
বইয়ের নামঃ রাখাল
লেখকের নামঃ লতিফুল ইসলাম শিবলী
১
পুরো নব্বই এর দশক জুড়ে 'তুমি আমার প্রথম সকাল', 'আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি', 'হাসতে দেখো গাইতে দেখো' এরকম অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা গীতিকবি লতিফুল ইসলাম শিবলীকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। তিনি আপন আলোয় আলোকিত। লেখক 2017 সাল থেকে প্রতিবছর একুশে বইমেলায় আমাদের জন্য একটা করে বেস্টসেলার উপন্যাস উপহার দিচ্ছেন। আলোচ্য 'রাখাল' উপন্যাসটি এবছর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে।
উপন্যাসের স্থান-কাল-পাত্র-গল্প নির্বাচনে লেখক বরাবরই মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, 'রাখাল' এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। গল্পের পটভূমি উনিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে ব্রিটিশ ভারতের বাংলা ও বিহার সীমান্তবর্তী তরাই অঞ্চল। এ সময়টায় রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে বাংলায় হিন্দু ধর্মের সংস্কার আন্দোলন চলছিলো। তার পক্ষে ছিলো কলকাতার হিন্দু কলেজের অধ্যাপক হেনরি লুই ডিরোজিও'র অনুরাগী সংস্কারমুক্ত 'ইয়ং বেঙ্গল' নামের ছাত্ররা।গভর্নর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং নিজেও এ সময় সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির পদক্ষেপ নিতে চলছেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী হিন্দুরা ছিলেন সোচ্চার। ধর্মান্ধ গোঁড়া হিন্দুদের শক্তিশালী সংগঠন 'ধর্ম সভা', যার নেতৃত্বে ছিলেন রাজা রাধাকান্ত দেব, তিনি সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তির বিপক্ষে। এরকম একটা টালমাটাল সময়ে তরাই পরগনার জমিদার রামদেব ঘোষালের মৃত্যুর কারণে তার স্ত্রী পূর্বা দেবীকে ছোট ভাই বাসুদেব ঘোষালের চক্রান্তে চিতায় ওঠানোর প্রচেষ্টা, দাসী কুন্তী ও বাথানের রাখাল হিসেবে কর্মরত এক রহস্যময় পুরুষের সহায়তায় তার পলায়ন এবং মাধব চন্দ্র নামে এক উদারপন্থী যুবকের বুকে আশ্রয় লাভ, এই নিয়ে গল্পের বিস্তৃতি ঘটেছে। সতীদাহ প্রথার নির্মমতা লেখকের গল্পের বুননে চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে।
২
লেখকের সব উপন্যাসেই একজন রহস্যময় পুরুষের অস্তিত্ব থাকে, এই উপন্যাসের রহস্যময় পুরুষ 'রাখাল'কে নিয়েই উপন্যাসের নামকরণ। বলতে গেলে লেখকের মেধা ও শ্রম, পুরোটাই দখল করেছে বিবাগী ঘরানার এই চরিত্রটি। পূর্বা দেবীকে পালাতে সাহায্য করে এবং কিছু দিন লুকিয়ে রেখে রাখাল নিঃসন্দেহে একটা সাহসী কাজ করেছে, কিন্তু ঘটনার সময়-কাল- প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পূর্বা দেবীকে বিয়ে করে অসমসাহসী কাজটি আসলে করেছেন মাধব চন্দ্র। এক্ষেত্রে উপন্যাসটির নামকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে আমি খানিকটা দ্বিধান্বিত। তবে আমি নিশ্চিত লেখকের কাছে এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
উপন্যাসে গল্পের বিস্তৃতি ঘটাতে গিয়ে লেখক হাজী শরিয়ত উল্লাহ'র ফরায়েজি আন্দোলন এবং ঠগী সর্দার বাহরাম ও ঠগীদের প্রসংগ টেনেছেন। তবে আমার কাছে এই দুটো প্রসংগ আরোপিত বলে মনেহয়েছে। ওগুলো ছাড়াই গল্পটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারতো, ঘটনার অতিরঞ্জিত ঘনঘটা অনেক সময় বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু সতীদাহ প্রথার প্রেক্ষাপটেই এটি একটি সুখপাঠ্য উপন্যাস, যা লেখার গুনে একনাগাড়ে পড়ে শেষ করা যায়। আমার ঘন্টা দেড়েক লেগেছে।
৩
লেখক তাঁর প্রথম উপন্যাস 'দারবিশ' এবং তৃতীয় উপন্যাস 'আসমান' লিখে নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন সে বিবেচনায় 'রাখাল' আরো ভালো হতে পারতো। তবে এটি তার লেখা 'দখল' এরচেয়ে অনেক ভালো মানের উপন্যাস। বরাবরের মতো চমৎকার প্রচ্ছদ, ঝকঝকে প্রিন্টিং এবং সুন্দর বাঁধুনির এই উপন্যাসটি পাঠকের বইএর তাক সমৃদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে।
শুভ কামনা নিরন্তর।
সুমন সুবহান
প্রকাশকঃ নালন্দা
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০২০
মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ১৪১
গ্রন্থের প্রকৃতিঃ উপন্যাস
প্রচ্ছদঃ মাজহারুল ইসলাম শুভ