
১
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দি থেকেও ইরান প্রযুক্তিগত গবেষণায় অভাবনীয় স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি বিশ্বমঞ্চে সামরিক শক্তি ও অত্যাধুনিক মিসাইল প্রযুক্তির জন্য পরিচিত হলেও, সম্প্রতি তারা পা রেখেছে ফ্রন্টিয়ার সায়েন্স বা বিজ্ঞানের একদম অগ্রবর্তী সীমানায়। জীববিজ্ঞান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা বৈপ্লবিক শাখা ‘অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্স’ (OI) গবেষণায় ইরান বিশ্বকে চমকে দিয়ে এক নতুন ব্রেকথ্রু অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের জুনের শেষভাগে ইরানের ‘কগনিটিভ সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজিস ডেভেলপমেন্ট টাস্কফোর্স’ (Cognitive Sciences and Technologies Development Taskforce) কর্তৃক ল্যাবরেটরি-স্কেলে মানুষের জীবন্ত নিউরন দিয়ে তৈরি একটি ‘আর্টিফিশিয়াল ব্রেন’ বা কৃত্রিম মস্তিষ্কের প্রোটোটাইপ উন্মোচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এই অগ্রযাত্রার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সামরিক সমরাস্ত্রের গণ্ডি পেরিয়ে জৈব-কম্পিউটিংয়ের এই শীর্ষ চূড়ায় ইরানের আরোহণ বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক সমীকরণকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করছে।
২
সিলিকন কম্পিউটিংয়ের সীমাবদ্ধতা এবং বায়োকম্পিউটিংয়ের উত্থান।
বিগত শতাব্দী থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বকে শাসন করছে সিলিকন চিপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ট্রানজিস্টর ও প্রথাগত কম্পিউটার। তবে বর্তমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং বিগ ডেটা প্রসেসিংয়ের যুগে এই সিলিকন প্রযুক্তির কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ক। প্রসেসিং আর্কিটেকচারের অমিল: লিনিয়ার বনাম সমান্তরাল।
প্রথাগত সিলিকন কম্পিউটার মূলত সিকোয়েন্সিয়াল বা লিনিয়ার পদ্ধতিতে কাজ করে, যেখানে বাইনারি কোড (০ এবং ১) ব্যবহার করে প্রতি মুহূর্তে একটির পর একটি হিসাব অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়। বিপরীতে, মানুষের মস্তিষ্ক বা বায়োকম্পিউটিং পুরোপুরি প্যারালাল প্রসেসিং বা সমান্তরাল পদ্ধতিতে কাজ করে। মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন যেভাবে একসাথে জটিল সব তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, সিলিকন চিপের পক্ষে সেই বহুমাত্রিকতা অর্জন করা অসম্ভব।
খ। শক্তির অপচয় ও শক্তির সাশ্রয়।
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা সুপারকম্পিউটার ‘Frontier’ চালাতে প্রায় ২১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা একটি ছোটখাটো শহরের সামগ্রিক বিদ্যুতের চাহিদার সমান। অন্যদিকে মানুষের মস্তিষ্ক প্রায় একই স্তরের জটিল সিদ্ধান্ত নিতে খরচ করে মাত্র ২০ ওয়াট শক্তি, যা একটি মৃদু এলইডি বাল্বের সমান। এই অবিশ্বাস্য শক্তির সাশ্রয়ী রূপটিকে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে আসার তাগিদ থেকেই বায়োকম্পিউটিং ও অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্সের উৎপত্তি।
৩
অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্স (OI): জীববিজ্ঞান ও এআই-এর ফিউশন।
অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্স হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জগতের একদম সাম্প্রতিক একটি শাখা, যা সিলিকন চিপের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের ‘জৈবিক কম্পিউটার’ বা বায়ো-কম্পিউটার তৈরির স্বপ্ন দেখায়।
ক। ‘মস্তিষ্ক-অরগানয়েড’ (Brain Organoids) কী?
মানুষের স্টেম সেল (Stem Cell) ব্যবহার করে গবেষণাগারে ত্রিমাত্রিক আকারে জীবন্ত মস্তিষ্কের টিস্যু বা কোষের কালচার তৈরি করা হয়, যা আকারে একটি কলমের ডগার মতো ক্ষুদ্র। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘মস্তিষ্ক-অরগানয়েড’। মানুষের মস্তিষ্কের মতো নিউরন এবং সিন্যাপ্স থাকায় এরা নিজেদের মধ্যে জৈব-রাসায়নিক সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে।
খ। এটি কীভাবে কাজ করে?
গবেষণাগারে তৈরি এই মিনি-ব্রেন বা অরগানয়েডগুলোকে বিশেষ ধরনের ইলেক্ট্রোড বা সেন্সরের সাথে যুক্ত করা হয়। এই সেন্সরগুলোর মাধ্যমে মস্তিষ্কের জীবন্ত কোষে তথ্য বা উদ্দীপনা পাঠানো হয় (ইনপুট) এবং কোষগুলো সেই তথ্যের বিপরীতে কীভাবে বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে তা রেকর্ড করা হয় (আউটপুট)। বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য হলো এই জৈবিক কোষগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বা কৃত্রিম উপায়ে শিখতে উদ্বুদ্ধ করা।
৪
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরানের বৈজ্ঞানিক বিপ্লব।
পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা ইরানকে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করলেও, দেশটি একে দেশীয় মেধা বিকাশের সুযোগ হিসেবে লুফে নিয়েছে। ড্রোন ও হাইপারসনিক মিসাইল প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের পর ইরানের এই জৈব-প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া এক বিশাল কৌশলগত পদক্ষেপ।
ক। ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক ঘোষণা।
২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে ইরানের ‘কগনিটিভ সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজিস ডেভেলপমেন্ট টাস্কফোর্স’ (Cognitive Sciences and Technologies Development Taskforce)-এর অফিশিয়াল রিপোর্টে জানানো হয়, দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় নলেজ-বেসড কোম্পানি মানবদেহের বাইরে স্নায়ুকোষ বা নিউরন কালচার করার সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করেছে। তারা ল্যাবরেটরি স্কেলে একটি সফল প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে, যা সফলভাবে নিজেদের মধ্যে সিন্যাপ্স তৈরি করতে এবং প্রাথমিক স্তরের শিক্ষণ প্রক্রিয়ায় (Learning Process) সাড়া দিতে সক্ষম।
খ। ১০ লক্ষ গুণ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি।
ইরানি গবেষক দলের প্রধানদের দাবি অনুযায়ী, তাদের তৈরি এই জৈবিক প্রসেসর প্রোটোটাইপটি প্রথাগত সিলিকন চিপের তুলনায় ডেটা প্রসেসিংয়ের ক্ষেত্রে শক্তির ব্যবহার প্রায় ১০ লক্ষ গুণ (1 million Times) কমিয়ে আনতে পারে। এই ব্রেকথ্রু ইরানকে অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্স গবেষণায় বিশ্বের শীর্ষ ৪ থেকে ৫টি দেশের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে, যা তাদের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার এক অভাবনীয় প্রমাণ।
৫
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও কম্পিউটিংয়ের ভবিষ্যৎ রূপরেখা।
অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্স কেবল কম্পিউটারের গতি বাড়ানো বা শক্তি বাঁচানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা মানবজাতির অস্তিত্বের সাথে জড়িত।
ক। বায়ো-সুপারকম্পিউটারের রূপান্তর।
সিলিকন চিপ এবং ডিএনএ বা নিউরন চিপের সংমিশ্রণে তৈরি হাইব্রিড কম্পিউটার হবে ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি। যেসব কাজে নিখুঁত গাণিতিক হিসাব ও কোডিং প্রয়োজন, সেখানে সিলিকন চিপ থাকবে; আর যেখানে মানুষের মতো বুদ্ধি, ভাষা ও প্যাটার্ন চেনার প্রয়োজন, সেখানে ইরানের এই প্রোটোটাইপের মতো বায়ো-প্রসেসর নেতৃত্ব দেবে।
খ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত।
আলঝেইমারস, অটিজম, পারকিনসন্স বা ডাউন সিনড্রোমের মতো জটিল মানসিক ও স্নায়বিক রোগগুলো কীভাবে মানব মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে, তা সরাসরি জীবন্ত কোষের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। ইরানের বিজ্ঞানীরা তাদের এই গবেষণাগারে তৈরি কৃত্রিম মস্তিষ্ককে নতুন ওষুধ পরীক্ষা এবং স্নায়বিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য পরবর্তী ধাপের কাজ শুরু করেছেন।
৬
নৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক সতর্কতা।
যেকোনো বৈপ্লবিক প্রযুক্তির মতোই অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্সও মানব সভ্যতার সামনে কিছু গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন (Ethical Concerns) দাঁড় করিয়েছে।
ক। চেতনা ও অনুভূতির বিতর্ক।
গবেষণাগারে তৈরি এই মস্তিষ্কের কোষগুলো যদি ক্রমাগত জটিলতর হতে থাকে, তবে কি তারা একসময় মানুষের মতো ‘চেতনা’ (Consciousness) বা ‘ব্যথা ও অনুভূতি’ লাভ করতে পারে? এই প্রশ্নটি বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। মানুষের স্টেম সেল থেকে তৈরি একটি সিস্টেম যদি নিজস্ব চিন্তাভাবনা শুরু করে, তবে তার আইনি ও নৈতিক মর্যাদা কী হবে, তা এখনো অমিমাংসিত।
খ। ইরানের অবস্থান ও কঠোর নীতিমালা।
ইরানের ‘কগনিটিভ সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজিস ডেভেলপমেন্ট টাস্কফোর্স’ তাদের নির্দেশিকায় স্পষ্ট করেছে যে, এই গবেষণা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং আন্তর্জাতিক বায়ো-এথিক্স (Bioethics) বা জৈব-নৈতিকতার কঠোর নিয়ম মেনে পরিচালনা করা হচ্ছে। চেতনা সৃষ্টির মতো কোনো স্তরে যাওয়ার আগেই এই কোষগুলোকে নির্দিষ্ট ডেটা প্রসেসিংয়ের কাজেই সীমাবদ্ধ রাখার আইনি কাঠামো তৈরি করছে দেশটি।
৭
ইরানকে বিশ্ব এতদিন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং দূরপাল্লার মিসাইল প্রযুক্তির চোখে দেখেছে, সেই ইরান আজ অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্সের মতো জটিল ও দূরদর্শী বিজ্ঞানের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা যে একটি জাতির মেধা ও গবেষণার স্পৃহাকে দমিয়ে রাখতে পারে না, বরং দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশকে ত্বরান্বিত করে, ইরানের এই সাফল্য তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ। সিলিকন কম্পিউটিংয়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে যখন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বায়োকম্পিউটিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, তখন ইরানের এই ১০ লক্ষ গুণ জ্বালানি সাশ্রয়ী কৃত্রিম মস্তিষ্কের প্রোটোটাইপ মানব ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। তবে এই অভাবনীয় অগ্রগতির পাশাপাশি চেতনা ও নৈতিকতার যে জটিল প্রশ্নগুলো বিজ্ঞান সমাজকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তার সঠিক সমাধানও এই বিজ্ঞানীদেরই করতে হবে। সব মিলিয়ে, মিসাইল থেকে অরগানয়েড ইন্টেলিজেন্সের এই রূপান্তর ইরানের কেবল একটি বৈজ্ঞানিক জয় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক বিজ্ঞান মঞ্চে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক নীরব ও অত্যন্ত শক্তিশালী ঘোষণা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
১১ জুলাই ২০২৬