎ করে চলে গেছেন তিনি। .........হাসান আমাকে তিরস্কারের সুরে প্রায়ই বলতেন, স্মৃতিচারণ করবেন কেন আপনি ? আমি সরল রেখার মতো চলি। সামনে যাই। সামনে......’ এই লেখায় প্রেমিক আবুল হাসানের অন্তর্যাত্রাকে চিত্রিত করেছিলেন সুরাইয়া খানম। কে এই সুরাইয়া খানম? তিনি এক মমতাময়ীর প্রতিকৃতি,
‘এই দেখো শরীর আমারঃ
এ যেন তোমার শান্ত শুদ্ধি নিকেতন,
এ যেনো বিশ্রামাগার হে পথিক ক্লান্ত পথচারী
বসো তুমি শীতলপাটির বুকে
গোলাপ জলের ঝারি, কাঁঠাল ছায়ায়!
এই দেখো হৃদয় আমারঃ
তোমার দুঃখের আলোয়ান
মলিন ও পরিধেয় সব কিছু
খুলে ফেলে রাখো এই উষ্ণ আলনায়
ঐ সব বিগত বোতাম খুলে ফেলোঃ
এই যে মুকুর আমি, চেয়ে দেখো
পথিক নিজেকে রাখো আমার ছায়ায়!
এইখানে বসো মনঃ
মন আমি, আমার চিরুণি
তোমার দুঃখের জটা খুলে ফেলে রাখবো এখনি!
আমার উনুনে তেতে নাও
তোমার যা কিছু আছে, সুস্থ হও!’
(নাচের শব্দ/সুরাইয়া খানম)
২
“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপিকা ড. সুরাইয়া খানম। সেরকম রূপবতী, সুন্দরের সব বিশেষণ দিয়েও সুরাইয়া খানমকে সাজানো যাবে না, এমনই সুন্দর। যখনই করিডোরে দেখেছি অপলক তাকিয়ে রয়েছি, কতদিন শুধু সুরাইয়া খানমকে দেখতে দলবেঁধে ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের সামনে অকারণে ঘুরতে গিয়েছি।
আমরা সব্বাই সুরাইয়া খানমকে ভালোবাসতাম৷ আর সুরাইয়া খানম ভালোবাসতেন কবি আবুল হাসানকে। আবুল হাসান ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র, সত্তর দশকের সেরা রোমান্টিক কবি। ভালোবাসার কবিতা নির্মাণে হাসানের জুড়ি নেই। কবিতা ভালোবেসে কবির প্রেমে পড়েছেন সুরাইয়া খানম।
আমরা সবাই বসে লাইব্রেরীতে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি। সুরাইয়া খানম এলেন, হাসান ভাইকে উঠিয়ে নিয়ে লং ড্রাইভ, দারুণ রসায়ন। এটা ভালোবাসা, বন্ধুত্ব সব মিলিয়ে একটা রহস্য, একটা ঘোরলাগা ভালোবাসা। একদিন সবাই বসে আছি। এলো রূপবতীর গাড়ি, খোলাচুলে এলোকেশী, বটল গ্রীন শাড়ির জমিন, স্লিভলেস ব্লাউজ, গাড়ি থেকে যখন নামছেন আমরা বিমোহিত। হাসান ভাইয়ের পকেট খালি। আমাদের মাঝে কবি মাকিদ হায়দার তখন সদ্য চাকুরী পেয়েছে। একটু আড়াল করে মাকিদকে ইশারা করলাম। মাকিদ গোপনে হাতে দশ টাকা গুজে দিয়ে বললো, ঘুরে এসো হাসান, মন ভালো হয়ে যাবে”।
(রুম নাম্বার ১৪৬ – শওকত আহসান ফারুক)
‘অত বড় চোখ নিয়ে, অত বড় খোঁপা নিয়ে
অত বড় দীর্ঘশ্বাস বুকের নিশ্বাস নিয়ে
যত তুমি মেলে দাও কোমরের কোমল সারস
যত তুমি খুলে দাও ঘরের পাহারা
যত জানো ও-আঙ্গুলে অবৈধ ইশারা
যত না আগাও তুমি ফুলের সুরভি
আঁচলে আলগা করো কোমলতা, অন্ধকার
মাটি থেকে মৌনতার ময়ূর নাচাও কোন
আমি ফিরব না আর, আমি কোনোদিন
কারো প্রেমিক হবো না; প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী চাই আজ
আমি সব প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী হবো!’
যার জন্য কবি সব প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চেয়েছিলেন তিনি বয়সে তার সিনিয়র, সুরাইয়া খানম।
৩
সুরাইয়া খানম তার সময়ের প্রতিভাবান এক গুণী সাহসী মেয়ে। তিনি অসম্ভব রকমের সুন্দরী ও অসাধারন ব্যক্তিত্বের অধিকারিনী ছিলেন। তিনি ভালো কবিতাও লিখতেন, 'নাচের শব্দ' নামে তার কাব্যগ্রন্থটি বেশ প্রসংশিত হয়েছিল।
‘আমার কিন্তু অন্য রকম, বুকের মধ্যে অন্ধকারে
নিযুত কোটি কথার খনি বিষম নীরব বসে আছে
কষ্ট নিয়ে বসে আছে, জেদ করে সে বসে আছে, বসে আছে’।
(নাচের শব্দ/সুরাইয়া খানম)
ঢাকার কবিমহলে তার নামটি পরিচিত, বিলেত থেকে কবিতা পাঠিয়েছেন নানা কাগজে। ব্যাক্তিত্ববান মহিলা, প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ‘ খুবই গর্জিয়াস মহিলা’। কবিতা অনুবাদ করেন, ইংরেজিতেও কবিতা লিখেন, প্রবন্ধ লিখেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় কর্মী ছিলেন, প্রবাসী সরকারের হয়ে কাজে নিবেদিত ছিলেন। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অভ্যুদয়ের পর লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়্যারে বাঙালিদের বিজয় অনুষ্ঠানে আমাদের নতুন লাল সবুজ জাতীয় পতাকাটি তারই হাতে উত্তোলনের ভার দেয়া হয়েছিল। সেই মুহূর্তটিকে নিয়ে ‘পতাকা’ নামে কবিতাও লিখেছেন সুরাইয়া।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যেদিন লণ্ডন যান, সুরাইয়া মালা হাতে ক্লারিজেস হোটেলে তাকে এক নজর দেখতে গিয়েছিলেন। তার মাথায় হাত রেখে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার মায়ের মত এই মুখখানা কার? আলাপের পর আবার বলেছিলেন, আজ থেকে তুই আমার মা। আমার দরোজা তোর জন্য খোলা।
করাচী আর ক্যামব্রিজে পড়াশুনা করা, উপমহাদেশের প্রথম ক্যামব্রিজ স্কলার, ক্যামব্রিজের ‘ট্রাইপস’ বা ট্রিপল অনার্স সুরাইয়া শিক্ষক হিসেবে তার প্রজ্ঞা ও সমৃদ্ধ জ্ঞান নিয়ে দেশে ফিরে আসতে চান- স্বপ্ন তার দিগন্তপ্লাবী-
লং ডিসট্যান্স রানার আমি
সদা সর্বদা ফ্রন্টিয়ার পেরিয়ে যাই
যত বেড়াজাল আচার বিচার নিষেধ শাসন
দমন ও ত্রাস – পেরিয়ে যাই। অতিক্রম করে যাই ঘৃণা।
হৃদয়ে ও মেধায় জ্বালাই দীপশিখা
হাতে নিয়ে সে মশাল তীর বেগে ছুটে যাই।
ঐতিহাসিক কলোনিয়াল ফ্রন্টিয়ার অতিক্রম করে যেতে চাই।
আমারও ক্লান্তি আছে, নিদ্রা আছে।
আমারও সপ্রেম আশা আছে।
আমি যাবো সুদর্শনা অপরূপা মাতৃভূমিতে।
লং ডিসট্যান্স রানার আমি, আমি সেই দেশে যাবো।
(লং ডিসট্যান্স রানার, সুরাইয়া খানম)
৪
আবুল হাসান দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন, সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসার জন্যে তাকে পাঠানো হয়েছিল বার্লিনে। একজন কবির চিকিৎসার জন্যে সরকারি তৎপরতা ও সহায়তার ঘটনা বাংলাদেশে সম্ভবত সেই প্রথম। ফিরে এসে লিখলেন সুরাইয়া খানমকে।
‘তোমাকে ভালোবাসি তাই ভালোবাসার কবিতা লিখিনি।
আমার ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো কবিতা সফল হয়নি,
আমার এক ফোঁটা হাহাকার থেকে এক লক্ষ কোটি
ভালোবাসার কবিতার জন্ম হয়েছে।
আমার একাকীত্বের এক শতাংশ হাতে নিয়ে
তুমি আমার ভালোবাসার মুকুট পরেছো মাথায়!
আমাকে শোষণের নামে তৈরি করেছো আত্মরক্ষার মৃন্ময়ী যৌবন।
বলো বলো হে ম্লান মেয়ে, এতো স্পর্ধা কেন তোমার?
ভালোবাসার ঔরসে আমার জন্ম! অহংকার আমার জননী!
তুমি আমার কাছে নতজানু হও, তুমি ছাড়া আমি
আর কোনো ভূগোল জানি না,
আর কোনো ইতিহাস কোথাও পড়িনি!
আমার একা থাকার পাশে তোমার একাকার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!
হে মেয়ে ম্লান মেয়ে তুমি তোমার হাহাকার নিয়ে দাঁড়াও!
আমার অপার করুণার মধ্যে তোমারও বিস্তৃতি!
তুমি কোন দুঃসাহসে তবে
আমার স্বীকৃতি চাও, হে ম্লান মেয়ে আমার স্বীকৃতি চাও কেন?
তোমার মূর্খতা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধে, পৃথিবীটা পুড়ে যাবে
হেলেনের গ্রীস হবে পুনর্বার আমার কবিতা!
এই ভয়ে প্রতিশোধস্পৃহায়
আজো আমি ভালোবাসার কবিতা লিখিনি
কোনোদিন ভালোবাসার কবিতা লিখিনি।
হে মেয়ে হে ম্লান মেয়ে তোমাকে ভালোবাসি তাই
ভালোবাসার কবিতা আমি কোনোদিন কখনো লিখবো না!’
১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা পৌঁছে আবুল হাসান তার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হাসানের সাময়িক সুস্থতা দেখে তার বন্ধুরা কিছুটা আশ্বস্ত হন। এ অবস্থায় আবুল হাসান চাকরির চেষ্টা করতে থাকেন। অনেকেই তাকে আশ্বাস দেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই তা রক্ষা করেননি। হাসানের অসুস্থতার কথা বিবেচনা করেই কেউ তাকে চাকুরি দেননি, কেননা, তাহলে পরিশ্রমজনিত ক্লান্তিতে তার অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পাবে- এই ছিল তাদের ধারণা। এ সময় চাকুরির সন্ধানে তিনি একবার বরিশাল শহরেও যান, কিন্তু ওখানেও কোনো সুবিধা হয়নি। একদিকে অসুস্থতা, অন্যদিকে বেকার জীবন। মাথার ওপর ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ যোগানোর দায়িত্ব, সব কিছু মিলিয়ে আবুল হাসান তখন এক অস্থির জীবন যাপন করেছেন।
বার্লিন থেকে ফিরে আসার পর হাসান অল্প কিছুদিন ভালো ছিলেন, তারপর তাকে আবার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। হাসপাতালে তিনি ভর্তি হন ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর। হাসপাতালের বেডে শুয়ে বুকের অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। চিকিৎসকরা কবিকে বাঁচানোর আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন কিন্তু সুরাইয়া খানম ছাড়েননি। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বরে সবাইকে ছেড়ে কবি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। দুর্দান্ত এক আত্মসংহারী জীবন ছিল তার, মাত্র ২৮ বছরের।
আবুল হাসানকে নিঃসঙ্গতার কবি বলা কতটুক সত্য হবে জানি না। তবু এই ভীষণ ছোট্ট একটা জীবনে দারুণ কিছু কষ্ট চেপে রেখেছিলেন হাসান৷ চাপা স্বভাবের কবি হাসান লিখেছিলেন,
যেখানেই যাই আমি সেখানেই রাত!
স্টেডিয়ামে খোলা আকাশের নিচে রেস্তোরাঁয়
অসীমা যেখানে তার অত নীল চোখের ভিতর
ধরেছে নিটোল দিন নিটোল দুপুর
সেখানে গেলেও তবু আমার কেবলই রাত
আমার কেবলই শুধু রাত হয়ে যায়!
৫
কবির প্রেম সুরাইয়া খানমের হৃদয়ে কতখানি জায়গা করে নিয়েছিল, তা জানা যায়নি। তবে জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সুরাইয়া তার গভীর মমতার হাত কবি আবুল হাসানের উপর থেকে সরাননি। হাসানের অকাল মৃত্যুর পর সুরাইয়া লিখেছিলেন, ‘হাসান ছিল এক আহত ক্ষুধার্ত সিংহ, আমি ছাড়া আর ওকে কে বুঝত?’ কবির শেষ দিনগুলোতে সুরাইয়া খানম অবতীর্ণ হয়েছিলেন মমতাময়ীর ভূমিকায়।
“সকালে ক্লাসে যাওয়ার পথে খবর পাওয়া গেলো, তরুণ কবি আবুল হাসান প্রয়াত। তাঁর কবিতা আমার প্রিয়। প্রিয় কবির মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ক্লাস করতে যাওয়া যায় না। পি জি হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম উদভ্রান্ত সুরাইয়া আপাকে, প্রয়াত কবির বিছানার পাশে দাঁড়ানো। তাঁকে অমন করুণ ও অসহায় আগে কোনোদিন দেখিনি। কিছু কিছু ছবি চিরকালের মতো হৃদয়কন্দরে জেগে থাকে, তাঁরে সেই মুখ আজও ভোলা হয়নি।
কবির বন্ধু-আত্মীয়-ভক্তরা তখন ধীরে ধীরে সমবেত হচ্ছেন পি জি হাসপাতালে কবির অন্তিম শয্যাটিকে ঘিরে। অতো মানুষের সংকুলান সেই ছোট্টো কক্ষে হওয়ার কথা নয়, আমরা কেউ কেউ বাইরে বারান্দায় দাঁড়ানো। সুরাইয়া আপা হঠাৎ বেরিয়ে এলেন। কী ভেবে কে জানে, আমার হাত ধরে বললেন, ‘ওরা হাসানের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। তা কিছুতেই হতে পারে না, হাসানের খুব ইচ্ছে ছিলো তার কবর হবে রেসকোর্সের একপাশে। সে বলে গেছে। আমার কথা কেউ শুনছে না, তুমি একটু বুঝিয়ে বলবে ওদের?’
বুঝতে পারি, অনেকের কাছে প্রত্যাখ্যাত ও উপেক্ষিত হয়ে সবাইকে তিনি একই অনুরোধ করে যাচ্ছেন, হাসানের কবর যেন ঢাকায় হয়। হঠাৎ রাহাত খানকে দেখতে পাই। আমি সুরাইয়া আপাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাই। বলি, ‘রাহাত ভাই কিছু একটা করতে পারবেন হয়তো।’ নিজের অসহায়ত্ব নিয়ে সরে এসেছিলাম সেদিন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া আর কোনোদিন হয়নি। আমি পেরে উঠিনি। সুরাইয়া আপা একটিমাত্র অনুরোধ করেছিলেন, যা রক্ষা করার ক্ষমতা আমার ছিলো না’’।
(আমাদের সুরাইয়া খানম – মুহম্মদ জুবায়ের)
১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ঢাবিতে শিক্ষকতা করে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব অ্যরিজোনাতে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। পিএইচডি শেষ করে অ্যরিজোনার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানেই টুসান শহরে সৈয়দ সালাহউদ্দিনকে বিয়ে করে সেটেলড হন। ২০০৩ সালে তার স্বামী সৈয়দ সালাহউদ্দিন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালেই মারা যান। সুরাইয়া খানম শেষের দিনগুলিতে সম্পূর্ণ একা ছিলেন, কিন্ত সে নিঃসঙ্গ একাকী সময়ও একদিন ফুরিয়ে যায়। ২৫ মে ২০০৬ সালে একমাত্র মেয়ে সৈয়দা সালিলা খানমকে রেখে সুরাইয়া খানম মারা যান। পেছনে থেকে যায় তার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘নাচের শব্দ’ এবং ক্ষণজন্মা কবি আবুল হাসানের সাথে তার প্রেমের মিথ। নাচের শব্দ বইটি ৪ ফর্মার, প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৬ সালের জুনে। দ্বিতীয় মুদ্রণ হয় ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে, চারুলিপি প্রকাশন থেকে। উৎসর্গ করা হয় কবি আবুল হাসানকে। কাব্যগ্রন্থটিতে সংকলিত ৫২টি কবিতা।
‘লজ্জা আমার শরশয্যা,
প্রেম আমার চিতা।
বিরহে পোড়া একাকী রাত এখন আমার মিতা”
(নাচের শব্দ- সুরাইয়া খানম)
কবি আবুল হাসান কি শেষ দিনগুলোতে প্রেমিকার এই নিঃসঙ্গতা অনুমান করতে পেরেছিলেন! হয়তো তা’ ভেবেই তিনি লিখেছিলেন তার অমর কবিতা-
‘ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!’
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১০ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। কথাপ্রকাশ নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ কবিতা- আবুল হাসান
২। নাচের শব্দ- সুরাইয়া খানম
৩। রুম নাম্বার ১৪৬ – শওকত আহসান ফারুক
৪। আমাদের সুরাইয়া খানম – মুহম্মদ জুবায়ের
৫। ইন্টারনেট