
১
‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা
দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।’
(পাখি হয়ে যায় প্রাণ)
নিঃসঙ্গতার বেদনায় নীল হয়ে কবি আবুল হাসান ওপরের লাইনগুলো লিখেছেন। হাজার বছরের বিচ্ছিন্নতা বোধ ও স্পর্শকাতরতা নিয়ে কবির আবির্ভাব ষাটের দশকে। সেকালের স্বভাব কবিদের মতো তিনিও অবিশ্বাস্য দ্রুততায় একটি তরতাজা কবিতা লিখে দেয়ার মতো বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। আবুল হাসান স্বদেশ, নিঃসঙ্গ মানুষ ও মানুষের বেদনা ও সংবেদনশীল সত্তার সাথে একাত্ম হয়েছেন। এক অসীম নিঃসঙ্গতার আবর্তনে যিনি ঘুরে ফিরেছেন সর্বক্ষণ। নিজের নিঃসঙ্গতাকে আত্মবিবরণী আকারে কবিতায় এনেছেন। কবি লিখেছেন-
অতটুকু চায় নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!
অতটুকু চায় নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভিড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!
একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!
কবি এভাবেই বেদনাবোধ, প্রেম বিরহ, রাজনৈতিক দোলাচাল, অন্তর্গত নদীর রক্তক্ষরণ, জীবনের সব ধরণের বির্বণতা তুলে এনেছেন নিপুণ দক্ষতায়। তাই হয়তো কবি আহসান হাবীব লিখেছিলেন, ‘তার সমবয়সী কবিকর্মীদের মধ্যে যে দু’তিন জনের কবিতা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে আবুল হাসান ছিল তাদেরই একজন। আবুল হাসানের কোন কোন কবিতা পড়ে আমি অভিভূত হয়েছি। তার উপমা এবং চিত্রকল্প নির্মাণের উৎস ছিল বাংলাদেশেরই শরীর এবং হৃদয়। বুদ্ধি এবং হৃদয়ের সংমিশ্রণে তার কবিতা একই সঙ্গে তীক্ষ্ণ এবং হৃদয়স্পর্শী। তার কবিতায় জ্বালা ছিল কিন্তু বিদ্রূপ ছিল না। তিক্ততা তার কবিচিত্তকে স্পর্শ করেনি। নিসর্গ এবং মানুষের সঙ্গে প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও আবুল হাসানের একাত্মতা ছিল গভীর’। তিনি আবেগপ্রবণ এবং মুডি ছিলেন কিন্তু তার মনের ঔদার্য ছিল অনেক বড়। মৃত্যুর কথা জেনেও তিনি কবিতা লিখেছেন। তিনি ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে বড় কবি, আর এ কথাটা তার সময়ের কবিদেরই অকপট উচ্চারণ। কবি হেলাল হাফিজ এক আড্ডায় বলেছেন, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে যদি কাব্যমূল্য দিয়েই শুধু কবিকে বিচার করা হয়, তবে এই বাংলার আর কোন কবির স্থান না হলেও দুজনের হবে। সেই দুজন হলেন আল মাহমুদ এবং অকাল প্রয়াত আবুল হাসান। কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের কবিগোষ্ঠীর যাদের কবিতা আমৃত্যু বারবার পড়বো, আবুল হাসান নিঃসন্দেহে তাদের অন্যতম’। তিনি মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কবি। তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে বয়ে গেছে কবিতা। তার এলোমেলো জীবনের ছাপ পড়েছে তার কবিতাতেও, আর এটাই একইসঙ্গে তার কবিতার দূর্বলতা এবং শক্তি। অনেক কবি তাদের প্রস্তুতি পর্বের কবিতা পুড়িয়ে ফেলার মত বিধ্বংসী কাজে লিপ্ত হন। আবুল হাসান সেক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু শেহাবউদ্দিন আহমেদকে তার কবিতা লেখা ডায়েরিটা দিয়ে ছাপতে বারণ করেছিলেন। তাই তার মৃত্যুর আগে ডায়েরিতে লেখা কবিতাগুলো ছাপা হয়নি, তার মৃত্যুর অনেক বছর পরে নব্বই এর দশকের শেষ দিকে কবিতাগুলো ছাপা হয়। ডায়েরিতে ‘অপর পিঠ’ কবিতায় তিনি যেমন লিখেছেন,
তবুও নারীর মুখ আমাদের রক্তে মিশে আছে
মিশে আছে জানকীর অঙ্গধর্মী বিশ্লেষণী রূপ
উপমারা ফুল হয়ে আমাদের মনের অঙ্গনে
নৃত্য করে অন্য ধাচে, অন্য এক কামনা কেলিতে।
রাত্রির ঠোঁট ছুঁয়ে বিবিক্ত সে দেহের অঙ্গারে
আমরাও টের পাই শারীরিক স্রোতের উষ্ণতা
ঘ্রাণ পাই কোকিলের, বসন্তে যার আকুলতা
দূরের সাগর তীরে, ঢেউ কাঁদে বালির বিবরে।
২
আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থে কয়েকটি কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব লক্ষ্য করা গেলেও পরবর্তীতে তিনি তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। যেমন ‘নচিকেতা’ কবিতা-
এ বাংলায় বারবার হাঁসের নরম পায়ে খঞ্জনার লোহার ক্ষরায়
বন্যার খুরের ধারে কেটে ফেলা মৃত্তিকার মলিন কাগজ
মাঝে মাঝে গলিত শুয়োরগন্ধ, ইঁদুরের বালখিল্য ভাড়াটে উৎপাত
অসুস্থতা, অসুস্থতা আর ক্ষত সারাদেশ জুড়ে হাহাকার
কবিতায় তিনি জীবনানন্দের লঘু সুর, শব্দের উর্বরতা, প্রকাশের অনুপম ভঙ্গিকে নিজের লেখায় অন্যমাত্রায় প্রকাশ করেছেন। কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, তার শৈশব কেটেছে বরিশালের মনোমুগ্ধকর নৈসর্গিক পরিবেশে। সেখানকার গাছগাছালি, নদীনালাকে তিনি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন তার কবিতায়, যেমন করেছেন ঢাকা বাসের অভিজ্ঞতাকে। গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের মিলিত অভিজ্ঞতা তার কবিতাকে বর্ণাঢ্য, সমৃদ্ধ করেছে। তার কবিতা সহজেই পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। গোড়ার দিকে তার কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এবং আরো কোন কোন কবির ছায়া লক্ষ্য করা গেছে। অনুজ কবির উপর অগ্রজ কবির প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ কোন কবিই ভুঁইফোড় কিছু নন। একটি ধারাবাহিকতার অন্তর্গত তিনি, অতীতের কাব্যকৃতি একজন নতুন কবিকে তার শিল্পসৃষ্টির পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নতুন কবি তার নিজস্ব এলাকা সৃষ্টি করেন পূর্বসূরীদের অর্জনকে কাজে লাগিয়ে, তাদের কাব্যকলার কাঠামোয় বন্দী হয়ে নয়। নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে হয় তাকে। আবুল হাসান তার নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পান প্রাথমিক অনুশীলনের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই। দুঃখবোধের পাশাপাশি তার কবিতায় গভীর ছায়া ফেলেছে মৃত্যুচেতনা। জীবনের সব দুঃখ–যন্ত্রণা-রক্তক্ষরণ আর নিঃসঙ্গতাকে ধারণ করে পাঠকদের তিনি দিতে চেয়েছেন অমৃতের শিল্প-স্বাদ। তিনি লিখেছেন-
ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!
৩
মাত্র এক দশক কাব্য সাধনা করে আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি তার অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আপন আলোয়। কবিতার প্রতি পুরোপুরি সমর্পিত ছিলেন তিনি। নিজের কবিতা সম্পর্কে সবসময়ই সন্দিহান থাকতেন তিনি, কখনো বলেননি ভাল হয়েছে। হয়তো তাই তিনি নিরন্তর লিখে যেতে পেরেছেন। তিনি বলে গেছেন সভ্যতার কঠিন সত্যকে সাবলীল ভঙ্গিতে।
‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা,
আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে
আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,
সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন
কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?
তিনি জীবনের প্রাঙ্গন থেকে চয়ন করা উপাদান দিয়ে গড়ে তুলেছেন চিত্রকল্প। যেমন-
একবার ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থেমেছিল
আমাদের ইস্টিশনে সারাদিন জল ডাকাতের মতো
উৎপাত শুরু কোরে দিয়েছিল তারা;
ছোট-খাটো রাজনীতিকের মতো পাড়ায়-পাড়ায়
জুড়ে দিয়েছিল অথই শ্লোগান!
৪
১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আবুল হাসান। তার প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া, পরবর্তীতে তিনি আবুল হাসান নামে কবি খ্যাতি অর্জন করেন। তার ডাকনাম ছিল ‘টুকু’। বাবার চাকরির সুবাদে তিনি ফরিদপুর থেকে ঢাকা এসে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখানে পড়ালেখার সময় থেকেই নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করা। তিনি ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন সম্পন্ন করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই হাসান সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি ঢাকার তরুণ কবিদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে আসেন।
১৯৬৯ সালে তিনি দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ এ সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর ১৯৭২ সালে ‘গণবাংলা’ পত্রিকায় যোগ দেন এবং সাহিত্য বিভাগে শহীদ কাদরীর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি যোগ দেন আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক ‘জনপদ’ পত্রিকায়, সেখানে ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাহিত্য সম্পাদনা করেন। এই দেড় বছরে ‘জনপদ’ পত্রিকায় তার অনেক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এই পত্রিকায় তিনি ‘আপন ছায়া’ এবং ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ‘খোলাশব্দে কেনাকাটা’ শীর্ষক কলামটির প্রথম চার সংখ্যা তিনি ‘ভ্রামণিক’ ছদ্মনামে লিখেছেন। ১৯৭৪ সালে সহ-সম্পাদক হিসেবে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকায় যোগ দেন। সেখানে তিনি ‘আড়ালে অন্তরালে’ এবং ‘বৈরী বর্তমান’ শীর্ষক দুটি উপ-সম্পাদকীয় কলাম লিখতেন। ১৯৭০ সালটি আবুল হাসানের জীবনে বিশেষ তাৎপর্যবহ। কারণ ‘শিকারী লোকটা’ শিরোনামে একটি কবিতার জন্য এ সময় তিনি সমগ্র এশিয়াভিত্তিক এক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করে বিশেষ পুরষ্কার লাভ করেন। কবিতাটা এরকম-
পিতৃত্ব লাভের আগে প্রতিটি পুরুষ একবার নিজেরই শিশুর রক্তে হেসে ওঠে
আর পিতৃত্ব লাভের আগে প্রতিটি পুরুষ একবার নিজের ছায়ায় বসে কাঁদে,
কিন্তু ঘুম, হাস্যেলাস্যে মৃত্যুরে ডরি না, মুহূর্তকে চাঁটি মারি তবে,
যখন একটি মৃত সুন্দরীর গোর দেয়া হলো হায় ভগবান, যখন সুন্দরী মৃত
মাতৃত্ব লাভের আগে------ফ্লাস্কে দুধ-------রেকসিনের থলে
ছিপ হাতে কোনোদিন আর সে এলো না ফিরে পার্কের পুকুরে----।।
কবিতাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সমগ্র পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের কবিতা-সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৭০) শীর্ষক ওই গ্রন্থে তদানীন্তন পাকিস্তানের একমাত্র প্রতিনিধি আবুল হাসানের কবিতা স্থান পায়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হলে তিনি কবি খ্যাতি পান। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’ প্রকাশ হয় ১৯৭৪ সালে। এরপর হাসপাতালের বেডে শুয়ে তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’র পাণ্ডুলিপি তৈরি থেকে প্রুফ দেখা সবটাই করেছেন তিনি। কাব্যগ্রন্থটি ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয়। কবির মৃত্যুর পর ১৯৮৫ সালে নওরোজ সাহিত্য সংসদ প্রকাশ করে ‘আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা’। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছর বয়সে আবুল হাসান মারা যান। মৃত্যুর পর তিনি ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। সাহিত্য জগতে আবুল হাসানের মাত্র দশ বছরের পদচারণা। এই দশ বছরে দুহাত ভরে তিনি সোনা ফলেছেন। কবিতায় ছোট গল্পে তিনি যেন কেবল নিঃসঙ্গতা বিলি করেছেন। কিন্তু সে নিঃসঙ্গতা মানব মনকে আড়াল করে নয়, মনের অতল তলের নির্জন স্বাক্ষর রাখতেন সেখানে নির্দ্বিধায়।
সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে আর্দ্র,
মায়াবী করুণ
এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?
এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১১ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। কথা প্রকাশ নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ কবিতা। আবুল হাসান
২। আবুল হাসান- বিশ্বজিৎ ঘোষ
৩। রচনা সমগ্র- আবুল হাসান