
১
বিগত কয়েকমাসের আইন-শৃংখলা জনিত অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারের প্রতি উদাত্ত আহবান, পুলিশ বাহিনির দ্রুত সংস্কার করুন। শুধু ইউনিফর্ম পাল্টে এই বাহিনীর সদস্যদের মনমানসিকতা পরিবর্তন করা সম্ভব না। সবার আগে এই বাহিনীর সদস্যদের ডিএনএ সিকয়েন্সিং করুন। কেননা বিগত ১৭ বছরের অনিয়ম এবং অপকর্মের দায় এড়াতে বহু সদস্য বর্তমানে তাদের অতীত অপকর্মের ফুটপ্রিন্ট মুছতেই ব্যস্ত। বর্তমান বাস্তবতায় দুর্বল মানসিকতাসম্পন্ন এরকম জনবল দিয়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অসম্ভব। দলীয় আনুগত্যে অন্ধ এবং গোপালগঞ্জের মতো বিশেষ আঞ্চলিক প্রভাবে বিতর্কিত সদস্যদের যাচাই-বাছাইপূর্বক চাকরিচ্যুত করে পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো জরুরি। এনাদের অনেকে অবৈধ পথে যথেষ্ট আর্থিক স্বচ্ছলতা অর্জন করেছেন, যা দিয়ে তারা বিকল্প জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম। তাই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার দরকার নাই। বরং সরকারের প্রতি অনুরোধ আমাদের কথা ভাবুন।
পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং বাহিনীকে কার্যকর করতে দ্রুত বাস্তবায়নে সক্ষম স্বল্পমেয়াদি (Short-term) এবং দীর্ঘমেয়াদি (Long-term) রোডম্যাপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
২
স্বল্পমেয়াদি প্রক্রিয়া: অবসরপ্রাপ্ত ও রিজার্ভ সামরিক সদস্যদের স্বল্পমেয়াদি নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ।
বিগত ১৭ বছরে সশস্ত্র বাহিনীর যেসকল সদস্য ও কর্মকর্তা অবসরে গেছেন এবং এখনও নিজ নিজ বাহিনীর রিজার্ভ লিস্টে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, তাদের অতীত চাকুরীর রেকর্ড পর্যালোচনা করে পুলিশ বাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক বা স্থায়ী পুনর্বাসনের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সংখ্যা আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখ।
ক। বর্তমান নিয়মে সরকারি অসামরিক চাকরিতে অবসরের বয়স ৫৯ বছর (মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৬০ বছর)। অথচ সশস্ত্র বাহিনীতে অবসর গ্রহণের বয়স পদমর্যাদাভিত্তিক (যেমন: সৈনিক/নন-কমিশন্ড অফিসারদের ক্ষেত্রে ৩৯–৪৮ বছর, কমিশনড অফিসারদের ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন/মেজর পর্যায়ে ৪৫–৫০ বছর এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পদ অনুযায়ী ৫২–৬০ বছর পর্যন্ত)। অর্থাৎ ৫৯ বছর বয়সের অনেক আগেই সশস্ত্র বাহিনীতে পদমর্যাদাভিত্তিক অবসরের নিয়ম থাকায় বিপুল পরিমাণ প্রশিক্ষিত জনবল কর্মক্ষম থাকা সত্ত্বেও অব্যবহৃত থেকে যায়। অথচ এনারা সবাই সুশৃঙ্খল, দেশসেবার জন্য নিজনিজ ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে শপথ নিয়েছেন এবং অস্ত্র চালনায় পূর্ণ প্রশিক্ষিত। এনাদের রাষ্ট্রীয় কাজে পুনরায় ব্যবহার করা হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ব্যয় বাঁচবে। শূন্যস্থান পূরণে এটিই সর্বাপেক্ষা দ্রুততম বিকল্প, কারণ এনারা ইতোমধ্যে র্যাব ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অসামরিক পুলিশিং কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
খ। ৩/৬ মাসের বিশেষ পুলিশি প্রশিক্ষণ কারিকুলাম।
নিয়োগপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের পুলিশি কার্যক্রমে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ৩/৬ মাসের একটি নিবিড় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা যেতে পারে। এই প্রশিক্ষণে নিচের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
(১) পুলিশ আইন ও দণ্ডবিধি: পুলিশ আইন (Police Act, 1861), ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC), পেনাল কোড, এবং প্রমাণ আইন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ধারা।
(২) তদন্ত ও আলামত সংরক্ষণ: ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্ট, আলামত সংগ্রহ ও এফআইআর (FIR) লেখার সঠিক পদ্ধতি। এক্ষেত্রে মিলিটারি পুলিশে কর্মরত ছিলেন এমন সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত।
(৩) জনবান্ধব পুলিশিং ও মানবাধিকার: সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ, মানবাধিকার রক্ষা এবং সিভিলিয়ানদের মানসিকতা বুঝে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার কলাকৌশল।
গ। পদমর্যাদা এলাইনমেন্ট (Rank Alignment) এবং এসংক্রান্ত অতীত অভিজ্ঞতা।
২০০২–২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন গঠনের সময় সশস্ত্র বাহিনীর র্যাঙ্ক এবং পুলিশের পদমর্যাদার মধ্যে একটি কার্যকর এলাইনমেন্ট বা সমতাকরণ প্রস্তুত করা হয়েছিল। উক্ত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বয়স ও পূর্ববর্তী সামরিক পদ বিবেচনা করে পুলিশে উপযুক্ত পদমর্যাদায় দ্রুত পদায়ন সম্ভব। যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, জিয়াউর রহমানের সরকার ‘Public Admin Regulations’ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অধ্যাদেশের আওতায় সেনা কর্মকর্তাদের পুলিশে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেসময় সেনা কর্মকর্তাদের তাদের তৎকালীন সামরিক পদবীর সাথে পুলিশের সমকক্ষ পদবী নির্ধারণ করে আত্মীকরণ করা হতো। অনেকক্ষেত্রে তাদেরকে প্রথম পর্যায়ে প্রেষণে ২-৩ বছরের জন্য পাঠানো হতো। পরবর্তীতে ইচ্ছুক হলে এবং সরকারি অনুমোদন পেলে স্থায়ীভাবে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যুক্ত করা হতো। এজন্য সেনাবাহিনীতে তাদের চাকরির মেয়াদের একটি অংশ পুলিশ ক্যাডারের সার্ভিস লেন্থ ও জ্যেষ্ঠতা হিসেবে গণনা করা হতো।
ঘ। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: প্রেসিডেন্ট জিয়ার দৃষ্টান্ত।
১৯৭৭/৭৮ সালের দিকে প্রেসিডেন্ট জিয়া সরকারের আমলে সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন যোগ্য ও অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাকে পুলিশ প্রশাসনে আত্মীকরণ করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে এ. টি. আহমদুল হক চৌধুরীর কথা বলা যেতে পারে। এ. টি. আহমদুল হক চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার। তিনি তার সামরিক পদবী (মেজর/লেফটেন্যান্ট কর্নেল) থেকে অবসর নিয়ে পুলিশ প্রশাসনে যোগ দেন। এরপর ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের ১৮তম আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তফা কামাল পাশা সশস্ত্র বাহিনী থেকে অবসরে গিয়ে প্রেষণে ও পরবর্তীতে সিভিল প্রশাসনে যুক্ত হন এবং পুলিশের জেলা ও ডিআইজি পর্যায়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত স্পেশাল ব্রাঞ্চ, সিআইডি এবং মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা ও অপারেশনাল বিভাগে বেশ কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ডিএসপি বা সহকারী পুলিশ কমিশনার পদে সরাসরি নিয়োগ ও সমতাকরণ করা হয়। অতীতের এই মডেলটি অনুসরণের মাধ্যমে নতুন কোনো জটিলতা ছাড়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব। উল্লেখ্য যে, এই প্রক্রিয়ার ফলে তৎকালীন পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা আসে এবং ঢাকার মতো বড় শহরে অপরাধ দমনে কার্যকারিতা বাড়ে (যা ১৯৭৬ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গঠনের মাধ্যমে গতি পায়)।
৩
দীর্ঘমেয়াদি (Long-term) রোডম্যাপ।
ক্যাডেট অফিসার ও কনস্টেবল পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান বিসিএস ও নিয়মিত স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রাখা।
৪
গোপালগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গ।
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে বাধা দেওয়ার লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন ম্যাডাম বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’র সামনে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত জনৈক পুলিশ অফিসারের বেআইনি আচরণের প্রতিবাদে ম্যাডাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “দেশ কোথায়? গোপালী? গোপালগঞ্জের নামই বদলে যাবে, গোপালগঞ্জ আর থাকবে না।”
ভারতে নরেন্দ্র মোদী সরকার যেভাবে এলাহাবাদ পরিবর্তন করে ‘প্রয়াগরাজ’, বম্বের নাম ‘মুম্বাই’ এবং মাদ্রাজের নাম ‘চেন্নাই’ রেখেছে, সেখান থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে গোপালগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে পুরানো নাম ‘রাজগঞ্জ’ রাখা যেতে পারে। কেননা ১৭৯৩ সালের দিকে স্থানীয় জমিদার রানী রাসমণির নাতি নব গোপালের নামানুসারে এই এলাকার আসল নাম ‘রাজগঞ্জ’ পরিবর্তন করে ‘গোপালগঞ্জ’ রাখা হয়েছিল। ‘রাজগঞ্জ’ নাম পছন্দ না হলে এই এলাকার আরও পুরানো নাম, কোটালীপাড়া বা চন্দ্রভার্মা কোট রাখা যেতে পারে। ম্যাডামের এই ইচ্ছেটা পূরণ করা হোক।
৫
দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় ক্যাডেট অফিসার ও কনস্টেবলদের নিয়মিত ও স্বচ্ছ নিয়োগ চালু রাখার পাশাপাশি, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এবং প্রশিক্ষিত জনবলকে কাজে লাগিয়ে দেশের আইন-শৃঙ্খলা দ্রুত স্বাভাবিক করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
------------------------
©সুমন সুবহান
মিরপুর ডিওএইচএস, ঢাকা
২ অক্টোবর ২০২৬