
১
‘যে ভার আমি বইতে পারি না, সেটা আমি নেই না।’
কথাগুলো বলেছিলেন কবি পত্নী সুলতানা রেবু।
অবশ্য তখনও কবি হুমায়ুন কবিরের সাথে তাঁর প্রেম বা বিয়ে হয়নি।
‘কুসুমিত ইস্পাত’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘১৯৬৬ সালের শেষের দিকে লাইব্রেরির বারান্দায় প্রবল ঝড়বৃষ্টির মধ্যে হুমায়ুনের সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়। আমার হাতে ছিল লাইব্রেরি থেকে নেয়া অনেকগুলো বই আর বাইরে ঝড়বৃষ্টি-হুমায়ুনের ইচ্ছা ছিল আমার কিছু বই হল-গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেবে’। সেসময়ে কবিকে উদ্দেশ্য করে বলা কথাগুলো পরদিনই অধ্যাপক আহমদ শরীফের কাছে পৌঁছে যায়। তিনি উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন, ‘চালিয়ে যাও, হবে।’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সুন্দর একটি বর্ণনা দিয়েছেন এই দুজনের সম্পর্কের,
‘১৯৬৮-৬৯-এর দিকে কী একটা কারণে যেন একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে গিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে করিডোরে প্রাণের রঙিন উচ্ছলতাইনা আমাদের সময়ের মতোই চঞ্চল-স্রোতে বয়ে চলেছে। হুমায়ুন আমাকে ওর কিছু সহপাঠী-সহপাঠিনীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। মাজা ফরসা রঙের ছিপছিপে দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটির লম্বা বেণী পিঠের উপর দুলছে, চাউনি সপ্রতিভ।
বিকেলে হুমায়ুন বাসায় এলে বললাম: বেশ সুন্দর তো মেয়েটি! কে? এত সুন্দর একটা মেয়ে তোমার সহপাঠিনী আর তুমি এখনো তার প্রেমে পড়োনি।
হুমায়ুন ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলল। আমি-যে ওর অজান্তে মেয়েটার জন্য ওর ভেতরের কাতরতা টের পেয়ে গেলাম, ও বুঝল না।
জিজ্ঞেস করলাম, নাম কী মেয়েটার?
ও বলল, সুলতানা রেবু।
এর দিন কয়েক পরেই হুমায়ুন এসে ওদের প্রেমের সুখবরটা দিল। হ্যাঁ, ঐ মেয়েটিই।
এরপরে শুরু হল ওর প্রেমে আর কবিতায়-ভরা মাতাল দিনগুলো।’
২
কবি’র সেইসব মাতাল দিনগুলোর স্বাক্ষী মেলে তাঁর লেখা ‘পার্শ্ববর্তিনী সহপাঠিনীকে’ কবিতায়,
‘কি আর এমন ক্ষতি যদি আমি চোখে চোখ রাখি
পদাবলী প’ড়ে থাক সাতাশে জুলাই বহুদূর
এখন দুপুর দ্যাখো দোতালায় পড়ে আছে একা
চলো না সেখানে যাই। করিডোরে আজ খুব হাওয়া
বুড়ো বটে দু’টো দশে উড়ে এল ক’টা পাতিকাক।
......................................................
ওদিক তাকাও দ্যাখো কলরব নেই করিডোরে
সেমিনার ফাঁকা হল হেডস্যার হেঁটে গেল অই।
না – না – যেও না তুমি চোখে আর তাকাব না আমি
বসে থাকি শুধু এই; এইটুকু দূরে বই নিয়ে
এ টেবিলে আমি আর ও টেবিলে তুমি নতমুখী’।
সুলতানা রেবু বলেছেন, ‘হুমায়ুনের সঙ্গে আমার পরিচয় পর্বটা এই রকম-আমরা দু’জনই একই শহরে (বরিশাল) বড় হয়েছি, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে কেউ কাউকে দেখিনি। হুমায়ুনের পিঠাপিঠি বড়বোন মমতা পড়ত আমার সঙ্গে। আমাদের বাড়িতে সব ভাইবোনের গল্পের বই পড়ান নেশা ছিল, কিন্তু সেই অনুপাতে কিনে পড়ার সামর্থ্য বেশি ছিল না। বন্ধুদের অফুরান সাপ্লাই পেয়ে যেতাম। মমতা নিজে দিতে না পারলেও ভাইয়ের (হুমায়ুন) কাছ থেকে বই এনে দিত। ১৯৬৫ সালে দু’জনেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হই’। তাঁদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৬৯ সালে। পরের বছর ১৩ নভেম্বরে তাঁদের প্রথম সন্তান সেতু অর্থাৎ আদিত্য কবির জন্ম নেন। সেতু ০৮ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখ রাতে ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক করে মারা যান।
৩
১৯৭২ সালের ৬ জুন, সময় রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। হুমায়ুন কবির তখন স্বপরিবারে ইন্দিরা রোডের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। সেই রাতে অসহ্য গরম পড়েছিল। সুলতানা রেবু জানালেন, ‘হুমায়ুন কবির কখনো খালি গায়ে থাকতেন না। শীত কি গরম, একটা গেঞ্জি থাকতই। কিন্তু সেই রাতে হুমায়ুন খালি গায়ে ছিলেন। সারা দিনের ক্লান্ত সুলতানা রেবু তখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তাই কখন হুমায়ুন কবির খালি গায়ে বাইরে গেল জানতে পারেননি’। হুমায়ুন কবির বাসার সামনের খালি মাঠটায় শুয়ে ছিলেন, মনে হচ্ছিল তীব্র গরমে খানিকটা স্বস্তির আশায় খোলা আকাশের নিচে শুয়ে আছেন। বাড়িওয়ালা বা পাশের বাসার ছেলে বাইরে থেকে আসছিল। তারাই প্রথম দেখেন, দ্রুত এসে খবর দেন সুলতানা রেবুকে। কবি’কে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয় কিন্তু বাঁচানো যায়নি। মাথার পেছনে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল।
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা কবি হুমায়ুন কবির’কে নিয়ে লিখেছেন, ‘আরেক লোরকা তিনি, বঙ্গ দেশীয় লোরকা, রক্তাক্ত হয়েছেন জীবনে, মৃত্যুতে এবং কবিতায়।’। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন, ‘তাঁর প্রথম কবিতার বইয়ের নাম ছিল কুসুমিত ইস্পাত। এই ফুল আর ফলা একই সঙ্গে ছিল ওর মধ্যে। প্রেমের কোমলতার পাশাপাশি বিপ্লবের রক্তস্নানেও ছিল ওর একইরকম উৎসাহ।’
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১৫ আগস্ট ২০২৬
হদিস:
১। কুসুমিত ইস্পাত (ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সংস্করণ)- হুমায়ুন কবির