
১
আমার বয়স সত্তরের কাছাকাছি
আমি অপরিচিত লোকদের কাছ থেকে
চিঠি কার্ড আর ছোটো উপহার পাই
অভিনন্দন
তারা আমাকে বলে
অভিনন্দন
আমি জানি এগুলোর অর্থ
যেভাবে আমি জীবনযাপন করেছি
আমার মরে যাওয়া উচিত ছিলো
জীবনের অর্ধেক সময়েই
নিজেকে আমি স্তুপ করেছি
প্রচুর অপব্যবহারের মাধ্যমে
পাগলামির চূড়ান্ত বিন্দুতে
নিজেকে নিয়ে এরচেয়ে ভালো আর কী লেখা যেতে পারে! জার্মান-আমেরিকান লেখক হেইনরিচ কার্ল বুকোওস্কি ১৯২০ সালের ১৬ আগস্ট জার্মানির অ্যান্ডারনাচে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দুই বছর বয়সে তার পরিবার লস এঞ্জেলেসে চলে এসেছিল, সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। তার শৈশব খুব কঠিন ছিল, বাবার হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে। এছাড়াও, তার জার্মান উচ্চারণের কারণে, তিনি অন্যান্য বাচ্চাদের কৌতুকের বিষয় হয়েছিলেন। তারা তাকে "হেনি" (তার নামের জন্য সংক্ষিপ্ত) বলে ডাকতো। সেসব প্রসঙ্গ বহুবার ফিরে ফিরে এসেছে তার লেখায়। তার লেখা সবসময়ই লস এঞ্জেলেসের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। গল্পের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন আত্মজৈবনিক উপন্যাস, নন-ফিকশন এবং অজস্র কবিতা। তবে কবি হিসেবেই তার পরম খ্যাতি। বুকোওস্কির লেখায় অ্যালকোহল এবং অসাম্প্রদায়িক আচরণের প্রতি তার উদ্বেগপ্রবণতা দেখানো হয়েছে। তবে তার লেখা একই সাথে যেমন আদৃত-আলোচিত, তেমনি সমালোচিতও। তার লেখা এবং চালচলন উভয়ই ছিল ভীষণ বিতর্কের। সাহসী রচনা শৈলী, খিস্তি-খেউড়ের ব্যবহার তাকে বরাবর আলোচনায় রেখেছে। কবির ব্যক্তিজীবনের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় তার সাহিত্যকর্মে। সত্তরের দশকে একবার বেলজিয়াম টিভিতে সাক্ষাৎকারে কবি বলেছেন, “আমার বাবা আমায় লিখতে শিখিয়ে ছিলেন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ সাহিত্য শিক্ষক। তিনি আমায় শিখিয়ে ছিলেন যন্ত্রনার মানে। আমায় মারতেন বিনা কারনে। ৬ থেকে ১১ বছর বয়স অব্দি প্রতি সপ্তাহে বাবা আমায় মারতেন, সপ্তাহে ৩ বার, একটা কাঁটা চামড়ার বেল্ট দিয়ে মারতেন। ৩ বার প্রতি সপ্তাহে ৬ থেকে ১১ কতগুলো মার হয় গুনে দেখুন তো!”
২
অ্যালকোহলের সাথে বুকোওস্কি’র দীর্ঘ সম্পর্কের সূচনা ঘটে কৈশোরে। মুখে খুব ব্রণ হতো বলে স্কুলজীবনে মেয়েরা প্রত্যাখ্যান করেছিল, আর সেই হতাশাবোধ থেকে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বুকোওস্কি মদ্যপ হয়ে ওঠেন। লস এঞ্জেলেস উচ্চ বিদ্যালয়ে হাই স্কুল পাস করার পরে লস এঞ্জেলেস সিটি কলেজে সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার কোর্স গ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে তিনি নিউইয়র্কে চলে যান এবং লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ফিলাডেলফিয়াতে ১৭ দিনের জন্য আটক ছিলেন। ১৯৫৫ সালে কেবল গ্যাস্ট্রিক আলসারের কারণে বুকোওস্কি মদ্যপান বন্ধ করেছিলেন এবং কবিতা লেখার মাঝে নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে তিনি বারবারা ফ্রাইয়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যার সাথে তিনি টেক্সাসের একটি ছোট্ট শহরে থাকতেন। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদের পরে কবি ক্যালিফোর্নিয়ায় তার মদ্যপানের পুরনো অভ্যাসে ফিরে আসেন এবং কবিতা লিখতে থাকলেন। বুকোওস্কি বারবার বলেছেন যে তার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক প্রভাবগুলি হলেন, জন ফ্যান্তে, ফায়োডর দস্তয়েভস্কি, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, লুই-ফার্ডিনান্দ সেলিন, নট হামসুন, রবিনসন জেফার্স, ডি এইচ লরেন্স, হেনরি মিলার, ডু ফু এবং লি বাই। বুকোওস্কি মূলত খেটে খাওয়া পরিবারের ছেলে। বাবার হাতে যেমন অত্যাচারিত হয়েছেন, আবার বাবাই তাকে লিখতে শিখিয়েছেন। বেলজিয়াম টিভি যখন তার সাক্ষাৎকার নিচ্ছে ততোদিনে তার পরিচিতি বেড়েছে অনেক, প্রায় সেলেব্রিটি। তাকে লিটল ম্যাগাজিনের রাজা বলা হয়, কারণ সেসময়ে এমন কোনো লিটল ম্যাগাজিন নেই যারা তার লেখা ছাপেনি। জনপ্রিয় এই কবি এলোমেলো জীবযাপন করতেন। এক অর্থে তিনি খুবই সাধারণ হয়ে থাকতেন। হয়তো সেজন্যই ছোট প্রকাশক আর লিটল ম্যাগাজিনই ছিল তার লেখা প্রকাশের মাধ্যম।
গ্যারি স্টেলা একগাদা আবর্জনার ভেতর থেকে বুকোওস্কির কিছু কবিতা পেয়ে গেলেন। লস এঞ্জেলেস টাইমস ১৯৯৬ সালের ২ জুন সে সংবাদ ছাপতে গিয়ে লিখলেন, ‘চার্লস বুকোওস্কি ছিলেন আমেরিকার রাস্তার কবি। এক অমার্জিত, এক গোবর গণেশ, এক মেজাজ খারাপ মাতাল যে কিনা নোংরা কথা বলে, নোংরা কথা লিখে আর আস্বাদন করে তার নোংরা বুড়া বদলোকের এই ভাবমূর্তিখানি।’ অবশ্যই বুকোওস্কি নতুন কবিতা খুঁজে পাওয়া একটি ঘটনা, অবশ্যই সেই ঘটনা সংবাদে ছাপা হওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু সেই সংবাদের ভাষাটিই অনেক কিছু বলে দেয়। তবে বুকোওস্কি কে, কেমন মানুষ তিনি- তা শুধু তার জীবনীতে খুঁজলে হবে না। তার কবিতায়, তার সাক্ষাৎকারে, তার চালচলনে এবং এমনকি তার সম্পর্কে প্রথাবদ্ধ মানুষের ধারণার মধ্যেও বুকোওস্কি খুঁজতে হয়। মার্কিন কবিতায় তিনি নায়ক না, বুকোওস্কি যেন এক খলনায়ক। প্রকাশ্যে কবিতার অনুষ্ঠানে টিকিট কেটে আসা দর্শকদের নিয়ে তিনি ইয়ার্কি মারেন। দর্শককে বলে বসেন, অপেক্ষা করো, একটু মাল খেয়ে নিই। মদ, জুয়া, মেয়েমানুষ নিয়েই কেটেছে ছন্নছাড়া এই বুড়োর জীবন।
৩
ছয়টি উপন্যাস, কয়েকশ গল্প এবং কয়েক হাজার কবিতার জনক বুকোওস্কির প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬০-এর অধিক। লস এঞ্জেলেসের আন্ডারগ্রাউন্ড নিউজপেপার ওপেন সিটিতে তিনি দীর্ঘদিন ‘নোটস অফ আ ডার্টি ওল্ড ম্যান’ নামে কলাম লিখেছেন। এই ধরণের কলাম লেখার কারণে এফবিআই-এর মতো সংস্থা তার উপর নজদারি জারি রেখেছিলো।
৪
লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৪ সালের ৯ মার্চ কবি মৃত্যুবরণ করেন। বেহিসেবি-ছন্নছাড়া জীবন যাপনে অভ্যস্ত এই কবিকে তার জীবনাচরণের পাশাপাশি কবিতা দিয়ে মিলিয়ে দেখলে কিছুটা রহস্য হয়তো উন্মোচিত হয়। ‘নীল পাখি’ কবিতায় বুকোওস্কি যেমনটা লিখেছেন,
আমার হৃদয়ে একটা নীল পাখি আছে যেটা
বের হয়ে আসতে চায়
কিন্তু আমি ভীষণ চতুর, আমি কেবল তাকে বের হতে দিই
রাত্রিতে মাঝে মাঝে
যখন সকলেই ঘুমন্ত।
এই কবিতার মতোই বুকোওস্কি হয়তো আসল মানুষটার মুখের ওপর একটা খারাপ মানুষের মুখোশ চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে আড়াল করতে চাইতেন। তবে তিনি তার তেতাল্লিশতম জন্মদিন উপলক্ষে নিজের যে চিত্রটি তুলে ধরেন সেটিই সম্ভবত আসল হেইনরিচ কার্ল বুকোওস্কি,
একাকী শেষ হয়ে যাওয়া
একটা কক্ষের কবরে
সিগারেট ছাড়া
কিংবা মদ ছাড়া –
স্রেফ একটা বৈদ্যুতিক বাতি
এবং একটা ভুঁড়িঅলা
ধূসর চুল
এবং আনন্দিত আছে
একটা কক্ষে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৩ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। চার্লস বুকোউস্কি’র কবিতা- ইমরুল হাসান
২। চার্লস বুকোস্কির নির্বাচিত কবিতা- মুম রহমান
৩। সোজা তোমার কবরে যাও- কায়েস সৈয়দ
৪। ইন্টারনেট