
১
১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসের প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ইউএস আর্মি প্যাসিফিক' (USARPAC)-এর যৌথ অংশগ্রহণে ১৩ দিনব্যাপী 'এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং-২০২৬'-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে, যা দেশের ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় 'ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড'-এর নাম পরিবর্তন করে পুনরায় 'ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড' (USPACOM) করার পর এটিই বাংলাদেশে প্রথম বড় আকারের যৌথ সামরিক অনুশীলন। মূল কমান্ডের নাম পরিবর্তিত হলেও USPACOM-এর আর্মি সার্ভিস কম্পোনেন্ট 'ইউএস আর্মি প্যাসিফিক' পূর্বের রূপরেখা মেনেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে কৌশলগত সমন্বয় জোরদারে এ মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাইনুর রহমান উপস্থিত থেকে দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে পরাশক্তিগুলোর এশীয় অঞ্চলের সমীকরণ পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির টানটান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টিকে না বুঝে নানা নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা ও গুজব ছড়াতে দেখা যাচ্ছে। যদিও আভিযানিক ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তনের সরাসরি কোনো প্রভাব নেই, তবুও পেন্টাগনের এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর জুলাই মাসেই বাংলাদেশে ইউএস প্যাসিফিক আর্মি কমান্ডের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে নেটিজেন ও বিশ্লেষকদের কৌতূহল বহুগুণ বেড়েছে। বস্তুত, 'ইউএস প্যাসিফিক কমান্ড' নাম পুনর্বহাল করা একটি প্রতীকী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মাত্র, যার সাথে টাইগার লাইটনিং মহড়ার পূর্ব-নির্ধারিত সূচির কোনো কৌশলগত যোগসূত্র নেই। মূলত সন্ত্রাস দমন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক সামরিক কূটনীতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই নিয়মিত এই মহড়াটি আয়োজিত হচ্ছে।
২
এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং।
এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং' হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক আর্মি কমান্ডের (USARPAC) মধ্যকার একটি দ্বিপাক্ষিক যৌথ সামরিক অনুশীলন। এটি মূলত কৌশলগত ও আভিযানিক স্তরের একটি কমান্ড পোস্ট এবং ফিল্ড ট্রেনিং এক্সারসাইজ। এর প্রধান লক্ষ্য হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাস দমন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষায়িত ও অত্যন্ত দক্ষ ফরমেশন 'প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড'-এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই অনুশীলনে দুই দেশের আধুনিক রণকৌশল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়।
ক। কবে থেকে চলছে এই যৌথ মহড়া?
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই দাবি করছেন এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো চুক্তি বা হঠাৎ নেওয়া পদক্ষেপ, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ইতিহাস দীর্ঘদিনের হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত রূপরেখায় 'এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং'-এর আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে ২০১৭ সালে। মার্কিন প্যাসিফিক আর্মি কমান্ডের অফিশিয়াল আর্কাইভ ও বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইএসপিআর-এর বিগত বছরের প্রেস রিলিজের রেফারেন্স অনুযায়ী, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি এবং কাউন্টার-টেররিজম বা সন্ত্রাস দমনের বিশেষ সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে প্রথম এই দ্বিপাক্ষিক অনুশীলনটি আয়োজিত হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর বা নির্দিষ্ট সময়ান্তর পর্যায়ক্রমিকভাবে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যা ২০২৬ সালে এসে তার ধারাবাহিকতায় এক নতুন উচ্চতায় উপনীত হয়েছে।
খ। কোন চুক্তির অধীনে এই এক্সারসাইজ অনুষ্ঠিত হয়?
'এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং' কোনো গোপন চুক্তি বা সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্তির অংশ কি না—এমন গুজব সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ালেও কূটনৈতিক নথিপত্র অনুযায়ী এর কোনো সামরিক জোটবদ্ধতার ভিত্তি নেই। এটি মূলত বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং পূর্ববর্তী পারস্পরিক সমঝোতা স্মারকের আওতায় পরিচালিত একটি নিয়মিত সহযোগিতামূলক অনুশীলন। যদিও মার্কিন প্রস্তাবিত 'অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট' ও 'জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট' নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে, তবুও এই মহড়াটি কেবল দুই দেশের আভিযানিক প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজেই সীমিত। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যুরো অব পলিটিক্যাল-মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের তথ্য বিবরণী নিশ্চিত করে যে, এসব দ্বিপাক্ষিক অনুশীলন সম্পূর্ণভাবে উভয় দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পরিচালিত হয়। এতে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ক্ষুণ্ণ হওয়ার বা কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক ব্লকে জড়িয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে এটি কেবল পেশাদারিত্ব অর্জন, সন্ত্রাস দমন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে যৌথ প্রস্তুতি জোরদার করার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
গ। দেশের কোন কোন এলাকায় এই এক্সারসাইজ চলে?
স্ট্র্যাটেজিক কারণে এই যৌথ সামরিক অনুশীলনের স্থান নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এক্সারসাইজটি সাধারণত বাংলাদেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিশেষায়িত সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে অনুষ্ঠিত হয়। বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবং ২০২৬ সালের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, এই এক্সারসাইজের মূল কেন্দ্রবিন্দু সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসস্থ প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড। এছাড়াও কাউন্টার-টেররিজম এবং জঙ্গল ওয়ারফেয়ারের বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাসের 'বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং' এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এই মহড়ার বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সেশন পরিচালিত হয়ে থাকে।
ঘ। ২০২৬ সালের মহড়ার সাইজ ও ব্যাপ্তি।
২০২৬ সালের 'এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং'-এর কলেবর বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সুবিন্যস্ত ও কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, যা আগামী ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত মোট ১৩ দিনব্যাপী পরিচালিত হচ্ছে। আইএসপিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, এই যৌথ মহড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস আর্মি প্যাসিফিক (USARPAC) ও ওরেগন ন্যাশনাল গার্ড থেকে ৯১ জন সদস্য অংশগ্রহণ করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডসহ বিভিন্ন ফরমেশনের মোট ৯৩ জন সদস্য প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। দুই দেশের মোট ১৮৪ জন বাছাইকৃত সামরিক সদস্যের সমন্বয়ে আয়োজিত এই অনুশীলন উভয় বাহিনীর আভিযানিক সক্ষমতা ও কৌশলগত মেলবন্ধনকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করছে।
ঙ। এক্সারসাইজের মূল উদ্দেশ্য ও কৌশলগত লক্ষ্যসমূহ।
'এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং-২০২৬'-এর মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক আর্মি কমান্ডের মধ্যে কৌশলগত আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পেশাদারিত্বের সমন্বয় ঘটানো।
(১) আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিক রণকৌশল বিনিময়: এই প্রশিক্ষণের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হলো উভয় দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে আভিযানিক সক্ষমতা (Operational Capability) আধুনিকায়ন করা। প্যারা কমান্ডোদের আধুনিক যুদ্ধকৌশল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মিথস্ক্রিয়ায় একটি সুসংহত প্রতিরক্ষামূলক বলয় তৈরি করা এর লক্ষ্য।
(২) সন্ত্রাস দমন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিধান: বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থা দমনে বাংলাদেশ সবসময়ই 'জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করে আসছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মহড়াটি একটি উন্মুক্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি যৌথ অঙ্গীকারের প্রতীক, যা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে।
(৩) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তা জোরদার: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। মহড়ায় মার্কিন ওরেগন ন্যাশনাল গার্ডের অংশগ্রহণ মূলত বেসামরিক-সামরিক সমন্বয় (Civil-Military Operations) এবং দুর্যোগকালীন দ্রুত মানবিক সহায়তা প্রদানের প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
৩
মার্কিন আর্মির অনুরূপ এক্সারসাইজ আর কোন দেশে হয়?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু বাংলাদেশের ওপরই এমন সামরিক মহড়া জোরপূর্বক চাপিয়ে দিচ্ছে বলে ফেসবুকে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অসত্য ও ভ্রান্ত ধারণা। আন্তর্জাতিক সামরিক সম্পর্ক ও কৌশলগত কূটনীতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায়, মার্কিন প্যাসিফিক আর্মি কমান্ড (USARPAC) তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত অঞ্চলে সহযোগী দেশগুলোর সাথে নিয়মিতভাবেই এমন বড় আকারের সামরিক অনুশীলনের আয়োজন করে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের নথি অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি ভারতের সাথে মার্কিন সেনাবাহিনী 'এক্সারসাইজ কোপ ইন্ডিয়া' এবং 'যুদ্ধ অভ্যাস'-এর মতো অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া ফিলিপাইনের নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশের মধ্যে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় তাদের বৃহত্তম বার্ষিক সামরিক অনুশীলন 'এক্সারসাইজ বালিকাটান'। থাইল্যান্ডে প্রতি বছর আয়োজিত হয় এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম বহুজাতিক সামরিক অনুশীলন 'এক্সারসাইজ কোবরা গোল্ড', যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক মিত্র দেশের সাথে মার্কিন নৌবাহিনী নিয়মিতভাবে 'এক্সারসাইজ ক্যারেট' পরিচালনা করে থাকে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, আঞ্চলিক জলসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শরিক দেশগুলোর সামরিক পেশাদারিত্ব বাড়াতে এসব যৌথ উদ্যোগ নিয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমেরিকান আর্মির অনুরূপ মহড়ার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে এটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক সামরিক কূটনীতির নিয়মিত অংশ। এই অনুশীলনগুলোর মূল লক্ষ্যই হলো অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির আদান-প্রদান করা এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে যৌথভাবে সাড়া দেওয়ার দক্ষতা অর্জন করা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশন এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এসব মহড়া প্রতিরক্ষাবাহিনীগুলোর সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে কোনো বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চাপিয়ে দেওয়ার যে গুঞ্জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়, বাস্তব তথ্যের আলোকে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সার্বিকভাবে বলা যায়, বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত এসব যৌথ মহড়া কেবল তাদের সামরিক বন্ধনকেই সুদৃঢ় করে না, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে।
৪
সোশ্যাল মিডিয়ার গুজব, বিভ্রান্তি ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
বর্তমানে বাংলাদেশের ফেসবুক নিউজফিড লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সাধারণ নেটিজেনদের একাংশের মধ্যে বিষয়টি গভীরভাবে না জেনে মন্তব্য করা এবং বিভিন্ন গুজব ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ক। ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ভয় বনাম পেশাদারি সত্য।
অনেকেই না বুঝে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, পেন্টাগনের প্যাসিফিক কমান্ড পুনঃনামকরণ ও কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্যে এ ধরনের মহড়ায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ হয়তো প্রতিবেশীদের সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়' নীতির ওপর ভিত্তি করেই নিজেদের স্বাধীন সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।
খ। তথ্যের অভাব ও প্রোপাগান্ডা।
নেটিজেনদের সার্বভৌমত্বসংক্রান্ত উদ্বেগ স্বাভাবিক হলেও, না জেনে গুজব ছড়ানো কিংবা এই প্রশিক্ষণকে 'সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ' বা 'সামরিক জোটে যোগদান' হিসেবে আখ্যায়িত করা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন। এটি সম্পূর্ণ পেশাদার একটি দ্বিপাক্ষিক অনুশীলন, যা কোনো নির্দিষ্ট সামরিক ব্লকের পক্ষে নয়, বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কৌশলগত দক্ষতা বৃদ্ধির অংশমাত্র।
৫
'এক্সারসাইজ টাইগার লাইটনিং-২০২৬' কেবল দুই দেশের সামরিক বাহিনীর প্যারা কমান্ডোদের যুদ্ধকৌশল প্রদর্শনের ক্ষেত্র নয়, বরং এটি সমসাময়িক জটিল ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও সামরিক কূটনীতির এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্ত হওয়া নানামুখী জনআকাঙ্ক্ষা, উদ্বেগ ও না-বুঝে ছড়ানো আশঙ্কার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা চলে, জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক যৌথ অনুশীলন অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অপরিহার্য। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যেকোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বদ্ধপরিকর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদারদের সাথে সমবেতভাবে কাজ করার যে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, তা প্রশংসার দাবিদার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি প্যাসিফিক ও ওরেগন ন্যাশনাল গার্ড এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডের এই সম্মিলিত প্রয়াস আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে। সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা ও গুজবকে পাশে কাটিয়ে সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সামরিক আধুনিকায়নের এই মেলবন্ধন আগামী ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হয়ে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক কৌশলগত অংশীদারিত্বে এক নতুন সোনালী অধ্যায়ের সূচনা করবে।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২৩ জুলাই ২০২৬