
বইয়ের নাম: আলথুসার
লেখক: মাসরুর আরেফিন
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২০
তৃতীয় মুদ্রণ: নভেম্বর ২০২৩
মুদ্রিত মূল্য: ৭৫০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৩৪৪
সাইজ: ডেমি সাইজের হার্ড কভার বই
গ্রন্থের প্রকৃতি: সমকালীন উপন্যাস
প্রচ্ছদ: সেলিম আহমেদ
১
লেখক মাসরুর আরেফিন এর ‘আগস্ট আবছায়া’ (২০১৯), ‘আড়িয়াল খাঁ’ (২০২২) এবং ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ (২০২৩) উপন্যাস পড়েছি। প্রথম উপন্যাস দুটি ভালো লেগেছিল বলে ইতিপুর্বে রিভিউ করেছিলাম। তৃতীয়টার ভাষা একটু বেশি খটমটে টাইপের ছিল। ‘আলথুসার’ (২০২০) উপন্যাসের ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত তৃতীয় সংস্করণটা পড়লাম। বই পড়ার সুদীর্ঘ তালিকার চাপে এই উপন্যাসটা কেনার পর অনেকদিন পাঠতালিকায় অপেক্ষমাণ ছিল। রিভিউ এর শুরুতেই একটা কথা বলে রাখি, ‘আলথুসার’ উপন্যাসের পাতায় চোখ রাখার আগে পাঠকের ফরাসি মার্ক্সবাদী দার্শনিক লুই আলথুসার এবং ২০১৮ সালের অক্টোবরে লন্ডনে ‘ডিক্লারেশন অভ রেবেলিওন’ ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হওয়া 'এক্সটিংকশন রেবেলিওন বা XR' আন্দোলন সম্পর্কে খানিকটা ধারণা থাকলে বই পড়ার সুখ ঠিকঠাক অনুভব করা সম্ভব। এর কারণ, এই উপন্যাসে লেখক ঘটনার প্রেক্ষাপট হিসেবে বেছে নিয়েছেন ২০১৯ সালের এপ্রিলে লন্ডনে XR আন্দোলনের ঘটনা। সে দিনগুলোয় লন্ডনের প্রধান প্রধান মোড় ও সেতু (যেমন- অক্সফোর্ড সার্কাস, ওয়াটারলু ব্রিজ ও মার্বেল আর্চ) অবরোধ করে এই সংগঠনের হাজার হাজার কর্মী তাঁবু খাটিয়ে দিনরাত অবস্থান নেন, ফলে লন্ডনের পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। আন্দোলনের এই প্রেক্ষাপট এবং ফ্রানৎস কাফকার অনুবাদক হিসেবে লেখকের যে বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি রয়েছে, তার সরাসরি ছায়া এই উপন্যাসে দেখা যায়।
লেখক ‘আগস্ট আবছায়া’ এবং ‘আড়িয়াল খাঁ’ বই দুটোতেও রাজনীতির ইতিহাস ও মানুষের চরিত্রের ভেতরের অস্তিত্ব সংকট দেখেছেন, কিন্তু ‘আলথুসার’ উপন্যাসে এসে তিনি রাজনৈতিক তত্ত্ব ও সমকালীন সক্রিয়তাকে যেভাবে এক সুতোয় বেঁধেছেন তা এককথায় অসাধারণ। বরাবরের মতো প্রচলিত স্বাচ্ছন্দ্যময় গদ্যের বাইরে গিয়ে তিনি দীর্ঘ, অনুচ্ছেদসম বাক্য ও জটিল শব্দচয়ন ব্যবহার করেছেন; যা অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ থাকলেও গভীর মনস্তাত্ত্বিক অভিনিবেশের ভেতর দিয়ে নিয়ে যায়। এই উপন্যাসে আলথুসারের দর্শন শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় আবদ্ধ থাকেনি, তা লন্ডনের XR আন্দোলনের বাস্তবতায় এসে মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও অস্তিত্বের প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। দেশ-কাল- পাত্রভেদে শাসক আর শোষিতের চেহারা যে চিরকাল একইরকম, সে কথাটি স্পষ্ট করতেই লেখক গল্পের মূল আখ্যানকে লন্ডনের উত্তপ্ত রাজপথ থেকে এক টানে নিয়ে গেছেন বরিশালের ধানসিঁড়ি নদীর অববাহিকায়।
এই বিশাল ক্যানভাস ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে গল্পের খাতিরে একের পর এক বৈচিত্র্যময় চরিত্র এসেছে, আর মাসরুর আরেফিনের সেই পরিচিত শব্দের জটিল ও গভীর বুননে তারা নিজেদের ছাপ রেখে গেছে। তবে একজন পাঠক হিসেবে দুবাই বিমানবন্দরে জার্মান জেনারেলের চরিত্রটি আমার কাছে কিছুটা অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়েছে। গল্পের টানটান বুনটে তার থাকা বা না থাকায় মূল আখ্যানের তেমন কোনো হেরফের হতো বলে মনেহয় না।
২
‘আলথুসার’ কোনো প্রথাগত গল্প বা উপন্যাস নয়; এটি দর্শন, রাজনীতির রাজপথ, ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা এবং শাসকের শোষক কাঠামোর মনস্তাত্ত্বিক রূপক। আলথুসারের মতে শাসকশ্রেণি কেবল বন্দুকের নলে দেশ চালায় না; তারা শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবার ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মনে এমন এক ন্যারেটিভ দাঁড় করায় যাতে মানুষ নিজেকে স্বাধীন বলে মনেকরে। অথচ মানুষ নিজের অজান্তেই জীবনভর একটা সিস্টেমের দাস হয়ে থাকে। ২০১৯ সালে লন্ডনের XR আন্দোলনে আলথুসারের সেই তত্ত্ব কিংবা দর্শন রাজপথের উত্তাপে রূপ নেয়। অক্সফোর্ড সার্কাস বা ওয়াটারলু ব্রিজে পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীদের ওপর ক্যাপিটালিজম ও রাষ্ট্রের যে দমননীতি নেমে আসে, তা প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদ যখন নিজের অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন তার তথাকথিত ‘ডেমোক্র্যাটিক’ মুখোশ খুলে পড়ে এবং রাষ্ট্রযন্ত্র নগ্ন শোষকের রূপ নেয়।
লেখক যখন দৃশ্যপটকে লন্ডন থেকে এক লাফে বাংলাদেশের বরিশালের ধানসিঁড়ি নদীর অববাহিকায় নিয়ে আসেন, তখন উপন্যাসটি যেন আন্তর্জাতিক মাত্রা লাভ করে। ধানসিঁড়ি নদীর এই অবতরণ কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি কাঠামোগত শোষণের এক সমান্তরাল রেখাচিত্র। লন্ডনে শোষণের রূপটা হয়ত বহুজাতিক কর্পোরেশন আর পরিবেশ-বিধ্বংসী রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে প্রকৃতির ওপর শোষণ। আর ধানসিঁড়ির পাড়ে এসে শোষণের রূপটা বদলে গিয়ে স্থানীয় ক্ষমতাধর, নদী দখলদার এবং আমলাতান্ত্রিক ও আইনি ব্যবস্থার গ্যাংগ্রিনের আকার নেয়; যা সাধারণ মানুষ, কৃষক, জেলে ও প্রান্তিক সমাজকে ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে ফেলে। এজন্যই লন্ডনের অক্সফোর্ড সার্কাসে যে পুলিশ পরিবেশবাদীদের গ্রেফতার করছে, আর ধানসিঁড়ি নদীর পাড়ে ভূমিদস্যু বা শাসকের পেটুয়া বাহিনী যে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করছে—তাদের ধরন আলাদা হলেও উদ্দেশ্য একই, আর তা হলো পুঁজি ও ক্ষমতার স্বার্থ রক্ষা করা।
৩
মাসরুর আরেফিন তার চিরাচরিত দীর্ঘ, জটিল ও প্রবহমান গদ্যে লুই আলথুসারের প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বকে ধানসিঁড়ির কাদা-জল পর্যন্ত নামিয়ে এনে এটিই প্রমাণ করেছেন যে, লন্ডনের রাজপথ কিংবা ধানসিঁড়ির তীর—প্যাটার্ন বদলায়, কিন্তু শাসকের চাবুক এবং শোষিতের হাহাকার সবখানে-সবকালে একই ভাষায় কথা বলে। উপন্যাসটি পাঠকের মনে এই সত্যটিই রেখে যায় যে, শাসকশ্রেণির কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই; তারা সবখানেই একই যন্ত্রের ভিন্ন ভিন্ন গিয়ার মাত্র। সবশেষে লেখকের উদ্দেশ্যে একটা কথাই বলতে চাই, উপন্যাসের নায়ক আর মেগানের অদ্ভুত কেমিস্ট্রি আরেকটু বিকশিত হতে পারতো।
৪
বইয়ের বাঁধাই চমৎকার। প্রথমার বইয়ের প্রিন্ট কোয়ালিটি বরাবরই ভালো।
ঝকঝকে প্রিন্ট প্রশংসার দাবী রাখে।
সবাই ভালো থাকবেন। হ্যাপি রিডিং।
শুভ কামনা নিরন্তর।
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২ সেপ্টেম্বর ২০২৬