
১
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভূদৃশ্যে উদীয়মান জেন-জি প্রজননের আপসহীন বিপ্লব ক্ষমতার ভিত কাঁপানোর পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনেও এক নজিরবিহীন মনস্তাত্ত্বিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় অনুদান, কর্পোরেট স্পন্সরশিপ আর নিরাপত্তার বলয়ে আবদ্ধ থাকা শিল্পীরা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজপথের ধুলোবালিতে নেমে আসেন, তখন তা কেবল রাজনৈতিক অবস্থান বদল থাকে না, হয়ে ওঠে আত্মোপলব্ধির চরম পরীক্ষা। শ্রীলঙ্কার 'আরাগালয়া', বাংলাদেশের 'জুলাই বিপ্লব', নেপালের 'দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন' এবং ভারতের 'জেন-জি আন্দোলন'—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রথাগত সুবিধাবাদের তোষামোদকারী গোত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিছু সংবেদনশীল মানুষ গণমানুষের প্রকৃত কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তারকাখ্যাতির অহং কাটিয়ে সাধারণ নাগরিকের কাতারে এসে দাঁড়ানোর এই স্পর্ধা মূলত জেন-জিদের নির্ভীক আত্মত্যাগের সাথেই শিল্পীমনের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন। ফলে, চার দেশের রাজপথেই এই যৌথ প্রতিবাদ কেবল দাবি আদায়ের সংগ্রাম থাকেনি, তা রূপ নিয়েছে এক কালজয়ী নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে।
২
শিল্পীমন ও জেন-জি সংমিশ্রণ: মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও গণআন্দোলনে কালচারাল ক্যাটালিস্ট।
শিল্পীর মৌলিক অস্তিত্ব গড়ে ওঠে সৌন্দর্যবোধ, মানবিক সংবেদনশীলতা এবং প্রকাশের অদম্য স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে, জেন-জি বিপ্লব মূলত অন্যায়, স্বৈরাচার, দুর্নীতি এবং ডিজিটাল সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে এক আপসহীন বিদ্রোহ। ছাত্র-জনতা বা জেন-জি’র এই রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের উপস্থিতি কেবল ভিড় বাড়ায় না; তা আন্দোলনকে কেবল ‘দাবি আদায়ের লড়াই’ থেকে এক ‘সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে’ রূপান্তরিত করে। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনে একাধিক গভীর ও গুণগত মাত্রা তৈরি করে। কেননা রাজনৈতিক নেতাদের আহ্বানে জনগণের মধ্যে যে দ্বিধা থাকে, সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী জনপ্রিয় ব্যক্তিদের রাজপথে দেখে তা কেটে যায়। এতে রাষ্ট্রীয় ভয়ভীতি ভেঙে পড়ে এবং আন্দোলন সাধারণ সর্বস্তরের মানুষের কাছে নৈতিক ও আত্মিক বৈধতা পায়।
শুষ্ক রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে কবিদের কবিতা, গায়কের গান, শিল্পীর পোস্টার আর্ট কিংবা অভিনেতার পারফরম্যান্স আন্দোলনকে তীব্র আবেগী ও নান্দনিক মাত্রা দেয় (যেমন: র্যাপ গান, ফ্ল্যাশ মব কিংবা থিয়েটার) । এটি জনমানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও মানসিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে। এছাড়াও রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে শিল্পীদের সৃষ্ট গান, চিত্রকর্ম ও সাহিত্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আন্দোলনের প্রকৃত স্পিরিট বা চেতনাকে দীর্ঘস্থায়ী দলিল হিসেবে পৌঁছে দেয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে ‘জুলাই বিপ্লব’ এর দেয়ালচিত্র বা গ্রাফিতির সংকলন ‘দ্য আর্ট অব ট্রায়াম্ফ’এর কথা বলা যেতে পারে।
ক। আত্মদহন ও প্রথাগত মোহভঙ্গ।
দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, অ্যাওয়ার্ডের লোভ বা বাণিজ্যিক সফলতার তাগিদে বহু জনপ্রিয় শিল্পীকে এক ধরনের কমফোর্ট জোনে নীরব থাকতে দেখা যায়। কিন্তু রাজপথে যখন নিজ দেশের তরুণদের রক্ত ঝরে বা ন্যায়সংগত অধিকার সুকৌশলে হরণ করা হয়, তখন শিল্পীমনে সৃষ্টি হয় এক প্রচ্ছন্ন আত্মদহন ও প্রকাণ্ড মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব—‘অপরাধবোধ বনাম নৈতিক দায়বদ্ধতা’। জেন-জিদের নির্ভীক স্পর্ধা ও আত্মত্যাগ প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের সুপ্ত মানবিক মূল্যবোধকে নাড়া দেয়। এই মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাই প্রথাগত ক্ষমতার মোহভঙ্গ ঘটিয়ে শিল্পীকে ক্ষমতার আনুপূর্বিক ছায়া থেকে বের করে জনতার প্রতিবাদের মূলস্রোতে টেনে আনে।
খ। জনমানস ও তারকাখ্যাতির সংঘাত থেকে নাগরিকে উত্তরণ।
তারকাদের জন্য রাজপথে নামার অর্থ মোটেও সহজ নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিশ্চিত বাণিজ্যিক ঝুঁকি, কাজ হারানোর ভয়, রাষ্ট্রীয় আইনি নিপীড়ন কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হারানোর ভয়াবহ আশঙ্কা। কিন্তু যখন তরুণের জীবন বা দেশের সার্বিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন শিল্পীমনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে এক মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে। স্পটলাইটের কৃত্রিম আলো, এসি ঘরের নিরাপত্তা আর সেলিব্রিটি ইমেজের মোহ কাটিয়ে যখন তারা রাজপথের ধুলোবালিতে নামেন, তখন ‘তারকা’ পরিচয়ের চেয়ে ‘ক্ষুব্ধ নাগরিক’ পরিচয়টি প্রধান হয়ে ওঠে। এই রূপান্তর কেবল আন্দোলনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে না; বরং তা শিল্পীর নিজের মনোজগতেও এক পরম মানসিক মুক্তি এবং শিল্পের প্রতি সৎ থাকার অনাবিল আত্মতৃপ্তি এনে দেয়।
৩
দক্ষিণ এশিয়ার রাজপথে শিল্পীদের উপস্থিতি: চার দেশের চিত্রলেখ।
দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশে জেন-জি আন্দোলন কেবল রাজনীতিকদের মাধ্যমে চালিত হয়নি; কবি, শিল্পী, গায়ক ও লেখকদের কণ্ঠস্বর একে দিয়েছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও নৈতিক শক্তি। তবে যেকোনো তীব্র জাতীয় সংকটে শিল্পী সমাজের প্রতিক্রিয়া কখনো একরকম হয় না। একটি বড় অংশ বরাবরই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। রাষ্ট্রীয় সুবিধা, অনুদান, পদক ও পদ-পদবীর মোহে অন্ধ হয়ে এই সুবিধাবাদী শ্রেণীটি অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরবতা পালন করে, অথবা সুকৌশলে রাষ্ট্রযন্ত্রের তোষামোদে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু এই তোষামোদকারী গোষ্ঠীর বিপরীতে সংখ্যায় কম হলেও কিছু মানুষ প্রমাণ করেন যে তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের দাস নন; তারা গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত প্রতীক। সময়ের কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের মান-মর্যাদা ও শিল্পীর সততা অক্ষুণ্ণ রেখে তারা রাজপথে নেমেছিলেন কিংবা সোচ্চার হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
ক। শ্রীলঙ্কা: 'আরাগালয়া' ও শিল্পীদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ (২০২২)
শ্রীলঙ্কার তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে যখন 'আরাগালয়া' (জনগণের সংগ্রাম) গড়ে ওঠে, তখন কোলম্বোর গ্যালে ফেস গ্রিনের 'গোটা গো গামা' (Gota Go Gama) হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতি চর্চার প্রাণকেন্দ্র।
(১) সংগীত ও নাটক: অভিনেত্রী ও গায়িকা দিনুপা কোডাগোডা (Dinupa Kodagoda) এবং সংগীতশিল্পী আসঙ্কা সেনাদীরা (Asanka Senadheera) প্রতিদিন রাজপথে সরাসরি গান গেয়ে আন্দোলনকারীদের চাঙ্গা রাখেন। প্রখ্যাত থিয়েটার ব্যক্তিত্ব জ্যোরম ডি সিলভা (Jerome de Silva) রাজপথেই থিয়েটার কর্মশালার মাধ্যমে তরুণদের প্রতিবাদকে শিল্পে রূপ দেন।
(২) ভিজ্যুয়াল আর্ট: ডিজিটাল শিল্পী মার্কো মানামপেরি (Marco Manamperi) পপ ও দাদা-আর্টের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজপথে সরকারের ব্যর্থতার গ্রাফিকাল প্রতিবাদ তুলে ধরেন।
খ। বাংলাদেশ: জুলাই বিপ্লব ও 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ' (২০২৪) ।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জেন-জি বিপ্লব রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক ইতিহাস রচনা করে। এই আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট ও সুবিধাবাদী একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মী যখন ক্ষমতার তোষামোদে ব্যস্ত থেকে ছাত্রদের ওপর চালিত হিংস্রতাকে আড়াল করতে চেয়েছিল, ঠিক তখনই প্রথাগত সুবিধাবাদের বলয় ভেঙে জনমানুষের পালস বুঝতে পারা শিল্পীরা রাজপথে নামেন।
(১) দৃশ্যমাধ্যম ও থিয়েটার: আজমেরী হক বাঁধন, মোশাররফ করিম, সিয়াম আহমেদ, জাকিয়া বারী মম, সাবিলা নূর এবং তসনিয়া ফারিণ 'দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী সমাজ'-এর ব্যানারে ধানমন্ডি ও ফার্মগেটের রাজপথে সরাসরি নেমে আসেন। প্রবীণ নাট্যজন মামুনুর রশীদ, আজাদ আবুল কালাম এবং তারিক আনাম খান তরুণদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
(২) সংগীত ও প্রতিবাদী সুর: গায়িকা ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান ও কৃষ্ণকলি রাজপথে গিয়ে প্রতিবাদী গান গেয়েছেন। গায়ক আসিফ আকবর, সুরকার প্রিন্স মাহমুদ, লতিফুল ইসলাম শিবলী এবং তরুণ র্যাপার হান্নান হোসাইন শিমুল ('আওয়াজ উডা' খ্যাত) গণজোয়ারের মূল মানসিক রসদ জোগান।
(৩) নির্মাতা ও সাহিত্যিক: চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, আশফাক নিপুণ, কবি মোহন রায়হান, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, সালমান হাবীব, আন্তর্জাতিক চিত্রগ্রাহক শহিদুল আলম প্রমুখ ব্যক্তিগণ নিরবচ্ছিন্নভাবে রাজপথে ও ডিজিটাল মাধ্যমে গণমানুষের প্রতিনিধি হয়ে গর্জে ওঠেন।
গ। নেপাল: দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ও জেন-জি সংহতি (২০২৫) ।
২০২৫ সালে নেপালে দুর্নীতি, সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা এবং সুশাসনের দাবিতে যখন জেন-জিদের আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়, তখন কাঠমান্ডুর 'মাইতিঘর মন্ডলা'-য় দেশের প্রবীণ ও নবীন তারকারা একজোট হন।
(১) প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব: নেপালের অত্যন্ত জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হরিবংশ আচার্য (Haribansha Acharya) এবং মদন কৃষ্ণ শ্রেষ্ঠ (Madan Krishna Shrestha) সামাজিক মাধ্যমে ও রাজপথে প্রকাশ্যে জেন-জিদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন।
(২) চলচ্চিত্র ও সংগীত অঙ্গন: অভিনেতা-নির্মাতা নিশ্চল বাসনেত (Nischal Basnet), জনপ্রিয় গায়ক ও অভিনেতা প্রকাশ সপকোটা (Prakash Saput) (যিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের খাবার ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সাহায্য করেন), অভিনেত্রী কেকি অধিকারী (Keki Adhikari), কারিশমা মানানধর এবং জনপ্রিয় গায়িকা রচনা রিমান (Rachana Rimal) সরাসরি তরুণদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দেন।
ঘ। ভারত: ককরোচ জনতা পার্টি ও জেন-জি সংহতি (জুলাই ২০২৬) ।
দিল্লিতে NEET-UG প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে 'ককরোচ জনতা পার্টি'-র ব্যানারে জেন-জিদের যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেখানেও রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের সুবিধা ভোগ করা একশ্রেণীর প্রতিষ্ঠিত মিডিয়ার বিপরীতে একঝাঁক সৎ ও প্রতিবাদী শিল্পী উঠে আসেন।
(১) রাজপথের প্রতিবাদী মুখ: রাষ্ট্রীয় বলয়ের বাইরে এসে ক্ষমতার মুখোমুখি হতে ভয় পাননি দক্ষিণ ও হিন্দি চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা প্রকাশ রাজ এবং প্রবীণ অভিনেত্রী শাবানা আযমি; তারা সরাসরি দিল্লির যন্তর মন্তরে গিয়ে তরুণদের পাশে বসেন।
(২) সংগীত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ: সমাজকর্মী ও উদ্ভাবক সোনাম ওয়াংচুক আন্দোলনকারীদের নিয়ে অনশন করেন। গায়ক বিশাল দাদলানি, কমেডিয়ান বীর দাস, লেখক ওয়ারুণ গ্রোভার এবং প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ্, রত্না পাঠক শাহ্, জীনাত আমান, সোনাক্ষি সিনহা, রিতেশ দেশমুখ, চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুরাগ কশ্যপ সুবিধাবাদী নিরবতার বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে জেন-জি আন্দোলনের পক্ষে জোরালো কণ্ঠস্বর তোলেন।
৪
শিল্পীমন ও জেন-জি আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা।
ভারতীয় উপমহাদেশের এই চারটি দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেন-জি আন্দোলনের তীব্র ঘাতে শিল্পীদের মনোজগতে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে। তরুণদের রক্ত ও পরম আত্মত্যাগ শিল্পীদের ভেতরের সুপ্ত মানবিক সংবেদনশীলতাকে জাগ্রত করে ‘কালেক্টিভ এমপ্যাথি’ বা সমষ্টিগত সহানুভূতির জন্ম দেয়, যা তাদের বাধ্য করে কমফোর্ট জোনের আইভরি টাওয়ার ছেড়ে রাজপথের ধুলোবালিতে নামতে। এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের দ্বিতীয় ধাপে ক্যারিয়ার হারানোর শঙ্কা কিংবা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ভয়কে জয় করে সর্বাগ্রে স্থান পায় নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই আত্মিক জাগরণ ও মানসিক আন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় একের পর এক কালজয়ী গান, ক্ষুরধার র্যাপ, অনমনীয় কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন, গ্রাফিতি ও স্পর্ধিত পোস্টার আর্ট।
প্রথাগত শুষ্ক রাজনৈতিক ভাষার পরিবর্তে নিজেদের সৃষ্ট শিল্পের এই নতুন মাধ্যমে তারা প্রতিবাদের সংস্কৃতিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন। জেন-জিদের স্পর্ধিত মুখের ভাষায় সুর, শব্দ ও রঙ মিলিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে শিল্পীরা কেবল নিজেদের মানসিক মুক্তিই খোঁজেননি, বরং শিল্পকে রূপান্তরিত করেছেন এক অপরাজেয় সামাজিক প্রতিরোধে। ফলে চার দেশের রাজপথেই তারকার দ্যুতি ছাপিয়ে মূখ্য হয়ে ওঠে শিল্পীর নৈতিক সততা, নাগরিক অবস্থান এবং তার সৃষ্টির অবিনশ্বর প্রতিবাদী সত্তা।
৫
পরিশেষে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক জেন-জি বিপ্লব কেবল চার দেশের ক্ষমতার সমীকরণেই ঝড় তোলেনি, বরং ঝংকৃত করেছে শিল্প ও সাহিত্যের মূল আত্মাকেও। ক্ষমতার তোষামোদকারী ও সুবিধার নেশায় অন্ধ একশ্রেণীর তথাকথিত বুদ্ধিজীবী যখন দমনপীড়নকে আড়াল করতে ব্যস্ত ছিল, তখন হাতগোনা কয়েকজন সাহসী শিল্পীর এই আত্মিক জাগরণ প্রথাগত কমফোর্ট জোনের মোহ এক নিমেষেই ভেঙে দিয়েছে। টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ায় গায়কের গিটার তুলে নেওয়া, কবির মিছিলে শামিল হওয়া কিংবা অভিনেতার কোনো বাণিজ্যিক স্বার্থ ছাড়া জনতার পাশে দাঁড়ানো প্রমাণ করে যে শিল্পীর আসল দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি নয়, গণমানুষের সত্য ও ন্যায়ের প্রতি। এই আন্দোলন চার দেশের প্রবীণ ও নবীন সাংস্কৃতিক কর্মীদের শিখিয়েছে কী করে বাণিজ্যিক ঝুঁকি আর আইনি ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিকে রূপান্তরিত হতে হয়। স্বৈরাচার আর সেন্সরশিপের অন্ধকার কাটিয়ে রাজপথই আজ তাদের সৃষ্টির সবচেয়ে খাঁটি ও জীবন্ত ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। জেন-জিদের স্পর্ধিত স্লোগানকে শিল্পীরা দিয়েছেন অমর নান্দনিক ভাষা, আর বদলে পেয়েছেন নিজ নিজ কেরিয়ারের সবচেয়ে সৎ ও মর্যাদাপূর্ণ নৈতিক স্বীকৃতি। পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় পদক বা বক্স-অফিসের রেকর্ড নয়—জনতার মিছিলে কাঁধ মেলানোর এই মানবিক ক্ষমতাই শিল্পীকে ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর করে রাখে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২২ জুলাই ২০২৬