
১
গত কয়েক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সাক্ষর এবং তার অল্প পরেই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের তিনদিনের ঢাকা সফর—একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাংলাদেশ এখন আর কোনো একক পরাশক্তির প্রভাব-বলয়ে আবদ্ধ ছোট রাষ্ট্র নয়। বরং দেশটি পরিণত হয়েছে এমন এক ভূরাজনৈতিক ময়দানে, যেখানে বেইজিং, দিল্লি ও ওয়াশিংটন—তিন পক্ষই নিজেদের প্রভাব সুসংহত করতে চাইছে। এই বিশ্লেষণে দেখা যাক এই ত্রিমুখী টানাপোড়েনের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য পরিণতি কী দাঁড়াতে পারে।
২
সার্জিও গোরের সফর: কাকতালীয়, নাকি পরিকল্পিত?
সার্জিও গোর একই সঙ্গে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ দূত—এই দ্বৈত পরিচয়ই ইঙ্গিত দেয়, ওয়াশিংটন বাংলাদেশ প্রশ্নটিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় কৌশলের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করছে। তার সফরসূচিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক, রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সবশেষে ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে পৃথক আলোচনা—প্রতিটি ধাপই বহুমাত্রিক বার্তা বহন করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরকে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কূটনৈতিক ভাষায় উপস্থাপন করা হলেও, সময়টি লক্ষ করলে বোঝা যায় এটি নিছক রুটিন সফর নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের অব্যবহিত পরেই এই সফর অনুষ্ঠিত হওয়া এবং আলোচ্যসূচিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রসঙ্গ প্রাধান্য পাওয়া—এই দুই বিষয় মিলিয়ে সফরটিকে সম্পূর্ণ কাকতালীয় বলার সুযোগ কম। বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করছে: এটি একদিকে প্রকৃত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের প্রয়াস, অন্যদিকে চীনের ভূ-রাজনৈতিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও তার ভারসাম্য তৈরির একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।
৩
করিডোর-বিতর্ক: বাংলাদেশ কি সত্যিই চীনমুখী হচ্ছে?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর হলো বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব, যা বাস্তবায়িত হলে চীনকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের একটি কৌশলগত পথ এনে দেবে। এর সঙ্গে ২+২ প্রতিরক্ষা-পররাষ্ট্র সংলাপ চালুর ঘোষণা, ব্রিকস ও এসসিওতে যোগদানে চীনা সমর্থনের প্রতিশ্রুতি, এমনকি স্কুল পাঠ্যক্রমে ম্যান্ডারিন অন্তর্ভুক্তির মতো সফট পাওয়ার উদ্যোগ যুক্ত হলে, পৃষ্ঠতলে মনে হতে পারে সম্পর্ক অনেকটাই গভীর হয়ে গেছে।
তবে এই পর্যবেক্ষণকে অতি-সরলীকরণ না করাই ভালো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই স্পষ্ট করেছে যে করিডোর প্রস্তাব এখনও "পরীক্ষাধীন" এবং কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেওয়া হয়নি। ফলে এটিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়া বলার বদলে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্যের কৌশল বলাই যুক্তিসঙ্গত—তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় প্রকল্প হাতছাড়া না হওয়ার তাগিদে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যাওয়ার সতর্কতাও বজায় রাখা হচ্ছে।
৪
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সমীকরণ: অভিন্ন স্বার্থ, নাকি একতরফা এজেন্ডা?
এখানে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা জরুরি।
ক। যেখানে স্বার্থ মিলে যায়।
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের নিরিখে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। বঙ্গোপসাগরে চীনের সম্ভাব্য প্রবেশাধিকার নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে যে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে—এটি পাকিস্তান-চীন করিডোরের মাধ্যমে গোয়াদর বন্দর দিয়ে চীনের আরব সাগরে প্রবেশের অনুরূপ আরেকটি "স্ট্রিং অব পার্লস" কাঠামো তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা—তা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই বিচারে সার্জিও গোর ও ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠককে দুই মিত্র দেশের স্বাভাবিক কৌশলগত সমন্বয় হিসেবেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
এই সমন্বয়ের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত—কোয়াড জোটের কাঠামোয় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের সামুদ্রিক সম্প্রসারণ ঠেকাতে একসঙ্গে কাজ করে আসছে, এবং বাংলাদেশ এখন সেই বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সমীকরণেরই একটি নতুন সংযোজন। বঙ্গোপসাগর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে এটি মালাক্কা প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা বলয়ের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত—ফলে এখানে চীনের অবকাঠামোগত উপস্থিতি দিল্লির জন্য যতটা উদ্বেগের, ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক নৌ-চলাচল ও সরবরাহ-শৃঙ্খল নিরাপত্তার হিসাবেও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা, আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ দমন ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার একই দিকে ধাবিত হয়, যা এই সমন্বয়কে নিছক চীন-বিরোধিতার বাইরে গিয়ে একটি বহুমাত্রিক অংশীদারত্বে রূপ দেয়। এই মিলটি তাই কাকতালীয় নয়, বরং কাঠামোগত ও পূর্বপরিকল্পিত এক কৌশলগত মৈত্রীর স্বাভাবিক প্রতিফলন।
খ। যেখানে প্রশ্ন ওঠে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের আপত্তিটি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তার যুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সংক্রান্ত কোনো আলোচনা যদি দুই বিদেশি রাষ্ট্রদূতের মধ্যে ঢাকার মাটিতে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার শামিল। কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুই মিত্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতদের তৃতীয় কোনো দেশে সাক্ষাৎ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে প্রকৃত উদ্বেগের জায়গাটি হলো স্বচ্ছতার অভাব—আলোচনার বিষয়বস্তু জনসমক্ষে প্রকাশ না হওয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাস্তবে সম্ভবত দুটি ব্যাখ্যাই আংশিক সত্য বহন করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশলগত স্বার্থ এখানে বহুলাংশে ওভারল্যাপ করছে, কিন্তু এটিকে এক তরফা "ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন" বলার চেয়ে দুই মিত্রের পারস্পরিক স্বার্থ-সমন্বয় বলাই বেশি নির্ভুল বিশ্লেষণ। বিশ্লেষকরা এটিকে বাংলাদেশ কোন দিকে ঝুঁকছে তার একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন, একতরফা চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে নয়।
৫
করিডোরের সম্ভাব্য পরিণতি: তিনটি দৃশ্যপট।
আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন করিডোর প্রশ্নে তিন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ক। এগিয়ে যাওয়া: তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় প্রকল্প হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে এবং তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধার আশায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে করিডোরের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের অস্বস্তি বাড়াবে।
খ। ঝুলিয়ে রাখা: ১৯৯০ ও ২০১৯ সালের বিসিআইএম প্রকল্পের ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হয়ে করিডোর প্রস্তাবও কূটনৈতিক চাপের মুখে নীরবে থমকে যেতে পারে, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সম্মিলিত প্রভাব কার্যকর হলে।
গ। ভারসাম্যের কূটনীতি: চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেও করিডোরে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা—যা বর্তমান সরকারের আচরণের (একদিকে চীন সফর, অন্যদিকে মার্কিন দূতকে স্বাগত জানানো) সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয়।
৬
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র চার মাস হলো, ফলে এই মুহূর্তে কোনো একমুখী সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে। প্রকৃতপক্ষে যা ঘটছে তা একটি দীর্ঘমেয়াদি ত্রিমুখী—চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র—প্রভাব-প্রতিযোগিতার সূচনা মাত্র, যার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও নিরাপত্তা স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে তার ওপর।
বাংলাদেশ আজ এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে সুযোগ ও ঝুঁকি একসঙ্গে বিদ্যমান। বৃহৎ শক্তিগুলোর মনোযোগ ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার সম্ভাবনা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি ভুল পদক্ষেপে কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির শঙ্কাও প্রকট। আগামী কয়েক মাসের কূটনৈতিক পদক্ষেপই নির্ধারণ করে দেবে বাংলাদেশ এই ত্রিমুখী দাবার বোর্ডে কোন পথ বেছে নেয়—কোনো একপক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়া, নাকি প্রকৃত অর্থে অ-জোট নিরপেক্ষ ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করা।
-----------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২ আগস্ট ২০২৬