
১
মীরাবাঈ
হেইলা দুইলা হেইলা দরবার নাচায়
ঝাকানাকা ঝাকানাকা ঝাকানাকা দেহ দোলা না
মারজুক রাসেলের লেখা জেমসের কন্ঠে এই গানটা শুনে ভাবতাম কে এই মীরাবাঈ! বাংলা অভিধানে বাঈ শব্দের দুটি অর্থ দেওয়া আছে, একটি হলো পশ্চিম ভারতের মহিলাদের সম্মান সূচক শব্দ আর অন্যটি হলো পেশাদার নৃত্যগীতকারিণী। গানের লিরিকস-এর সাথে যেহেতু দ্বিতীয় অর্থটিই সামঞ্জস্যপূর্ণ তাই গানের মীরাবাঈকে একজন নৃত্যশিল্পী ভাবা যেতেই পারে। বাঈ’রা রাজা-বাদশা-নবাবদের আমলে নিজগৃহে আসর বসিয়ে অথবা নবাব, নৃপতি, রাজা, মহারাজা, জমিদার, আমলাবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে, মহফিল-দরবারে, ঘরোয়া অনুষ্ঠানে, আসরে, রঙমহলে, বাগানবাড়িতে, প্রমোদবিহারে আমন্ত্রিত হয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নৃত্যগীত পরিবেশন করতেন।
২
ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায় যে, ঢাকায় বাঈজীদের নাচগান শুরু হয় মুঘল আমলে। খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলায়, বিশেষ করে কলকাতায় বাঈজীদের আগমন ঘটতে থাকে। বাঈজীদের নাচ-গানের আসরকে মুজরা বলা হয়, আবার তাকে মেহফিল বা মাহফেলও বলা হয়। কোন কোন বাঈজী রাজা- মহারাজা- নবাবদের দরবার থেকে নিয়মিত মাসিক বেতন পেতেন। বাঈজীদের নাচ-গানে মোহগ্রস্ত হবার কারণে কোন কোন নবাব-রাজা-মহারাজা বা ধনাঢ্য ব্যক্তির পারিবারিক ও আর্থিক জীবনে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিলো। উনিশ শতকে ঢাকার নবাব নুসরাত জং, নবাব শামসুদ্দৌলা, নবাব কমরুদ্দৌলা এবং নবাব আবদুল গণি ও নবাব আহসানুল্লাহর সময় বাঈজীদের নাচ-গানের আসর বৃদ্ধি পায়। তারা আহসান মঞ্জিল-এর রংমহল, শাহবাগের ইশরাত মঞ্জিল, দিলকুশার বাগানবাড়িতে নৃত্য-গীত পরিবেশন করতেন। ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে যেসব বাঈজী খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাদের মধ্যে লখনৌর প্রখ্যাত গায়ক ও তবলাবাদক মিঠন খানের নাতি সাপান খানের স্ত্রী সুপনজান, মুশতারী বাঈ, এলাহীজান, পিয়ারীবাঈ, হীরাবাঈ, ওয়ামুবাঈ, আবেদী বাঈ, আন্নু নান্নু ও নওয়াবীন বাঈ উল্লেখযোগ্য। ঢাকার অন্যান্য খ্যাতিমান বাঈজীদের মধ্যে ছিলেন বাতানী, জামুরাদ, পান্না, হিমানী, আমিরজান, রাজলক্ষ্মী, কানী, আবছন, মালকাজান বুলবুলি, মালকাজান আগরওয়ালী, জানকীবাঈ, গহরজান, জদ্দনবাঈ, হরিমতী প্রমুখ। সেকালের এতো সব বিখ্যাত বাঈদের মধ্যে মীরা বাঈ এর নাম খুঁজে না পেয়ে বরং অবাক হলাম। জেমসের গানের দেহ দোলানো এই বিখ্যাত মীরা বাঈ তাহলে কে? সম্ভবত লেখকের কল্পনা। তবে ইতিহাসের পাতা উজ্জ্বল করে আছেন আরেক মীরা বাঈ! তার কথাই বলি।
৩
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দু’জন নারীকে ভয়ানকভাবে পাগল করেছিলেন। তাদের একজন হলেন পদ্মাবতী আর অন্যজন হলেন রাজস্থানের মীরাবাঈ। এই পদ্মাবতী কিন্তু কবি আলাওলের পদ্মাবতী নন, ইনি হলেন বাংলার রাধা অর্থাৎ কবি জয়দেব (লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম) এর স্ত্রী পদ্মাবতী, তার কথা এর আগের একটা লেখায় উল্লেখ করেছি। মীরাবাঈ ছিলেন একজন রাজপুত রাজকুমারী।
মীরা বাঈ-এর জন্ম ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে রাজস্থানের নাগৌর জেলার অন্তঃপাতী মেরতার কাছেই কুদকি নামে একটি ছোট গ্রামে। তার বাবা রতন সিংহ রাঠোর। তার বয়স যখন তিন বছর তখন একদিন এক সাধু তাদের বাড়িতে আসেন এবং মীরাবাঈকে শ্রীকৃষ্ণের একটি পুতুল দিলেন। তার বাবা মনে করলেন মীরাবাঈ কৃষ্ণের পূজা করতে পারবে না, তাই তাকে পুতুলটি দেয়া ঠিক হবে না। কিন্তু মীরাবাঈ কৃষ্ণের পুতুলটি পাওয়ার জন্য শক্ত বায়না ধরলো। এমনকি সে খাওয়া-ধাওয়া বন্ধ করে দিলো। এভাবে এক সময় শ্রী কৃষ্ণের প্রেমে পড়ে যায় মীরাবাঈ। সে শয়নে-স্বপনে কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর হয়ে কৃষ্ণকে সারাজীবনের বন্ধু বানিয়ে ফেললো। একদিন সে দেখলো তার বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে বিয়ের বর-কনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছোট্ট মীরাবাঈ দৌড়ে তার মা’কে জিজ্ঞাসা করলো যে তার স্বামী কে হবে? কৃষ্ণের প্রতি মেয়ের ভক্তি দেখে তার মা বললেন যে, কৃষ্ণই হবে তার স্বামী। সেই থেকে কৃষ্ণের পূজায় নিজেকে নিবেদিত করে দিলেন তিনি। তার মা তার এই ধর্মভাবের সমর্থক ছিলেন।
পিতামহের আশ্রয়ে প্রতিপালিত মীরা ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছিলেন। তাই শৈশবেই, আট বছর বয়েসে মীরার বিয়ে হয়েছিলো মেওয়ারের রাজার সঙ্গে, সে বিয়ে অবশ্য টেকেনি। আঠারো বছর বয়সে মীরা’র আবার বিয়ে হয় চিতোর-রাজ রানা সঙ্গার জ্যেষ্ঠ পুত্র ভোজ রাজের সাথে।
৪
কৃষ্ণপ্রেমে মত্ততা মীরার একান্তই ব্যক্তিগত বিষয় হলেও কখনও কখনও এই মত্ততা নিয়ে তাকে শহরের অলি-গলিতে নাচতে হয়েছিলো। তার দেবর ও চিতোরগড়ের নতুন শাসক বিক্রমাদিত্য ছিলেন দুষ্ট প্রকৃতির। মীরা'র খ্যাতি, সাধারণ ব্যক্তিদের সাথে তার মেলামেশা এবং নারী হিসেবে লজ্জাশীলতা না থাকায় কয়েকবার বিক্রমাদিত্য তাকে বিষ মিশিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিলো। এছাড়াও, তার ননদ উদাবাঈ মীরা'র সম্বন্ধে বিভিন্ন দূর্নাম রটাতে থাকেন। একদিন সে অপপ্রচার চালায় যে, মীরাবাঈ বিভিন্ন পরপুরুষকে ঘরে নিয়ে আসেন। এতে মীরাবাঈর স্বামী রাগান্বিত হয়ে তরবারি নিয়ে তার ঘরে ঢুকেন। তখন তিনি দেখতে পান কোনো পুরুষ নয়, বরং শ্রীকৃষ্ণের একটি পুতুল নিয়ে মীরাবাঈ খেলা করছেন। সেদিন থেকে সমালোচনা প্রশংসা দুটিই মীরাবাঈর সঙ্গী হয়ে যায়। ধীরে ধীরে মীরাবাঈর কৃষ্ণভক্তি ও ভজন সংগীতের প্রশংসা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় তার সেই ভজন সংগীতের প্রেমে পড়ে যান মোগল সম্রাট আকবর। কিন্তু মীরাবাঈর পরিবারের সঙ্গে আকবরের চরম শত্রুতা। তাই তিনি তানসেনকে সঙ্গে নিয়ে ছদ্মবেশে মীরাবাঈর বাড়িতে যান। তার ভজন সংগীত শুনে তিনি মীরাবাঈর চরণে এক অমূল্য মালা উপহার দেন। একজন মুসলমানের কাছ থেকে এমন উপহার নেয়ায় তাকে আত্মহত্যা করার কথা বলেন তার স্বামী। স্বামীর আদেশ পালন করতে মীরাবাঈ নদীতে ঝাঁপ দিতে যান। এমন সময় তিনি বুঝতে পারেন যে, কৃষ্ণ তার কাছে এসে আত্মহত্যা না করতে বলছেন। কৃষ্ণের নির্দেশে তিনি বৃন্দাবনে চলে যান এবং কৃষ্ণের পূজা করতে থাকেন। এক সময় তার স্বামী নিজের ভুল বুঝতে পেরে মীরাবাঈকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। ১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের সাথে এক যুদ্ধে মীরার স্বামী ভোজ রাজ নিহত হন। ২০ বছর বয়সে মায়ের মৃত্যুর পর এটি ছিলো ধারাবাহিক শোকের আরও একটি অধ্যায়। তিনি মনে করলেন, জগতে ভালবাসা-প্রেম-আবেগ সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। এই সুযোগে সতীদাহ প্রথার অজুহাতে তার শ্বশুর চিতায় পুড়ে মরার জন্য মীরাবাঈকে আদেশ করেন। কিন্তু তিনি জানালেন, তিনি চিতায় পুড়ে মরতে পারবেন না। কারণ তার প্রকৃত স্বামী শ্রী কৃষ্ণ। যিনি কখনো মরতে পারেন না।
কিছুদিন পর মীরা গুরু হিসেবে রবিদাসের নাম ঘোষণা করেন এবং বৃন্দাবনে কৃষ্ণনাম করতে করতে চলে যান। তিনি মনে করতেন যে, তিনি পূর্বজন্মে গোপী হিসেবে ললিতা নামে কৃষ্ণপ্রেমে পাগল ছিলেন। মীরা'র অভিমত, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র পরম পুরুষ হচ্ছেন প্রভু শ্রীকৃষ্ণ। তিনি সন্ন্যাসব্রত অব্যাহত রাখলেন এবং নৃত্যগীত সহ উত্তর ভারতের বিভিন্ন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এই মীরা নাচতেন, তবে তা কোন দরবারে না, পথে-প্রান্তরে।
৫
তিনি হিন্দু অতিন্দ্রীয়বাদী সংগীতশিল্পী ও সহজিয়া (অসাম্প্রদায়িক) কৃষ্ণভক্ত। তিনি বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের সন্ত ধারার প্রধান ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। মীরা'র গানগুলো সাধারণ ধারারই পদ, শ্লোক বা চরণ যা আধ্যাত্মিক গানেরই অংশবিশেষ। পদগুলো একত্রিত হয়ে "মীরা'র পদাবলী" বা মীরা'র ভজন নাম ধারণ করে। বর্তমানে প্রচলিত অনুবাদগুলো রাজস্থানী ভাষায় এবং কৃষ্ণের জন্মভূমি বৃন্দাবনে হিন্দীতে ব্রজ ভাষায় ব্যাপক হারে উচ্চারিত হচ্ছে। পদগুলোর কিছু কিছু আবার রাজস্থানী এবং গুজরাটি, উভয় ভাষায়ই লিখিত। তিনি বারোশো থেকে তেরোশো ভজন রচনা করেছিলেন, যেমন-
“হে কৃষ্ণ, তুমি আমাকে তোমার দাসী কর।
তোমার দাসী হিসেবে আমি একটি বাগান করবো এবং তোমাকে নিত্য দেখবো।
বৃন্দাবনের কুঞ্জবনে ও পথে আমি তোমার মহিমা গানের মাধ্যমে প্রচার করবো।”
তার এই গানগুলি একসময় সারা ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ভক্তিবাদী ধারায় রচিত এই গানগুলির মাধ্যমে তিনি কৃষ্ণের প্রতি তার প্রেম ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি লিখলেন-
মীরা নাচছে
পায়ে ঘুঙুর পরে
লোকে বলছে মীরা পাগল হয়ে গিয়েছে।
৬
১৫৪৬ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের দ্বারকায় মীরাবাঈয়ের মৃত্যু হয়।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচ এস, ঢাকা
১৬ আগস্ট ২০২৬
তথ্যসূত্র:
১। মীরাবাঈ- স্বামী ভূমানন্দ
২। ভজন ও ভক্তিগীতি মালিকা- মীরাবাঈ
৩। ইন্টারনেট