নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিষয়২১ আগস্ট, ২০২৬ভিউস: ১
পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২: ইউরেশীয় ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্যের অবসান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ওয়াশিংটনের সাজানো এক অলিখিত নিয়মের ওপর নির্ভরশীল—যাকে আমরা ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা বলে জানি। এই ব্যবস্থার মূল সমীকরণটি ছিল অত্যন্ত সহজ কিন্তু ব্ল্যাকমেইলের সমতুল্য; যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি রাষ্ট্রকে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কিনতে হতো মার্কিন ডলারে, অন্যথায় অবাধ্যতার শাস্তি হিসেবে নেমে আসত সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ধ্বংস। ওয়াশিংটনের এই একচেটিয়া আর্থিক হাতুড়ি এবং সুইফট (SWIFT) ব্যাংকিং ব্যবস্থার রাজনৈতিক অপব্যবহারই ছিল গত ৮০ বছর ধরে পশ্চিমা ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের মাটিতে যা ঘটে গেল, তা কেবল সাধারণ কোনো দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক করমর্দন বা লাল গালিচার প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি মূলত মার্কিন একমেরু (Unipolar) বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক অভ্যুত্থান এবং পশ্চিমা আর্থিক সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আর এই সক্রিয় কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ‘গ্রাউন্ড জিরো’ হিসেবে কাজ করছে একটি অত্যন্ত দূরদর্শী, গোপনীয় এবং বিশালাকার জ্বালানি অবকাঠামো ম্যাট্রিক্স—যাকে আমরা 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' পাইপলাইন নামে চিনি। এই পাইপলাইনের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যা আটলান্টিক জোটের চিরচেনা ব্লকিং স্ট্র্যাটেজিকে সম্পূর্ণরূপে অকেজো করে দিতে সক্ষম।
পাশ্চাত্যের নীতিনির্ধারকেরা যখন নিষেধাজ্ঞা আর সামরিক বলয় তৈরির পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধকালীন সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, বেইজিং এবং মস্কো তখন নীরবে বৈশ্বিক নিরাপত্তার সম্পূর্ণ নতুন এক মহাদেশীয় সমীকরণ সাজিয়ে ফেলেছে। এই নতুন ইউরেশীয় অক্ষের মূল শক্তি হলো রাশিয়ার অফুরন্ত কাঁচামাল ও জ্বালানির সাথে চীনের পৃথিবীর বৃহত্তম শিল্প উৎপাদন ক্ষমতার এক অভূতপূর্ব কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক একীভূতকরণ। ওয়াশিংটন যেখানে ভেবেছিল ইউক্রেন যুদ্ধের পর কঠোর নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে রাশিয়াকে দেউলিয়া ও একঘরে করে ফেলবে, সেখানে তারা মূলত দুই পরাশক্তিকে আরও কাছাকাছি এনে একটি অভেদ্য অর্থনৈতিক দুর্গ গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই সমান্তরাল বিশ্বব্যবস্থা কেবল সামুদ্রিক অবরুদ্ধকরণের ‘মালাক্কা ডিলেমা’র ভয়কেই চিরতরে দূর করেনি, বরং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনে পেট্রোডলারের কৃত্রিম চাহিদাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এরফলে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ট্রিলিয়ন পেট্রোডলার আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে ফেরত আসার পথ তৈরি হচ্ছে, যা মার্কিন ঋণভিত্তিক অর্থনীতিতে চরম মুদ্রাস্ফীতি বা হাইপারইনফ্লেশনের এক অনিবার্য গাণিতিক সত্যকে উস্কে দিচ্ছে। গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো এখন ব্রিকস প্লাস জোটের মাধ্যমে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের বাইরে একটি নিরাপদ ও সার্বভৌম বিকল্পের বাস্তব রূপরেখা প্রত্যক্ষ করছে। 'পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া-২' তাই কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পাইপলাইন নয়, বরং এটি ইউরেশীয় ভূখণ্ডে পশ্চিমা একক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন বহুমেরু (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থার উদয়ের ইশতেহার।