
১
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তন-পরবর্তী এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এক যুগান্তকারী ও বাস্তবমুখী রূপান্তরের সূচনা করে। তৎকালীন সময়ে অভ্যন্তরীণ সামরিক অস্থিরতা, একের পর এক ক্যু-এর চেষ্টা এবং বিশেষ করে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে উদ্ভূত সামরিক সংঘাত বাংলাদেশকে এক কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। জিয়াউর রহমান দূরদর্শিতার সাথে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কেবল 'ন্যাশনালিজম' কিংবা 'জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন'-এর মতো আদর্শিক স্লোগান দিয়ে একটি সদ্য স্বাধীন ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে তিনি আবেগ বর্জন করে ‘শক্তির ভারসাম্য’ (Balance of Power) নীতির ওপর ভিত্তি করে এক অনন্য 'রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসি' বা বাস্তববাদী কূটনীতির জন্ম দেন।
এক বাস্তবমুখী দর্শনের আলোকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পুনর্নির্ধারণ করে একদিকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সাথে দ্রুত শক্তিশালী কৌশলগত অক্ষ গড়ে তোলেন, যা ভারতকে একটি আন্তর্জাতিক ‘কাউন্টার-ব্যালেন্স’-এর মুখোমুখি করে। সমরাস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভর না করে ‘বৈচিত্র্যকরণ নীতি’ গ্রহণ করে তিনি চীনের টাইপ-৫৯ ট্যাংক ও এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেল-২১২ হেলিকপ্টার সংগ্রহের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে সামরিক ব্ল্যাকমেইল থেকে চিরতরে মুক্ত করেন। একই সাথে সংবিধানে 'ইসলামী সংহতি' যুক্ত করে সৌদি আরব, লিবিয়া ও ইরাকের মতো তেল-সমৃদ্ধ মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের সর্বোচ্চকরণ, ইরান-ইরাক যুদ্ধে ওআইসি শান্তি মিশনে ঐতিহাসিক মধ্যস্থতা এবং ভারতকে বহুপাক্ষিক আইনি কাঠামোয় বাঁধতে ‘সার্ক’-এর দূরদর্শী রূপরেখা প্রণয়ন তাঁর রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির সমাদৃত বহিঃপ্রকাশ। অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষায় সামরিক বিন্যাস, আনসার ও ভিডিপি-কে বিশ্বের বৃহত্তম প্যারামিলিটারি ফোর্সে রূপান্তর বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান কৌশলগত গ্যারান্টি হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
২
দক্ষিণ তালপট্টি সংকট: বাস্তববাদী নিরাপত্তা কৌশলের অগ্নিপরীক্ষা।
১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর জেগে ওঠা দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে ১৯৮১ সালে ভারতের সামরিক আগ্রাসন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে এক বড় ঝুঁকিতে ফেলেছিল। ভারতের বিশাল সামরিক শক্তির বিপরীতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিন্দুমাত্র পিছু না হটে তাৎক্ষণিকভাবে নৌবাহিনীর গানবোট পাঠিয়ে এক অনমনীয় ও সাহসী প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক সীমানা রক্ষায় তিনি কেবল ফাঁকা কূটনৈতিক আশ্বাসে মগ্ন না থেকে কঠোর সামরিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছিলেন। মূলত বঙ্গোপসাগরের এই অগ্নিপরীক্ষাই জিয়াউর রহমানকে চূড়ান্ত বার্তা দিয়েছিল যে, ভারতের দ্বিপাক্ষিক চাপ মোকাবিলা করতে হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তিশালী শক্তির ভারসাম্য তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।
ক। ভারতীয় নৌবাহিনীর আগ্রাসন।
১৯৮১ সালের মে মাসে ভারত আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে বিতর্কিত দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে সশস্ত্র বিএসএফ জোয়ান পাঠায় এবং সেখানে নিজেদের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। Marcus Franda-র "Bangladesh: The First Decade" (1982) গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, এই ঘটনার সাথে সাথে ভারতীয় নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ 'আইএনএস সান্ধ্যক' দ্বীপটির চারপাশের জলসীমায় অবস্থান নিয়ে এক নজিরবিহীন সামরিক আগ্রাসন চালায়। তৎকালীন সমসাময়িক জাতীয় দৈনিক (দৈনিক ইত্তেফাক, মে-জুন ১৯৮১) থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের জলসীমায় ভারতের এই আকস্মিক শক্তির প্রদর্শন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। সামগ্রিকভাবে, আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের এই ঘটনাটি সেসময়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
খ। জিয়াউর রহমানের অনমনীয় অবস্থান।
দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে ভারতের একতরফা সামরিক শক্তির প্রদর্শনের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বঙ্গোপসাগরের বিতর্কিত জলসীমায় নৌবাহিনীর গানবোট পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতের মতো বিশাল সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের এই অনমনীয় অবস্থান ছিল একটি অত্যন্ত সাহসী এবং বাস্তবসম্মত প্রতিরোধ। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর "এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক" গ্রন্থে এই সামরিক প্রতিরোধের দৃঢ়তার কথা উল্লেখ রয়েছে। মূলত, ফাঁকা আশ্বাসে মগ্ন না থেকে শক্তির বিপরীতে শক্তি প্রদর্শনের এই কৌশলটি সেসময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সার্বভৌম অবস্থানকে অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছিল।
এই ঘটনাই জিয়াউর রহমানকে চূড়ান্ত বার্তা দেয় যে, ভারতের দ্বিপাক্ষিক চাপের মুখে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শক্তিশালী 'কাউন্টার-ব্যালেন্স' বা শক্তির ভারসাম্য প্রয়োজন।
৩
ভূ-রাজনৈতিক পুনর্নির্ধারণ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সাথে কৌশলগত অক্ষ।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্থায়ী শত্রু বা মিত্র বলতে কিছু নেই, কেবল রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থই স্থায়ী— রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির এই মূলনীতিকে ধারণ করেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ করেছিলেন। ভারতের একাধিপত্য এবং সোভিয়েত প্রভাব বলয় থেকে দেশকে মুক্ত করতে তিনি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সাথে দ্রুত কৌশলগত অক্ষ গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে নিরাপত্তা সংলাপ এবং ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে চীনের সাথে সামরিক মৈত্রী স্থাপনের মাধ্যমে তিনি দেশের সার্বভৌমত্বের এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ঢাল তৈরি করেন। মূলত পরাশক্তিদের সাথে এই ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক স্থাপন ছিল বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর এক দূরদর্শী ও বাস্তবমুখী কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
ক। কার্টার প্রশাসনের সাথে নিরাপত্তা সংলাপ।
১৯৮০ সালের আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এক রাষ্ট্রীয় সফরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গমন করেন এবং তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাথে হোয়াইট হাউসে এক ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন। এই সংলাপে জিয়াউর রহমান কেবল প্রচলিত অর্থনৈতিক সাহায্যই চাননি, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত ও ভারতীয় একচেটিয়া প্রভাবের বিপরীতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। মার্কিন প্রশাসনের অবমুক্ত করা ঐতিহাসিক দলিল (FRUS - Foreign Relations of the United States, 1977–1981) অনুযায়ী, কার্টার প্রশাসনও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত চতুরতার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করে ওয়াশিংটনের সাথে ঢাকার একটি নতুন কৌশলগত অক্ষ তৈরি করেছিলেন। রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির এই অনন্য প্রয়োগটি সেসময়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্য তৈরিতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল।
খ। চীনের সাথে সামরিক ও কৌশলগত মৈত্রী।
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চীনের সাথে কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে শুরু হওয়া এই নিবিড় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সম্ভাব্য সামরিক ও আঞ্চলিক চাপ মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী "কাউন্টার-ব্যালেন্স" বা সামরিক ব্যাকআপ তৈরি করা। চীনের এই আন্তরিক সহযোগিতার ফলেই বাংলাদেশের তিন বাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজানো এবং আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। চীনা বিমান বাহিনীর এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং সেনাবাহিনীর জন্য টাইপ-৫৯ ট্যাংকের মতো ভারী সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের ভূ-রাজনৈতিক গবেষণা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই বিশাল সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের জন্য কেবল সমরাস্ত্রের জোগান ছিল না, বরং তা ছিল বঙ্গোপসাগর ও সীমান্ত এলাকায় ভারতের যেকোনো একতরফা কৌশলগত চাপ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক নিরাপত্তা ঢাল। মূলত, চীনের সাথে এই সুদৃঢ় মৈত্রী স্থাপনের মাধ্যমেই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন, যা দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
৪
ওআইসি ও মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্কের সর্বোচ্চকরণ।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সংবিধানে "ইসলামী সংহতি"র নীতি যুক্ত করে মুসলিম বিশ্বকে দেশের অন্যতম প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলেন। এটি কেবল অভ্যন্তরীণ সমীকরণ ছিল না, বরং এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সমৃদ্ধ দেশগুলোর সমর্থন আদায় এবং ভারতের ওপর একটি পরোক্ষ আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা। এই দূরদর্শী নীতির আলোকেই তিনি একদিকে সৌদি আরবের বাদশাহ খালিদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে বিপুল অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে মুয়াম্মা গাদ্দাফি, সাদ্দাম হোসেন ও ইয়াসির আরাফাতের মতো প্রভাবশালী নেতাদের সাথে ঘনিষ্ঠ জোট গড়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি স্থাপন করেন।
ক। সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের সমর্থন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ জোর দেন। তিনি সৌদি আরবের তৎকালীন শাসক বাদশাহ খালিদের সাথে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন, যার সুবাদে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে সৌদি আরব থেকে বিপুল পরিমাণ অনুদান ও সহজ শর্তে ঋণসহায়তা আসতে শুরু করে। এ জে এম শামসুদ্দিন আহমেদের "Foreign Policy of Bangladesh: Challenges and Opportunities" গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়েই সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতে কোটি কোটি ডলারের আর্থিক তহবিল অনুমোদন করে। এর পাশাপাশি, ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের সফল রিয়াদ সফরের পর সৌদি আরবে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির এক অভূতপূর্ব দুয়ার উন্মোচিত হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। সৌদি আরবের এই বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন সেসময় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মুসলিম ব্লকে বাংলাদেশের অবস্থানকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।
খ। বৈপ্লবিক ও প্রভাবশালী নেতাদের সাথে জোট।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর বাস্তববাদী কূটনীতির অংশ হিসেবে সমাজতান্ত্রিক বা উগ্র-জাতীয়তাবাদী আদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও নিজের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের মাধ্যমে লিবিয়ার মুয়াম্মা গাদ্দাফি, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ওআইসি সচিবালয়ের ঐতিহাসিক রেকর্ড এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সংক্রান্ত তথ্যমতে, এই রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে ইয়াসির আরাফাত একাধিকবার ঢাকা সফর করেন এবং লিবিয়া ও ইরাক বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো সমর্থন দেয়। এই অনন্য রাজনৈতিক মৈত্রীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুফল ছিল মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের উন্মোচন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে জিয়াউর রহমান সরকারের বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতায় লিবিয়া ও ইরাকে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি সরকারি ও বেসরকারিভাবে নির্মাণ ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং-এর ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান এবং সমসাময়িক অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, এই দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির মূল শক্ত ভিত্তিটি স্থাপিত হয়েছিল। এটি কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী হতেই সাহায্য করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের বৈপ্লবিক নেতাদের সাথে ঢাকার সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
৫
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা (ইরান-ইরাক যুদ্ধ) ।
রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসিতে নিজের দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান কৌশল হলো বৈশ্বিক সংকটে নিজেকে একজন অপরিহার্য ও গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন মধ্যপ্রাচ্যের দুই পরাশক্তি ইরান ও ইরাকের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়, তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির এক অভূতপূর্ব সুযোগ লুফে নেন। ওআইসি এই বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধ এবং দুই মুসলিম দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্দেশ্যে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে মক্কায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের উগ্রপন্থী ও প্রভাবশালী "পিস কমিটি" বা উম্মাহ শান্তি মিশন গঠন করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত কূটনীতি ও গ্রহণযোগ্যতার কারণে এই কমিটির অন্যতম শীর্ষ ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে মনোনীত হন। ড. মোস্তফা কামালের এক গবেষণামূলক প্রবন্ধে (The Dhaka University Studies, Vol. 38) উল্লেখ আছে যে, একটি সদ্য স্বাধীন ও অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ওআইসি-র এই শীর্ষ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ছিল মূলত জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী কূটনীতির এক বিশাল স্বীকৃতি।
উম্মাহ পিস কমিটির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সক্রিয় শাটল ডিপ্লোম্যাসিতে অংশ নেন এবং অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজে সরাসরি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাগদাদ ও তেহরান সফর করেন। ১৯৮১ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে তিনি দফায় দফায় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং ইরানের বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ ও জটিল বৈঠকে বসেন। ওআইসি সচিবালয়ের ঐতিহাসিক বিবরণী ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আর্কাইভাল নথিপত্র (UN Security Council Records, 1981) অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান দুই দেশের সামনে একটি বাস্তবসম্মত যুদ্ধবিরতির রূপরেখা, সেনা প্রত্যাহার এবং বিরোধপূর্ণ শাত-ইল-আরব জলসীমা নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। তেহরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির অনমনীয় মনোভাব এবং বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে এই যুদ্ধটি তাৎক্ষণিকভাবে থামানো না গেলেও, জিয়াউর রহমানের নিরপেক্ষ ও আন্তরিক মধ্যস্থতার প্রস্তাবটি উভয় পক্ষই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিল।
যদিও ইরান-ইরাক যুদ্ধটি পরবর্তীতে প্রায় এক দশক ধরে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু এই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ঐতিহাসিক চেষ্টা বিশ্ব পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ওজনকে এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের তৎকালীন কার্যবিবরণী (UN General Assembly Proceedings, 1981) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই মিশনের পর থেকে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সাহায্য-নির্ভর অনুন্নত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসে এবং বৈশ্বিক শান্তির এক অন্যতম সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। এ জে এম শামসুদ্দিন আহমেদের "Foreign Policy of Bangladesh: Challenges and Opportunities" গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, এই শান্তি মিশনের সফল রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছিল। এরফলে বাংলাদেশ ১৯৭৯-১৯৮০ মেয়াদের (১ জানুয়ারি ১৯৭৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮০) জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (UN Security Council) প্রথমবারের মতো অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করেছিল। সে সময় জাপানের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে সাধারণ পরিষদের ভোটে পরাজিত করে বাংলাদেশ এই গৌরবময় অর্জন সুনিশ্চিত করে, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কূটনীতির একটি ঐতিহাসিক এবং অন্যতম সফল মাইলফলক।
৬
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন, জনসংখ্যা ও সামরিক সক্ষমতার বিপরীতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো সবসময়ই এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপে থাকত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর বাস্তববাদী দূরদর্শিতা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে ভারতের একক আধিপত্যের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন। এই অসম শক্তির ভারসাম্য মোকাবিলা করার জন্য ভারতকে একটি বহুদেশীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা অপরিহার্য ছিল। শ্রীলঙ্কান গবেষক ও ভূ-রাজনীতিবিদ ইরেগামাগে অনুরাধা-র "The Genesis of SAARC: A Historical Perspective" শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের মূল কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল একটি বহুপাক্ষিক আঞ্চলিক মঞ্চ তৈরি করা, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সম্মিলিত দর-কষাকষির মাধ্যমে ভারতের ওপর একটি পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আড়ালে তিনি মূলত ফারাক্কা বাঁধের পানি বণ্টন কিংবা সীমান্ত বিরোধের মতো জটিল দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও দাবি আদায়ের পথকে আরও সুগম করতে চেয়েছিলেন।
একটি বাস্তবসম্মত ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকেই ১৯৮০ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ছয়টি দেশের (ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপ) রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়ে ঐতিহাসিক চিঠি দেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক আর্কাইভ এবং সার্ক সচিবালয়ের অফিশিয়াল নথিপত্র (SAARC Secretariat Records) থেকে জানা যায়, এই চিঠির পর জিয়াউর রহমানের বিশেষ দূতগণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজধানীগুলোতে শাটল ডিপ্লোম্যাসি পরিচালনা করেন এবং একটি 'ওয়ার্কিং পেপার' পেশ করেন। যদিও ১৯৮১ সালের মে মাসে তাঁর মর্মান্তিক শাহাদতের কারণে তিনি নিজের জীবদ্দশায় এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর রোপণ করা কূটনৈতিক বীজ থেকেই পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ইতিহাসবিদদের মতে, সার্ক গঠন ছিল পরাশক্তিদের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের এক অনন্য, দীর্ঘমেয়াদি এবং অত্যন্ত চতুর কূটনৈতিক কৌশল।
৭
অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে নিরাপত্তা জোরদার ও সামরিক আধুনিকায়ন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির পাশাপাশি দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাস্তববাদের মূল নীতি 'আত্মরক্ষা'-কে ভিত্তি করে অভ্যন্তরীণ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ জোর দেন। ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিনি সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন ব্যাটালিয়ন ও চট্টগ্রামের ২৪তম পদাতিক ডিভিশনসহ একাধিক ডিভিশন তৈরি করেন। একই সাথে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমান বিজিবি)-কে পুনর্গঠন এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা দল ও আনসার বাহিনীকে তৃণমূল স্তরে বিস্তৃত করে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেন। এছাড়া, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীর সাথে ঢাকা মেডিকেল ও পিজি হাসপাতালের মতো বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে যৌথ মহড়ার আধুনিক ব্যবস্থা তিনিই প্রথম প্রবর্তন করেছিলেন।
ক। কৌশলগত সামরিক বিন্যাস।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির 'রিয়ালিজম' বা বাস্তববাদের মূল কথাই হলো স্বনির্ভরতা ও আত্মরক্ষা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী ছাড়া কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা সম্ভব নয়। ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ে দেশের সীমান্ত এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি আধুনিক ও কার্যকর প্রতিরক্ষা শক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন সংবেদনশীল ও কৌশলগত এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি সেনাবাহিনীতে নতুন নতুন ব্যাটালিয়ন এবং বেশ কয়েকটি নতুন পদাতিক ডিভিশন তৈরি করেন। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর "এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক" গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, এই সামরিক বিন্যাসের অংশ হিসেবেই দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের কৌশলগত সুরক্ষার জন্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে '২৪তম পদাতিক ডিভিশন' প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভারতের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত রেখা এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলের দিকে নজর রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যারিসন স্থাপন ও সেনা মোতায়েনের এই দূরদর্শী বিন্যাস বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশলে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
একটি আধুনিক ও স্বনির্ভর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সমরাস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে ‘বৈচিত্র্যকরণ নীতি’ গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের পর দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সোভিয়েত ও ভারতীয় বলয়ে থাকলেও, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পশ্চিম ইউরোপ থেকে সমরাস্ত্র সংগ্রহ শুরু করেন। চীনের সাথে কৌশলগত মৈত্রী গড়ে তিনি বিমান বাহিনীর জন্য এফ-৬ যুদ্ধবিমান এবং সেনাবাহিনীর জন্য টাইপ-৫৯ ট্যাংকের মতো ভারী সমরাস্ত্রের জোগান নিশ্চিত করেন। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিমান বাহিনীতে বিখ্যাত ‘বেল-২১২’ হেলিকপ্টার অন্তর্ভুক্ত করেন। প্রতিরক্ষা উইং ও ড. ইমতিয়াজ আহমেদের ভূ-রাজনৈতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই বেল হেলিকপ্টারগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে দ্রুত সেনা ও রসদ পরিবহনে এবং উপকূলীয় দুর্যোগে উদ্ধার অভিযানে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে নৌবাহিনীর জন্য ‘বিএনএস ওমর ফারুক’-এর মতো আধুনিক যুদ্ধজাহাজও এই সময়েই সংগ্রহ করা হয়। মূলত বহুমুখী আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সমরাস্ত্র ও এভিয়েশন লজিস্টিকস ক্রয়ের এই চতুর নীতিটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একতরফা সামরিক ব্ল্যাকমেইল থেকে চিরতরে মুক্ত করে একটি শক্তিশালী স্বাধীন ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়, যার সুফল আজ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনেও দৃশ্যমান।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৌশলগত সামরিক বিন্যাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষা করা। আশির দশকের শুরুতে এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা এবং সীমান্ত পেরিয়ে তাদের বিদেশি মদদ পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার জন্য এক বিরাট হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এই সংকট মোকাবিলায় জিয়াউর রহমান অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে সেখানে ব্যাপক হারে সেনা মোতায়েন করেন এবং কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি বা বিদ্রোহ দমন অভিযানের সূচনা করেন। নবগঠিত ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের অধীনে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলকে তিনটি প্রধান সামরিক জোনে (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বিভক্ত করে সীমান্ত পাহারা এবং কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের গবেষণা এবং বিভিন্ন সামরিক ইতিহাস সংকলন অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের এই দৃঢ় সামরিক মোতায়েন এবং একই সাথে সমতলের মানুষকে সেখানে পুনর্বাসনের (Demographic Balancing) নীতি সেসময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছিল। এই অঞ্চলের কঠোর সামরিক প্রতিরক্ষা বিন্যাসই আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানচিত্রের অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রধান গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করছে।
খ। সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে সীমান্ত ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মাঝে এক আমূল পরিবর্তন আনেন। বাস্তববাদী জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ)-কে পুনর্গঠন ও আধুনিকায়ন করেন। যুদ্ধের সময় দেশের মূল সশস্ত্র বাহিনীকে সম্মুখ সমরে সহায়তা করা এবং স্বাভাবিক সময়ে সীমান্ত পাহারার গুরুদায়িত্ব দিয়ে বিজিবি-কে ‘সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স’ বা প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় স্তর হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর "এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক" গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি-র এই কৌশলগত রূপান্তর দেশের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা নীতিকে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছিল। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভিআইপি নিরাপত্তার বিশেষায়িত লজিস্টিকস হিসেবে ১৯৭৬ সালে বিশেষায়িত 'আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন' গঠন করা হয়, যা দেশের অভ্যন্তরীণ কৌশলগত নিরাপত্তা নেটওয়ার্ককে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত অত্যন্ত শক্তিশালী করে তোলে।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশের বিশাল মানবসম্পদকে সুরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে আনসার ব্যাটালিয়ন এবং ১৯৭৭ সালে গ্রাম প্রতিরক্ষা দল গঠন করেন। তাঁর এই দূরদর্শী ভাবনার ফসল হিসেবে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি’ আজ সদস্য সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর বৃহত্তম প্যারামিলিটারি ফোর্স হিসেবে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃত। আনসার ও ভিডিপি সদর দপ্তরের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ কৌশলগত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬১ লক্ষাধিক, যা বিশ্বের যেকোনো একক আধাসামরিক বাহিনীর চেয়ে বহুগুণ বড়। তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষকে শৃঙ্খলা ও বুনিয়াদি সামরিক প্রশিক্ষণের আওতায় এনে দেশের জনশক্তিকে জাতীয় প্রতিরক্ষার স্থায়ী অংশীদার বানানোর এই চতুর রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসি কেবল রাষ্ট্রের সুরক্ষাই নিশ্চিত করেনি, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভাবনায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় সামাল দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনকাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী গোর্কি ঘূর্ণিঝড় এবং পরবর্তী বিভিন্ন দুর্যোগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ১৯৭৭-১৯৭৯ সালের দিকে বাংলাদেশে আধুনিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরির কাজ শুরু হয়। এরই অংশ হিসেবে ১৯৭৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে ‘দুর্যোগ প্রস্তুতি সেল’ (Disaster Preparedness Cell) গঠন করা হয়, যা ছিল বাংলাদেশে কেন্দ্রীয়ভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় এবং দুর্যোগ-পরবর্তী প্রাথমিক উদ্ধারকাজে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মাঝে সমন্বয়হীনতা দূর করতে বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী), তৎকালীন বিডিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীকে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে নিয়োজিত করার একটি সমন্বিত ধারা তৈরি হয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে দুর্গম এলাকায় রসদ পৌঁছানো, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা মেডিকেল ও তৎকালীন পিজি হাসপাতালের চিকিৎসকদের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ও মাঠপর্যায়ে যুক্ত করা এবং ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ এই সময়ে নেওয়া হয়েছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর এই পারস্পরিক সহযোগিতাই পরবর্তীকালে বাংলাদেশে সিভিল-মিলিটারি কো-অপারেশন (CIMIC) এবং একটি সমন্বিত দুর্যোগ সাড়াদান ফ্রেমওয়ার্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারগুলোই আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের যেকোনো বড় জাতীয় বিপর্যয় ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
৮
দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের সীমান্ত সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ ক্যু-তে বিদেশি ইন্ধনের আশঙ্কা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে এক কঠোর বাস্তববাদী ভূ-রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়েছিল। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ভৌগোলিক বা সামরিকভাবে ছোট রাষ্ট্রও যদি ভাবাবেগ বর্জন করে চতুর ও ‘বহুমাত্রিক ভারসাম্য’ (Multi-dimensional Balancing) নীতি প্রয়োগ করতে পারে, তবে পরাশক্তিদের মাঝেই নিজের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব। ওয়াশিংটন, বেইজিং এবং ওআইসি ব্লককে বাংলাদেশের সুরক্ষার রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে দাঁড় করানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে বিজিবি-কে প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় স্তর (Second Line of Defence) করা ছিল তাঁর রিয়ালিস্টিক ডিপ্লোম্যাসির চিরস্থায়ী লিগ্যাসি। শক্তির বিপরীতে অনমনীয় অবস্থান এবং ফাঁকা আশ্বাসে মগ্ন না থেকে ‘আত্মরক্ষা’-র নীতিই ছিল তাঁর নিরাপত্তা দর্শনের মূল ভিত্তি। জিয়াউর রহমানের অনুসৃত এই বাস্তবমুখী কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশল আজ চার দশক পরেও প্রমাণ করে যে, একটি রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় জোটের অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকারই শেষ কথা।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের এই ঐতিহাসিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ধারণা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' (Bangladesh First) নীতির জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর ও কালজয়ী দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে। সমকালীন আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ, বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত shadow war এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিদের বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চাপের মুখে টিকে থাকতে হলে কোনো একক ব্লকের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সমরাস্ত্র ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বৈচিত্র্যকরণ নীতি’ (Diversification) বজায় রাখা অপরিহার্য। নিজের ভৌগোলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রাখতে দ্বিপাক্ষিক অসম চাপ মোকাবিলায় ‘সার্ক’-এর মতো বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ওজন বাড়ানো বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় শিক্ষা। একই সাথে, দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে আনসার ও ভিডিপি-র মতো মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে তৃণমূল স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় দুর্যোগে একক কমান্ডের আধুনিক ফ্রেমওয়ার্ক ধরে রাখাই হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় এই বাস্তববাদী ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাই রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রধানতম গ্যারান্টি।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৮ মে ২০২৬