
১
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র ইনভেস্টিগেটিভ টিম ‘বিবিসি আই’ সম্প্রতি ভারতে পরিচালিত এক অনুসন্ধানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামের একটি ভয়াবহ ও জঘন্য অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেটা’র স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞাপন মডারেশন সিস্টেমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অপরাধীরা সরাসরি শিশুদের যৌন নির্যাতন ও শোষণের ইঙ্গিতপূর্ণ অর্থের বিনিময়ে স্পনসরড বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে। এই চতুর বিজ্ঞাপনী ফানেলের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামের গোপন চ্যানেলে, যেখানে মাত্র ৯৯ টাকার বিনিময়ে মিলছে চরম বিকৃত ও নিষিদ্ধ কন্টেন্ট। ভারতে ঘটে যাওয়া এই ভয়ঙ্কর অপরাধ চক্রের তৎপরতা বাংলাদেশের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা বা 'ওয়েক-আপ কল' হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ দেশের তরুণ সমাজ যেভাবে দিন দিন ইনস্টাগ্রাম ও এর রিলস আসক্তির ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তাতে যেকোনো সময় তারা এই অদৃশ্য ফাঁদে পা দিয়ে বড় বিপদের শিকার হতে পারে। এই বৈশ্বিক সাইবার থাবা থেকে দেশের তরুণদের রক্ষা করতে পারিবারিক সচেতনতা, প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ ও কঠোর আইনি কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই, অন্যথায় তা আমাদের অজান্তেই ব্যক্তি, সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
২
ডেটা ও পরিসংখ্যান: বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও ইনস্টাগ্রামের মায়াজাল।
বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি এবং স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে, যার একটি বিশাল অংশ বয়সে তরুণ। বিটিআরসি এবং মেটা’র বিজ্ঞাপনী ড্যাশবোর্ডের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী সাড়ে ৫ কোটির বেশি হলেও তরুণদের মাঝে ইনস্টাগ্রামের জনপ্রিয়তা দ্রুততম গতিতে বাড়ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ এবং এর মধ্যে ৭০ শতাংশেরই বয়স ১৮ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে অর্থাৎ তারা জেনারেশন ‘জি’। এই বিশাল জেন-জি জনগোষ্ঠী যখন কোনো নিরাপদ ফিল্টারিং ছাড়াই প্ল্যাটফর্মটিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটায়, তখন তারা খুব সহজেই দেশি-বিদেশি সাইবার অপরাধী চক্রের সফট-টার্গেটে পরিণত হতে পারে।
ক। ডিজিটাল কাঠামোর ব্যাপ্তি ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা।
গ্লোবাল ডিজিটাল স্ট্যাটিস্টিকস এবং বিটিআরসি’র তথ্যমতে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন বিপ্লব তরুণ প্রজন্মকে সম্পূর্ণ নতুন এক ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করিয়েছে। দেশের মোট সাড়ে ৫ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর পাশাপাশি ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটক ও ইউটিউবও তরুণদের মনোযোগের একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে। তবে ভিজ্যুয়াল নান্দনিকতা ও ট্রেন্ডের কারণে তরুণদের মূল ঝোঁক মেটা’র মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রামের দিকে, যার সক্রিয় ব্যবহারকারী সংখ্যা ইতোমধ্যে ৭০ লাখ ছুঁইছুঁই। এই বিশাল ব্যবহারকারী ভিত্তির সিংহভাগই বয়সে তরুণ হওয়ায় অপরাধীরা তাদের মনস্তত্ত্বকে সহজেই বিজ্ঞাপনী ফাঁদের মাধ্যমে অপব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে। গ্লোবাল ডাটার এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের তরুণদের একটি বড় অংশ এখন কোনো দৃশ্যমান নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই এই গ্লোবাল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত।
খ। ব্যবহারের ধরণ ও রিলস আসক্তির নেপথ্য রূপ।
বাংলাদেশে টিকটক আংশিক সীমিত বা নজরদারিতে আসার পর শর্ট-ভিডিওর বাজার একচেটিয়া দখলে নিতে ইনস্টাগ্রাম তাদের আকর্ষক 'রিলস' ফিচারটি সামনে নিয়ে আসে। ডেটা অ্যানালিটিক্স রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের তরুণরা তাদের প্রতিদিনের ইন্টারনেটের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ গড়ে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা ব্যয় করছে এই অন্তহীন রিলস স্ক্রল করে। অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে তারা একেকটি রিলস দেখছে এবং তাদের অজান্তেই সিস্টেম তাদের আরও বেশি প্রলোভনমূলক ও সংবেদনশীল কন্টেন্টের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিবিসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্যবহারকারী নিজে না খুঁজলেও এই রিলস আসক্তির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা চাইল্ড পর্নের মতো বিপজ্জনক বিজ্ঞাপন তাদের ফিডে পুশ করে। ফলস্বরূপ, বিনোদনের খোঁজে স্ক্রল করতে থাকা আমাদের দেশের তরুণরা খুব সহজেই আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় অপরাধী সিন্ডিকেটের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ছে।
৩
অ্যালগরিদমের ফাঁদ: কীভাবে ব্যবহারকারীকে প্ররোচিত করা হচ্ছে?
বিবিসি’র অনুসন্ধানে মেটা’র সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ব্রায়ান বোল্যান্ড ইনস্টাগ্রামের সিস্টেমকে একটি "চরম যত্নহীন ও উদাসীন মেশিন" বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই অ্যাপের অ্যালগরিদম মূলত ব্যবহারকারীর মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে প্ল্যাটফর্মের ভেতরে আটকে রাখার জন্য প্রতিনিয়ত প্ররোচিত করে। মেটা তাদের মুনাফা ও বিজ্ঞাপনী রিচ বাড়ানোর অন্ধ দৌড়ে ব্যবহারকারীর সাইবার সুরক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে চলেছে। ফলে একজন সাধারণ ব্যবহারকারী নিজে কিছু না খুঁজলেও এই চতুর অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে অনায়াসেই বিপথগামী হয়ে উঠছে।
ক। অ্যাটেনশন ইকোনমি (Attention Economy) ।
ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদমের মূল ব্যবসায়িক লক্ষ্যই হলো ব্যবহারকারীকে যেকোনো মূল্যে অ্যাপের ভেতরে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা। কোনো ব্যবহারকারী যদি অসাবধানতাবশত কোনো যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা রোমাঞ্চকর কন্টেন্টে কয়েক সেকেন্ড বেশি তাকান, তবে সিস্টেমটি তা রেকর্ড করে নেয়। এরপর ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখতে অ্যালগরিদম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ফিডে আরও বেশি "এক্সট্রিম ও প্রলুব্ধকর" বিষয়বস্তু পুশ করা শুরু করে। মেটা’র এই অতি-মুনাফালোভী স্ক্রিনিং ব্যবস্থার কারণে ব্যবহারকারীরা নিজেদের অজান্তেই এক অন্তহীন ডার্ক লুপ বা অন্ধকার চক্রের মধ্যে প্রবেশ করে। এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদটি তরুণদের সুস্থ মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তাদেরকে অপরাধের দিকে ধাবিত করছে।
খ। ছদ্মনামের ফাঁদ।
বিবিসি অনুসন্ধানের স্বার্থে ইনস্টাগ্রামে একটি সাধারণ ছদ্মনামের অ্যাকাউন্ট খুলে মাত্র ১০ জন সাধারণ প্রোফাইলকে ফলো করা শুরু করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত ভীতিজনকভাবে লক্ষ্য করা যায় যে, মাত্র এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যেই সেই অ্যাকাউন্টের ফিডে বিবস্ত্র দম্পতিদের ভিডিও আসতে শুরু করে। পরবর্তীতে অ্যাপের স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন প্রক্রিয়ার ফাঁক গলে শিশুদের ওপর নির্যাতনের ইঙ্গিতপূর্ণ চরম আপত্তিকর বিজ্ঞাপনও প্রদর্শন করা হয়। এই বিজ্ঞাপনের সাথে যুক্ত টেলিগ্রাম লিংকের মাধ্যমে অপরাধীরা মাত্র ৯৯ টাকায় বিকৃত কন্টেন্ট বিক্রি করে ব্যবহারকারীদের অন্ধকার জগতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ব্যবহারকারী নিজে থেকে কোনো অপরাধমূলক বা নিষিদ্ধ বিষয়বস্তু না খুঁজলেও অ্যালগরিদম নিজে যেচে তাকে এই নরকে পতিত করছে।
৪
সুরক্ষাকবচ: ব্যক্তি ও পরিবার ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে করণীয়।
ইনস্টাগ্রামের এই ভয়ঙ্কর থাবা থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা করতে হলে এখনই একটি সুনির্দিষ্ট ত্রি-মুখী কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সামাজিক সচেতনতা, আইনি কঠোরতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত নজরদারির সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া এই অদৃশ্য বৈশ্বিক অপরাধ চক্রের মোকাবেলা করা অসম্ভব।
ক। সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক প্রতিরোধ (Social Awareness) ।
ইনস্টাগ্রামের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে পরিবার ও সমাজকে সবার আগে ঢাল হিসেবে দাঁড়াতে হবে, যার প্রথম পদক্ষেপ হলো অভিভাবকদের প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ হওয়া। মেটা কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় ‘Teen Accounts’ এবং শক্তিশালী প্যারেন্টাল সুপারভিশন ফিচার এনেছে, যা ব্যবহার করে সন্তানের অনলাইন অ্যাক্টিভিটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পাশাপাশি, পরিবারে একটি বন্ধুসুলভ ও সহজ রিপোর্টিং কালচার গড়ে তুলতে হবে, যেন কোনো সন্তান ভুলবশত ব্ল্যাকমেইলিং বা ট্র্যাপে পড়লে ভয়ের কারণে লুকিয়ে না থেকে বাবা-মায়ের সাথে বিষয়টি শেয়ার করতে পারে। শুধু ঘরোয়া প্রতিরোধই যথেষ্ট নয়; স্কুল-কলেজ পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে ও বিশেষ সেমিনারের মাধ্যমে 'ডিজিটাল লিটারেসি' এবং সাইবার সেফটি শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।
খ। প্রযুক্তিগত নজরদারি ও কাঠামো (Technical Structure) ।
ডিজিটাল অপরাধ চক্রকে রুখতে হলে কেবল মৌখিক নির্দেশনায় কাজ হবে না, বরং দেশের ভেতর একটি শক্তিশালী ও আধুনিক প্রযুক্তিগত নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এবং সরকারের সাইবার ক্রাইম উইংকে অত্যন্ত শক্তিশালী ডোমেইন ফিল্টারিং ও ক্রস-প্ল্যাটফর্ম ট্রাফিক ট্র্যাকিং টুল ব্যবহার করতে হবে। ইনস্টাগ্রামের ক্ষতিকর বিজ্ঞাপনগুলো থেকে যেসব সন্দেহজনক টেলিগ্রাম চ্যানেল বা থার্ড-পার্টি লিংকে ট্রাফিক ডাইরেক্ট হচ্ছে, সেগুলোকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ সীমান্তেই আইপি লেভেলে ব্লক করার সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। যেহেতু মেটা’র গ্লোবাল এআই বাংলা ভাষা কিংবা তরুণেরা যে 'বাংলিশ' কোড-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালায় তা ধরতে পারে না, তাই সরকারকে নিজস্ব উদ্যোগে দেশীয় ‘ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং’ এআই মডেল তৈরি করতে হবে। এই প্রযুক্তিগত প্রাচীর গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল দেশীয় সাইবার স্পেসে ছড়িয়ে থাকা যেকোনো সন্দেহজনক ও বিকৃত কন্টেন্টকে প্রাথমিক স্তরেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্র্যাক ও নির্মূল করা সম্ভব হবে।
গ। কঠোর আইনি কাঠামো ও জবাবদিহিতা (Legal Framework) ।
ইন্টারনেটের এই অন্ধকার সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা এবং টেলিগ্রামের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও কঠোর আইনি পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মদন লোকুর উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কোনো প্ল্যাটফর্মই অপরাধমূলক কাজে অংশ নিয়ে মুনাফা করে তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না। বাংলাদেশ সরকারের এখন উপযুক্ত সময় গ্লোবাল এই প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর জোরালো আইনি চাপ সৃষ্টি করা এবং দেশের প্রচলিত আইনের অধীনে তাদের নোটিশ পাঠানো। সুরক্ষার স্বার্থে মেটা ও টেলিগ্রামকে বাংলাদেশে তাদের লোকাল কমপ্লায়েন্স অফিস ও স্থানীয় প্রতিনিধি দল স্থাপনে আইনগতভাবে বাধ্য করতে হবে। এর ফলে যেকোনো আপত্তিকর বিজ্ঞাপন বা ক্ষতিকর লিংক চিহ্নিত হওয়া মাত্রই বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে তা দ্রুত অপসারণের জন্য সরাসরি নির্দেশ জারি করা সম্ভব হবে।
বিশ্বজুড়ে টেক জায়ান্টগুলোর উদাসীনতা রুখতে বর্তমানে কঠোর জরিমানার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইনেও তার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, শিশুদের নিরাপত্তা সুরক্ষায় ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লক্ষ ডলারের বিশাল অংকের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের দেশের সাইবার আইনেও প্রযুক্তি জায়ান্টদের এমন গাফিলতি ও সুরক্ষার ঘাটতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আর্থিক জরিমানা এবং কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা দরকার। যখন এই ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিগুলো দেখবে যে নীতি লঙ্ঘন করলে তাদের বিশাল অর্থনৈতিক ও আইনি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে, তখনই কেবল তারা আমাদের দেশের বাজারকে নিরাপদ করতে বাধ্য হবে। এই কঠোর আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমাদের জেনারেশন জি এবং পারিবারিক কাঠামোকে চিরতরে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
৫
ইনস্টাগ্রাম কিংবা যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বর্তমান যুগের জেনারেশন জি-এর জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই একে পুরোপুরি নিষিদ্ধ বা বন্ধ করে দেওয়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। তবে বিনোদন আর যোগাযোগের ঝলমলে পর্দার আড়ালে যে ভয়াবহ অন্ধকার জগত ও বিকৃত অপরাধের জাল বিস্তৃত হচ্ছে, তার লাগাম এখনই টেনে না ধরলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর নৈতিক ও মানসিক সংকটে নিমজ্জিত হবে। বিবিসি’র ভারতীয় অনুসন্ধান আমাদের চোখের সামনে এক জ্বলন্ত ও বাস্তব সতর্কবার্তা, যা প্রমাণ করে যে বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর মুনাফালোভী অ্যালগরিদম কখনোই আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না। ডিজিটাল চোরাবালি থেকে তরুণদের রক্ষা করতে না পারলে তা কেবল ব্যক্তির সম্ভাবনাকেই নস্যাৎ করবে না, বরং অসংখ্য পরিবারকে চিরতরে নিঃস্ব ও সামাজিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেবে। তাই এই বৈশ্বিক সাইবার থাবার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে দাঁড়াতে হলে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর থেকে এখনই সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে।
এই মহাবিপদ থেকে সমাজকে মুক্ত রাখতে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, সরকার এবং প্রযুক্তিবিদদের একযোগে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তুলতে হবে। সর্বপ্রথম অভিভাবকদের নিজেদের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে সন্তানদের অনলাইন কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক ভালোবাসাপূর্ণ ও কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে; আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তা ও নৈতিক ডিজিটাল লিটারেসি বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হবে তরুণদের সুস্থ বিনোদন ও বাস্তব জীবনের সামাজিকতায় ফিরিয়ে আনার জন্য নিয়মতান্ত্রিক কাউন্সিলিং ও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো। সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে মেটা ও টেলিগ্রামের মতো আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্টদের ওপর কঠোর আইনি চাপ প্রয়োগ করে এ দেশে লোকাল অফিস স্থাপনে বাধ্য করতে হবে, যেন যেকোনো ক্ষতিকর উপাদান তাৎক্ষণিকভাবে দেশীয় সাইবার স্পেস থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা যায়। পরিশেষে, আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের উচিত আন্তর্জাতিক মানের বাংলা এআই ও ট্রাফিক ফিল্টারিং টুলস তৈরি করে রাষ্ট্রের সাইবার সুরক্ষাকবচকে নির্ভেদ্য করে তোলা, যার মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার এবং সর্বোপরি পুরো বাংলাদেশ এই অদৃশ্য ডিজিটাল অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
৬ জুলাই ২০২৬